
- ১৩ বছরে ১,২৫,৪০৫ জন নিহত
- পৌনে সাত বছরে ঝরেছে ৭৯৬৩ শিশুর প্রাণ
- আজ জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস
- দফতরে দফতরে ধর্ণা দিয়েও মিলছে না ক্ষতিপূরণ
বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর স্রেফ কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক অঘটন নয়; এটি রূপ নিয়েছে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডে। ত্রুটিপূর্ণ সড়ক নকশা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অনভিজ্ঞ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক এবং ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবের মতো রাষ্ট্রীয় ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার কারণে এগুলোকে নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়। দেশের মহাসড়কগুলো প্রতিদিন পরিণত হচ্ছে রাষ্ট্র-অনুমোদিত মৃত্যুফাঁদে, আর এই অনবরত রক্তক্ষরণের নেপথ্যে ক্রিয়াশীল রয়েছে নীতি-নির্ধারকদের দীর্ঘদিনের নীতিগত বিচ্যুতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির শিকড় এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার চরম শূন্যতা। প্রতিদিনের কোনো না কোনো দুর্ঘটনায় প্রাণ যাচ্ছে। আজ জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। প্রতি বছর এই দিবস পালিত হলেও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে ব্যর্থ বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সাম্প্রতিক নাটোরের সড়ক দুর্ঘটনাটি আরো একবার উন্মোচিত করেছে- কিভাবে একটি চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ মৃত্যুফাঁদে বছরের পর বছর ধরে প্রশাসনিক অলসতা ও উদাসীনতার মাশুল নিজেদের তাজা রক্ত দিয়ে পরিশোধ করে যাচ্ছে সাধারণ মানুষ। গত মঙ্গলবার ভোর ৪টা, রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী বাসটি দ্রুতগতিতে ছুটছিল। বাসের চালক সোহেল রানা অতিরিক্ত গতিতে একটি গাড়িকে ওভারটেক করতে গিয়ে রং সাইডে ঢুকে পড়েন। ঠিক সেই মুহূর্তেই বিপরীত দিক থেকে আসা এক বালুবোঝাই ট্রাকের সাথে ঘটে বিকট শব্দে মুখোমুখি সংঘর্ষ। মুহূর্তের মধ্যে চার দিকে ছড়িয়ে পড়ে বাসের ছিন্নভিন্ন অংশ, ছিটকে পড়ে রোদ-বৃষ্টিতে পথচলা সাধারণ যাত্রীদের রক্তাক্ত দেহ। একই দুর্ঘটনায় নিভে যায় মোট ১৪টি তাজা প্রাণ। গুরুতর আহত হন ২৭ জন যাত্রী।
জানা যায়, ১২ বছর ধরে এই দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান বা ‘ব্ল্যাকস্পট’ চিহ্নিত থাকা সত্ত্বেও নাটোর-পাবনা মহাসড়কটিকে দুই লেন থেকে সম্প্রসারণ করা হয়নি, বসানো হয়নি পর্যাপ্ত সড়ক বিভাজক কিংবা আধুনিক স্পিড ক্যামেরা। সড়কে এই অবিরাম মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের শাসনতান্ত্রিক ও কাঠামোগত প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির গতকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিগত ১৩ বছরে দেশে মোট ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন ৯৮ হাজার ৯৬৮ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া ১৫ শতাংশ অর্থাৎ ২৬ হাজার ৪৩৭ জন যুক্ত করলে বিগত ১৩ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় এক লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন এবং আহত হয়েছেন এক লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন।
সড়কে নিহতের সংখ্যা এখন যেকোনো যুদ্ধের ট্র্যাজেডিকেও হার মানাচ্ছে। ত্রুটিপূর্ণ মহাসড়ক, ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন, লাইসেন্সহীন বেপরোয়া চালক এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ ও পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মেলবন্ধনে দেশের প্রতিটি মহাসড়ক আজ এক একটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৯৬৩ শিশু নিহত হয়েছে। বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে নিহত হয়েছে দুই হাজার ১৯৩ শিশু। পথচারী হিসেবে রাস্তা পারাপার ও রাস্তায় হাঁটার সময় যানবাহনের ধাক্কায় নিহত হয়েছে দুই হাজার ৮১২ শিশু। মোটরবাইকের চালক ও আরোহী হিসেবে নিহত হয়েছে ২৯৫৮ শিশু। জিরো থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশু নিহত হয়েছে ১৫৩২ জন, ছয় বছর থেকে ১২ বছর বয়সী শিশু নিহত হয়েছে দুই হাজার ৮৮৪ জন এবং ১৩ বছর থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিহত হয়েছে তিন হাজার ৫৪৭ জন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার সময় নিহত হয়েছে ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং বসত বাড়ির আশপাশের সড়কে খেলার সময় নিহত হয়েছে ১২ দশমিক শূন্য আট শতাংশ।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষণা মতে, প্রায় ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার মূল কারণ চালকদের অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া মনোভাব এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং। দেশের মহাসড়কে আনুমানিক লক্ষাধিক ফিটনেসবিহীন, ব্রেক-ফেল ও অননুমোদিত মোটরযান মুক্তভাবে চলাচল করছে। চালকের যোগ্যতা পরীক্ষা না করে এবং গাড়ি সশরীরে তদারকি না করেই মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে ফিটনেস ও ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করা বিআরটিএ-এর ওপেন সিক্রেটে পরিণত হয়েছে। টানা ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা ঘুমহীন অবস্থায় গাড়ি চালানোর ফলে চালকরা মনোযোগ হারিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন।
এ দিকে ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর কঠোর সাজার বিধান রেখে আইন করা হলেও, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের রাজনৈতিক দাবির মুখে সরকারের শিথিলতা ও আইন বাস্তবায়ন না করার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। তাছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী, পরিবহন ইউনিয়ন ও কিছু দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তাদের অশুভ আঁতাতে মহাসড়কে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি চলে। দুর্ঘটনা ঘটালে চালক ও মালিকদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বা বিচারহীনতার কারণে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় যে পরিবার তার একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারায়, তাদের জীবন মুহূর্তেই অন্ধকারে তলিয়ে যায়। পরে বিআরটিএ-এর ট্রাস্টি বোর্ড থেকে আইনি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় ফাইল পাওয়ার জন্য বছরজুড়ে বিআরটিএ ও প্রশাসনিক দফতরে দফতরে ধর্না দিতে হয় ভুক্তভোগীদের। পুলিশি তদন্তে বেশির ভাগ সময় দুর্ঘটনাকবলিত ঘাতক গাড়ির মালিকদের রাজনৈতিক প্রভাবে আড়াল করে কেবল চালক বা হেলপারের ওপর দায় চাপিয়ে দুর্বল চার্জশিট দেয়া হয়। ফলে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে এবং চূড়ান্ত বিচারে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত হয় না।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার পূর্বে আমাদের প্রধান যাতায়াত মাধ্যম ছিল নৌপথ এবং দ্বিতীয় স্থানে ছিল রেলপথ; এই দু’টি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মাধ্যমে ৮০ শতাংশ মানুষের যাতায়াত হতো আর সড়কে যাতায়াত করত মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ। কিন্তু পরে সময়ে কোনো কৌশলগত পরিকল্পনা ছাড়াই সমন্বিত গণপরিবহন না গড়ে রেল ও নৌপথ সঙ্কুচিত করে একচেটিয়া হাজার হাজার কোটি টাকার সড়ক সম্প্রসারণ করে ৮০ শতাংশ মানুষকে জোর করে সড়কে নামিয়ে আনা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সড়ক সেক্টরে বিগত সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, বিআরটিএ-এর ফিটনেস বাণিজ্য, ভুয়া ও অদক্ষ চালকের হাতে লাইসেন্স তুলে দেয়া এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও কিছু দুর্নীতিবাজ পুলিশের অশুভ আঁতাতের চাঁদাবাজির কারণে সড়ক দুর্ঘটনা আজ চরম আকার ধারণ করেছে। বিগত ১৩ বছরে ইউক্রেন-রাশিয়া কিংবা ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধেও যত মানুষ না মারা গেছেন, বাংলাদেশে কেবল সড়ক দুর্ঘটনাতেই তার চেয়ে বেশি নিহত হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, আমাদের সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থা শিশুদের জন্য বিন্দুমাত্র শিশুবান্ধব নয়। বিশেষ করে গ্রামীণ বসতবাড়ি সংলগ্ন সড়কগুলোতে নসিমন, ভটভটি, মাহিন্দ্রা ও বেপরোয়া অটোরিকশা কোনো প্রকার ট্রাফিক নিয়ম ছাড়া চলাচল করে। এর ফলে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে বা বাড়ির কাছে খেলার সময় শিশুরা ঘাতক যানের চাকায় পিষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের মধ্যে যেমন কোনো কার্যকর উদ্বেগ নেই, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতার অভাব রয়েছে। ফলে নীরবে একটি প্রজন্মের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাচ্ছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








