সাজেকে সেনা-পুলিশের ওপর গুলি
সাজেক ভ্যালি পর্যটন কেন্দ্র সড়কে অবরোধ চলাকালে সেনাবাহিনীর পাহারা : নয়া দিগন্ত।

- নিরাপদে সরানো হলো প্রায় ৩ হাজার পর্যটক
- গোলাগুলির খবর অসত্য দাবি ইউপিডিএফের

Advertisement

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর সদস্যদের ল্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সকালে সাজেকের গঙ্গারাম বাজার ও উজোবাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ উদ্যোগে আটকে পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে নিরাপদে খাগড়াছড়িতে সরিয়ে নেয়া হয়।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, সড়ক অবরোধের সময় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সদস্যরা পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর সদস্যদের ল্য করে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি ছোড়েন। এ সময় সেনাবাহিনীর একটি টহল দল আত্মরা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাল্টা গুলি চালায়।
অন্য দিকে রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আবদুর রকিব জানিয়েছেন, অবরোধকারীদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে সেনাবাহিনীর চার থেকে পাঁচজন সদস্য এবং পুলিশের দুই সদস্য আহত হয়েছেন। তবে কোনো পর্যটক আহত হননি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছেÑ এমন খবর অস্বীকার করেছে ইউপিডিএফ। সংগঠনটির দাবি, সাজেকের বাসিন্দাদের শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচি বানচাল করতে নিরাপত্তা বাহিনী একতরফাভাবে গুলি চালিয়েছে।  যেভাবে শুরু হয় সঙ্ঘাত
আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে সাজেকের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে পর্যটকবাহী যানবাহনের চলাচল বন্ধ করে দেয়। এতে সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং বিপাকে পড়েন সাজেকে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকরা।
পর্যটকদের নিরাপদে যাতায়াত নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল দল অবরোধকারীদের সাথে আলোচনার উদ্যোগ নেয়। তবে সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে অবরোধকারীরা আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের ল্য করে ইটপাটকেল নিপে শুরু করে বলে দাবি করেছে আইএসপিআর।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী লাঠিচার্জ করে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে এবং পর্যটকবাহী যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করে।
আইএসপিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, বেলা ১১টার দিকে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের ল্য করে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এ সময় সেনাবাহিনীর টহল দল পাল্টা গুলি চালালে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়।
পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আবদুর রকিবের বক্তব্য অনুযায়ী, পর্যটকদের গাড়িবহরকে নিরাপত্তা দিয়ে সরিয়ে নেয়ার পর বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র দলের মধ্যে থেমে থেমে গোলাগুলি চলে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
অবরোধের কারণে আটকা পড়েন পর্যটকরা
সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণ অধিকার রা কমিটির ডাকে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সাজেক সড়কের উজোবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। অবরোধকারীরা সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে সাজেক ভ্যালি থেকে ফেরার পথে পর্যটকেরা উজোবাজার এলাকায় আটকা পড়ে। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্যরা তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে আটকে পড়া পর্যটকের সংখ্যা দুই হাজার ৩০০ থেকে প্রায় তিন হাজার বলা হয়েছে। আইএসপিআর জানিয়েছে, প্রায় তিন হাজার পর্যটককে নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।
নিরাপত্তাজনিত কারণে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে সাজেক ভ্যালি বন্ধ ঘোষণা করে। একই সাথে পর্যটকদের বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার মধ্যে নিরাপদে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
তিন দফা দাবিতে অবরোধ
সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণ অধিকার রা কমিটি গত বুধবার এক যৌথ বিবৃতিতে বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পর্যটন সড়কে অবরোধের ঘোষণা দেয়। সংগঠন দু’টি পর্যটকদের আগের দিনই সাজেক ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সভাপতি সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন সংগঠনের সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেয়ার দাবিতে গত ১১ অক্টোবর প্রথম অবরোধ শুরু করা হয়। পরে বাঘাইছড়ি জোনের উপ-অধিনায়ক ও প্রশাসনের প থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিন দফা দাবি পূরণের আশ্বাস দেয়া হলে অবরোধ স্থগিত করা হয়েছিল বলে দাবি সংগঠন দু’টির। তবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দাবিগুলো পূরণ করা হয়নিÑ এমন অভিযোগ তুলে ১৫ অক্টোবর আবার অবরোধ শুরু করা হয়। পরে বাঘাইছড়ি ও মাচালং বাজারের দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির অনুরোধে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়। সর্বশেষ বিবৃতিতে সংগঠন দু’টি অভিযোগ করে, জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যরা এখনো সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছে। তাদের দাবি, স্থানীয় বাসিন্দাদের হুমকি দিয়ে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে এবং ভয়ে জুমচাষিরা নিজেদের ফসলের বাগানের পরিচর্যাও করতে পারছে না।
বিবৃতিতে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র দলটির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ার অভিযোগও তোলা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সশস্ত্র সদস্যদের এলাকা থেকে সরিয়ে না নেয়া পর্যন্ত অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় সংগঠন দু’টি। তবে ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী গাড়ি, জরুরি ওষুধ ও সংবাদপত্রবাহী যানবাহন এবং সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত সাংবাদিকদের গাড়ি অবরোধের আওতামুক্ত রাখার কথা জানানো হয়।
আইএসপিআরের দাবি, অবরোধ ও সহিংসতা পূর্বপরিকল্পিত
আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, অবরোধ ও সহিংসতার ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অবরোধে অংশ নিতে বাধ্য করা এবং তাদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগও করেছে সংস্থাটি।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান অভিযানের কারণে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের একটি অংশ পর্যটন এলাকায় অবস্থান নিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
আইএসপিআরের ভাষ্য, এ ধরনের সহিংসতা পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তা বিঘিœত করার পাশাপাশি পর্যটনশিল্প এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসামরিক প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
গোলাগুলির খবর অস্বীকার ইউপিডিএফের
সাজেকে নিরাপত্তা বাহিনী ও একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলির খবরকে ‘মিথ্যা’ ও ‘বানোয়াট’ বলে দাবি করেছে ইউপিডিএফ।
বৃহস্পতিবার দুপুরে দেয়া এক বিবৃতিতে সংগঠনটির মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে নিরাপত্তা বাহিনী ও কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি। তার দাবি, সাজেক থেকে জেএসএসের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সরিয়ে নেয়ার দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা শান্তিপূর্ণভাবে সড়ক অবরোধ করলে তা বানচাল করতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা একতরফাভাবে গুলি চালায়।
বিবৃতিতে অবরোধকারীদের ওপর হামলা, লাঠিচার্জ, বাড়িঘর ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তুলে এর নিন্দা জানায় সংগঠনটি। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের দাবিগুলো মেনে নেয়া এবং সাজেক থেকে জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের প্রত্যাহারের জন্য কর্তৃপরে প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
এ দিকে অবরোধ ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় পর্যটকদের নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ায় সাজেকের পর্যটন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পরও এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল বলে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে কাল আধাবেলা অবরোধের ডাক
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি দুই জেলায় আগামীকাল শনিবার আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। গতকাল এক বিবৃতিতে নতুন নামে নতুন সংগঠনের ব্যানারে এ অবরোধের ডাক দেয়া হয়। 
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, বৃহস্পতিবার রাঙ্গামাটির সাজেকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেয়ার দাবিতে ডাকা শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধে হামলা, লাঠিচার্জ ও ঘরবাড়ি-দোকান ভাঙচুরের প্রতিবাদে এবং সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবির সমর্থনে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম শনিবার রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা শান্তিপূর্ণ সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে।
ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা সংবাদমাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে এই অবরোধ সফল করার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সব গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংগঠন এবং দুই জেলার সব যাবাহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।
শনিবার সকাল ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সড়ক ও নৌপথ অবরোধ চলবে বলে জানানো হয় এ বিবৃতিতে। অবরোধের সময় অ্যাম্বুলেন্স ও রোগীবাহী গাড়ি, শববাহী যান, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন ও সাংবাদিকদের বহনকারী গাড়ি অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে বলেও উল্লেখ করা হয়।
সেনাবাহিনীর গোলাগুলির খবর সত্য নয় বলে দাবি ইউপিডিএফের
বাঘাইছড়ি (খাগড়াছড়ি) সংবাদদাতা জানান, সাজেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে সেনাবাহিনীর গোলাগুলির খবর সত্য নয় বলে দাবি করেছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট-ইউপিডিএফ। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে দাবি করে, কিছু সংবাদমাধ্যমে বাঘাইছড়ির সাজেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে সেনাবাহিনীর গোলাগুলি চলেছে বলে যে খবর প্রচার করা হয়েছে তা মিথ্যা ও বানোয়াট।
এ দিকে সাজেক সড়কে নতুন করে অবরোধ শুরু হওয়ায় স্থানীয় লুসাই, ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩০ হাজার মানুষ যাতায়াত ও নিত্যপণ্য পরিবহনে মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েছেন। পরিবহন সঙ্কটে জুমের ফসল বাজারে নিতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। দ্রুত সমাধানের ল্েয চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রশাসন।