
মনির হোসেন
সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, আরব আমিরাতসহ মধ্যেপ্রাচ্যের দেশগুলোতে একজন বিদেশগামী কর্মীর জন্য সরকারিভাবে অভিবাসন ব্যয় নির্ধারিত রয়েছে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক এবং তাদের মনোনীত মধ্যস্বত্তভোগীরা (দালাল) সরকারের এই ব্যয় নির্ধারনকে বৃদ্ধাঙ্গলি দেখিয়ে যে যেভাবে পারছে ইচ্ছামতো টাকা আদায় করছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশভেদে সরকার নির্ধারিত টাকার অভিবাসন ব্যয়ের পাঁচ থেকে সাতগুণ বেশিও টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। আবার সিংগাপুর, মালয়েশিয়া ছাড়াও ইউরোপের দেশগুলোতে যাওয়ার জন্য আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত ৮-১০গুণ পর্যন্ত টাকা। আর এই অতিরিক্ত টাকা বিদেশগামীরা দেশ থেকে ঋণ, সুদে, জমি বিক্রিসহ নানাভাবে জোগাড় করে স্বপ্নের দেশগুলোতে গিয়ে মুল পুজির টাকা তুলতেই তাদের তিন বছর ‘বেকার কাজ করতে হচ্ছে। এদের মধ্যে আবার কেউ কেউ চুক্তি মোতাবেক কাজ না পেয়ে, আবার কেউ কাজ পেলেও বেতন না পেয়ে, ঋণের টাকা যথাসময়ে পরিশোধ করতে না পেরে দুঃখ-কষ্টে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কেউ আবার স্ট্রোক করে এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করছে বলে বিভিন্ন সময় বিদেশের গনমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে।
যদিও অভিবাসন বিশ্লেষক ও ভিসা কেনা-বেচার (ট্রেডিং) সাথে সরাসরি সম্পৃত্তরা বলছেন বাংলাদেশ থেকে যদি একজন কর্মী সর্বোচ্চ আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে আসতে পারে, তাহলেই কেবল ওই কর্মী অল্প সময়েই তার খরচের টাকা যেমন তুলতে পারবে, তেমনি বিদেশ থেকে টাকা উপার্জন করে পরিবার নিয়ে সুন্দরভাবে জীবন কাটাতে পারবে। এেেত্র যাদের ভুমিকা বেশি সেই বাংলাদেশ অ্যাম্বাসিই রয়েছে অনেকটা ঘুমের ঘোরে। এমন অভিযোগ করে সংশ্লিষ্টরা বলেন, এসব বিষয়ে যথাযথ মনিটরিং না থাকায় বাংলাদেশ থেকে অভিবাসন ব্যয় পাঁচ-সাতগুণ বেশি টাকা খরচ করে গরীব মানুষগুলোকে বিদেশে আসতে হচ্ছে। এতে অধিক ব্যয়ে আসা কর্মীরা অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। অথচ ভারত, নেপাল ও শ্রীলংকা থেকে এখনো এক থেকে দেড় লাখ টাকায় কর্মী আসছে। তারা পারলে আমাদের কর্মীরা কেনো অল্প অভিবাসন ব্যয়ে আসতে পারবে না? এটি অবশ্যই আমাদের খুঁজে বের করা উচিত।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী চলতি বছর বিদেশগামী কর্মীদের ছাড়পত্র নেয়ার হার বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেক কম। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়ার কারনে দিন দিন বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা কমছে। এর মধ্যে আবুধাবি, ইরাক, বাহরাইন, ওমান, লেবাননসহ গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। এর মধ্য সরকার নতুন করে জাপানের সাথে বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠাতে চুক্তি করেছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার চেষ্টা করছে। যদিও এই শ্রমবাজারে জেকে বসা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হোতা দাতো আমিন নুর ও রুহুল আমিন স্বপনের নানান ধরনের ফর্মুলার কারনে শ্রমবাজারটি অদ্যাবধি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর ঘোষণা দিলেও কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না। তারপরও শ্রমবাজার চাংগা রাখতে সরকার ইউরোপের দেশ ইতালি, পর্তুগাল, ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশ এবং পূর্ব ইউরোপের দেশে বৈধভাবে লোক পাঠানোর কার্যক্রম চালু রেখেছে। জালিয়াত চক্র সক্রিয় হওয়ায় এসব বাজারও সঙ্কুচিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এরপরও শ্রমবান্ধব দেশগুলোতে বৈধভবে যেসব কর্মী যাচ্ছে, তাদের প্রত্যেককেই গুনতে হচ্ছে সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের পাঁচ-সাতগুণ টাকা। আবার কোথাও ১০ গুণ টাকাও খরচ করতে হচ্ছে বিদেশগামীদের।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পাশে কাকরাইল রাজমনি ঈশা খাঁর অভ্যন্তরে থাকা একাধিক দায়িত্বশীল রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকের সাথে কথা বলতে গেলে তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের নাম ও পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, বিদেশে একজন কর্মী যে টাকা খরচ করে যাচ্ছে সেই রেটের সাথে আমাদের সরকারি রেটের কোনো মিল নাই। তারা বলেন, সরকার তো মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েতের জন্য অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করেছে এক লাখ ৬২ হাজার টাকা। কিন্তু ওই টাকায় (রেট) কি কোনো কর্মী যায়? যায় না। আমাদের জানা মতে কুয়েতে যেতে এখনো লাগে ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা লাগে। সৌদি আরবে যেতে লাগে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা। কাতারে যেতে লাগে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। আবার সিংগাপুরের জন্য আমি যতটুকু জানি অভিবাসন ব্যয় এক লাখ ৬১ হাজার সরকার নির্ধারণ করে দিলেও এই দেশটিতে যেতে (কর্মীর থাকা খাওয়া ট্রেনিংসহ) লাগে ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা। অন্য দিকে পূর্ব ইউরোপের দেশ সাইপ্রাস, রোমানিয়া, সার্বিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়াসহ অন্যান্য দেশে যেতে লাগছে ৯ থেকে ১১ লাখ টাকার মতো। আর ইতালিতে যেতে লাগে ১৮ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা। এরপরও অনেক বিদেশগামীই অতিরিক্ত টাকা দালালদের হাতে দিয়ে প্রতারিত হন, কেউ আবার বিদেশ যাওয়ার আগেই প্রতারিত হন। এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে বলে তারা জানান।
গত সপ্তাহে চাদপুর মতলবের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, আমি সিংগাপুর যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছি। কারণ দেশে ব্যবসা বাণিজ্য স্থবির হয়ে আছে। চলতে কষ্ট হচ্ছে। সিংগাপুরে আমার ভাগিনা থাকে। তার সাথে কথা বললে সে আমাকে জানায়, মামা আপনি আসতে চাইলে আনা যাবে। তবে এখানে আসতে হলে ভিসা কেনা, ঢাকায় ট্রেনিং করা ও থাকা খাওয়াসহ মোট ১৪ লাখ টাকা খরচ পড়বে। কাজ করতে হবে সাপ্লাই কোম্পানির মাধ্যমে ইলেকট্টিক্যাল কাজ। এই কাজ করলে প্রতিমাসে সব খরচ বাদে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা ইনকাম করা যাবে বলে জানিয়েছে।
ঘটনার সত্যতা জানতে সিংগাপুরের বাংলার কণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক এবং অভিবাসন বিশ্লেষক মহসিন গত সপ্তাহে নয়া দিগন্তকে বলেছিলেন, এখন সিংগাপুরে আসতে কমপক্ষে ১৪-১৫ লাখ টাকা নেয় সিন্ডিকেটভুক্ত এজেন্সির মালিক ও দালালরা মিলে। আমি মনে করি এতো টাকা খরচ করে কারো এই দেশে আসা একদম উচিত হবে না। এরপরও কেউ যদি চলে আসে তাহলে তার খরচের টাকা তুলতেই কয়েক বছর লেগে যাবে। কারণ এখানে থাকা খাওয়া বাদে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জমাতে পারবে ওই ওয়ার্কার। বরং ওই টাকা দিয়ে দেশে ছোটখাটো ব্যবসা করলে সে আরো ভালো থাকবে বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।
গতকাল দুপুরে কুয়েত থেকে একজন পুরনো বাংলাদেশী শ্রমিক কোম্পানিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় নয়া দিগন্তকে অত্যধিক অভিবাসন ব্যয়ে আসার পর তাদের কী ভয়াবহ পরিস্থিতি হচ্ছে তার বর্ননা দিতে গিয়ে তিনি চরম হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, কী আর বলব কেউ কেউ তো আত্মহত্যাও করছে। এসবের জন্য প্রথমত আমাদের অ্যাম্বেসি দায়ী। এরপর দায়ি করব ঢাকা থেকে যারা (এজেন্সি মালিক) পাঠায় এবং এদের দালালদের।
ওই বাংলাদেশী বলেন, কুয়েতে নতুন ভিসায় একজন বাংলাদেশী কর্মী আসছে আট থেকে ৯ লাখ টাকায়। চুক্তিতে ৮ ঘণ্টা ডিউটি আর ৭৫ দিনার বেতন উল্লেখ করা থাকে। সাথে আবাসনের জায়গায় একজনের কথা লেখা থাকে। কিন্তু কর্মী আসার পর একজনের সিটে দুই-তিনজনকে থাকতে হচ্ছে। আবার চুক্তিতে ডিউটি ১২ ঘন্টা এবং বেতন ১২০ দিনার লেখা থাকলেও এখানে আসার পর বলা হচ্ছে বেতন ৭৫ দিনারই পাবা। তিনি বলেন, একজন শ্রমিক ৭৫ দিনার বেতন পেলে তারা ২৫ দিনারই খাওয়া ও যাতায়াতে চলে যায়। টিকে ৫০ দিনার। ওই হিসাবে কর্মীর ৯ লাখ টাকা তুলতেই তিন বছর লেগে যাচ্ছে। এর মধ্যে যতজন বাংলাদেশ থেকে বিদেশে আসছে তাদের বেশির ভাগই টাকা ঋণ করে আসছে। এই টাকা তুলতে অনেকেই দিশেহারা হয়ে পড়ে। অনেকের বাড়ি থেকে টেলিফোন আসে কিস্তির টাকা দিতে। এসব চাপের কারণে কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়ে। এরপর তাদের মধ্যে কেউ কেউ অঘটন ঘটিয়ে ফেলে। কেউ স্ট্রোক করে। আবার কেউ আত্মহত্যাও করে। এক প্রশ্নের উত্তরে ওই বাংলাদেশী বলেন, আমাদের অ্যাম্বেসী ঠিকই চুক্তির কাগজ দেখে। কিন্তু এরপর তাদের আর তদারকি নাই। যার কারণে ভিসার দাম ইচ্ছামতো বাড়ছেই। কুয়েতেও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের মতো সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তাদের বাইরে কেউ কাজ করতে পারছে না। যেখানে সিন্ডিকেট সেখানে অতিরিক্ত টাকা লাগবেই মন্তব্য করেন তিনি।
এসব বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থাণ মন্ত্রনালয়ের সচিব মো: মোখতার আহমেদ এর বক্তব্য আনতে গেলে তার পিএস তরিকুল ইসলাম জানান, স্যার শ্রমবাজার সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে বক্তব্য দেবেন না। পরে ওই মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, অভিবাসন ব্যয় কমানোর লক্ষ্য মন্ত্রনালয় (কর্মসংস্থাণ) থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা এ ব্যাপারে কাজ করছেন। কিভাবে অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী নয়া দিগন্তের প্রতিবেদককে তার দফতরে আগেই বলেছিলেন, বিদেশে কর্মী কম যাক কিন্তু দক্ষ কর্মী যাক। একই সাথে তারা যেনো কম টাকায় যেতে পারে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা কোন কর্মীকে বিদেশে যাচাই বাছাই ছাড়া পাঠাতে চাই না। সার্বিয়ার বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, যারা দূতাবাসের কিয়ারেন্সে বৈধ শ্রমিক থাকবে তাদের দ্রুত পাঠানোর ব্যবস্থা করবো। আর কারো সমস্যা থাকলে ওই কর্মীকে যারা পাঠানোর চেষ্টা করবে তাদের কাউকে ছাড়া হবে না।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








