
সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকেই অবকাঠামো উন্নয়ন, লজিস্টিকস এবং দারিদ্র্য বিমোচনে সর্ববৃহৎ দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। দেশের প্রথম মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর কিংবা হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে জাইকার সহজ শর্তের ঋণ বা ওডিএ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। জাপান বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ উন্নয়ন সহযোগীও বটে।
তবে গত এক দশকে বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্তরণ এবং জাপানের নিজস্ব আর্থিক নীতির কারণে জাইকার ঋণের শর্ত ও সুদের হারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে জাপানি ঋণের সুদহার প্রায় চার গুণ বেড়ে ৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। এক সময় জাইকার ঋণ পেতে নামমাত্র সুদ গুণতে হতো (০.১ শতাংশ), এখনই তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।
সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সরকারের সময় এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। বাংলাদেশ পক্ষ থেকে জাপানকে বলা হবে জাইকার ঋণের সুদ যেন কমানো হয় এবং তাদের শর্ত যেন নমনীয় রাখা হয়। এ বিষয়ে পররাষ্টসচিব আসাদ আলম সিয়াম গত সোমবার এক সংবাদসম্মেলনে জানিয়েছিলেন, নতুন মেট্রোরেল নির্মাণ ও ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন জাপান সফরের সময় আলোচনা হবে।
এ দিকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও জাইকার তথ্যানুযায়ী, এক দশক আগেও বাংলাদেশে জাইকার ঋণের সুদের হার ছিল অত্যন্ত নমনীয় বা প্রায় শূন্যের কোঠায়।
পূর্বের চিত্র (২০২০-২০২১)
২০২০ সালেও জাপানি ঋণের গড় সুদহার ছিল দশমিক ৬০ থেকে শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশের মধ্যে। সে সময় যমুনা রেলসেতু বা হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণের মতো বড় প্রকল্পগুলোতে এই কম সুদের সুবিধা পাওয়া গেছে।
ক্রমিক বৃদ্ধি (২০২২-২০২৫)
এরপর ২০২২ সালে সুদহার সামান্য বেড়ে প্রায় শূন্য দশমিক ৭০ থেকে ১ শতাংশে দাঁড়ায়। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং জাপানের নিজস্ব আর্থিক নীতির প্রভাবে ২০২৩ সালে তা ১.২ শতাংশ, ২০২৪ সালে ১.৭ শতাংশ এবং গত বছর (২০২৫) তা প্রায় ২ শতাংশে উন্নীত হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি (২০২৬)
চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে বিভিন্ন বাজেট সহায়তা ও প্রকল্প ঋণে জাইকার সুদের হার ৩ শতাংশের গণ্ডি পেরিয়ে ৩.০৫ শতাংশ থেকে ৩.৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঠেকেছে। একই সাথে পরামর্শক সেবার ঋণের সুদের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইআরডি সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সুদের হার বাড়লেও জাইকার ঋণের কিছু কাঠামোগত সুবিধা এখনো বিদ্যমান। অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বা বাণিজ্যিক ঋণ ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে শোধ করতে হলেও জাপানি ওডিএ ঋণের ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে ১০ বছরের রেয়াতকালসহ (প্রেস পিরিওড) ৩০ থেকে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিশোধের সুযোগ থাকে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে কিস্তি পরিশোধের চাপ কিছুটা কম হয়। তবে বর্তমান ভাসমান বা বাজারভিত্তিক সুদের হার (যেমন- ঞঙজঋ ভিত্তিক রেট) দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
তিনি জানান, জাইকার চড়া সুদের হার ও কঠিন শর্তের বেড়াজাল থেকে স্বস্তি পেতে বাংলাদেশ সরকার এখন জোরালো কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দরকষাকষির প্রস্তুতি নিচ্ছে। এজন্য তারা বিভিন্ন সময় জাপানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকও করেছেন। এমনি এক আলোচনায় অংশ নিতে বিগত অনবর্তী সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহব উদ্দিন আহমেদ জাপানও সফর করেছিলেন। সরকাররে নীতিনির্ধারক মহলের মতে, যেসব কৌশল অবলম্বন করে সুদের হার কমানো বা নমনীয়তা আদায় করা সম্ভব।
এর মধ্যে একটি হচ্ছে- উত্তরণকালীন বিশেষ ছাড়ের দাবি (ট্রানজিশনাল পিরিয়ড)। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে চূড়ান্ত উত্তরণের পথে রয়েছে। এই অর্থনৈতিক রূপান্তরকালীন সঙ্কট মোকাবেলায় ২০২৯ সাল পর্যন্ত জাইকার আগের মতো বিশেষ রেয়াতি বা কম সুদের সুবিধা বহাল রাখার জন্য জাপানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা।
প্রযোজ্য হচ্ছে, তা পরিবর্তন করে একটি নির্দিষ্ট ও সহনীয় স্থির হারে (ফিক্সড রেট) রূপান্তর করার জন্য জাপানি কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা চলছে।
ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস) এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে নমনীয় ঋণের কোটা বজায় রাখার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা অর্জনে জোর দিতে হবে।
কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ঋণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা কমিয়ে বিশ্বব্যাংক, এডিবি কিংবা অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে সুদের হারের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে হবে। বাজারে বিকল্প ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের উৎস উন্মুক্ত থাকলে জাপানের সাথে দরকষাকষিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি : ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে প্রকল্পের মান বজায় রাখা এবং যথাসময়ে কাজ শেষ করার মাধ্যমে ওভারহেড কমানো জরুরি। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ও সবুজ জ্বালানি খাতে জাপানের নিজস্ব জলবায়ু তহবিল বা গ্রিন ফাইন্যান্স থেকে অতিরিক্ত অনুদান বা বিশেষ ছাড়ে অর্থায়নের দাবি জানানো যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপান বাংলাদেশের অকৃত্রিম উন্নয়ন অংশীদার হলেও বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ঋণের চড়া সুদ দেশের বৈদেশিক ঋণের ওপর বাড়তি বোঝা তৈরি করছে। তাই সময়মতো দক্ষ অর্থনৈতিক কূটনীতি ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের মাধ্যমে জাইকার সাথে ফলপ্রসূ সমঝোতায় পৌঁছানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








