
দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পদ শূন্য হয়ে পড়েছে। শীর্ষ নির্বাহী না থাকায় ব্যাংকগুলোর নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন এমডি নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল)। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর নেতৃত্ব সঙ্কটের পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রথমে গত ২ সেপ্টেম্বর অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও বিডিবিএলের এমডিদের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছিল। এরপর সর্বশেষ গত ১৯ অক্টোবর সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের এমডিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে সরকার। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত এই ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকেরই শীর্ষ নির্বাহীর পদ এখন শূন্য। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার এসব ব্যাংকের এমডিদের নিয়োগ দিয়েছিল। বর্তমানে তাদের নিয়োগ বাতিল হলেও নতুন করে কাউকে দায়িত্ব দেয়া হয়নি।
আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে নেতৃত্বের শূন্যতা : রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এমডি পদ শূন্য হওয়ার ঘটনা এমন সময়ে ঘটেছে, যখন এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৪৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ খেলাপি। এসব ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল তিন লাখ ৬৯ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ এক লাখ ৬৯ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা। মূলধন ঘাটতি ও লোকসানও ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে জনতা ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নেট লোকসান বেড়ে তিন হাজার ৯৩১ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ৭৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। গত জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের প্রায় ৪৪ শতাংশ। অন্য দিকে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রূপালী ব্যাংকের পরিচালন লোকসান হয়েছে ৬৪০ কোটি টাকা। বেসিক ব্যাংকও দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের চাপ সামলাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহী পদে শূন্যতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ ঋণ আদায় জোরদার করা, খেলাপি ঋণ কমানো, অনিয়ম প্রতিরোধ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখতে কার্যকর নেতৃত্ব জরুরি।
দ্রুত নিয়োগের দাবি : ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এমডির পদ শূন্য থাকলেই ব্যাংকের দৈনন্দিন সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় না। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারেন। তবে বড় ঋণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, নীতিগত অনুমোদন, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি জটিলতা তৈরি করতে পারে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পদ পূরণ করলেই সঙ্কটের সমাধান হবে না; যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা ও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতার ভিত্তিতে এমডি নির্বাচন করতে হবে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি বেশি, সেসব প্রতিষ্ঠানে আর্থিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা জরুরি। নতুন নীতিমালায় অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করার সুযোগ থাকলেও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত প্রভাবের পরিবর্তে পেশাগত দক্ষতা ও ব্যাংক পুনর্গঠনের সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো দেশের আমানত সংগ্রহ, সরকারি লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে অর্থায়ন এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ঋণ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এসব ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বে দীর্ঘস্থায়ী শূন্যতা শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়, বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সবমিলিয়ে নতুন এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে অযথা বিলম্ব না করে যোগ্য ও দক্ষ ব্যাংকার নির্বাচন করা এখন জরুরি। একই সাথে খেলাপি ঋণ আদায়, অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ, মূলধন ঘাটতি কমানো এবং অভ্যন্তরীণ সুশাসন জোরদারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেয়ার পর এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রতি গ্রাহক ও আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।
নিয়োগে নতুন নীতিমালা : এ দিকে ছয় ব্যাংকের এমডি পদ শূন্য থাকার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে নতুন নীতিমালা জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ১৯ অক্টোবর জারি করা নীতিমালায় এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার শর্তে কিছুটা শিথিলতা আনা হয়েছে।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হতে হলে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় কর্মকর্তা হিসেবে অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে আগে কোনো ব্যাংকের এমডি বা সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে, অথবা এমডি পদের অব্যবহিত আগের পদে অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তবে বিশেষ পেশাগত যোগ্যতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও সুনাম থাকলে দুই বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রার্থীকে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হতে হবে। শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণী গ্রহণযোগ্য হবে না। চাকরিজীবনে সততা, সুনাম ও সন্তোষজনক কর্মদক্ষতার রেকর্ডের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির নিরাপত্তা, সাইবার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং অর্থপাচার প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকতে হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, বাছাই কমিটির সুপারিশ, গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদন যাচাইয়ের পর প্রার্থী মনোনয়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মতি নিয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেবে। নিয়োগের মেয়াদ হবে তিন বছর। প্রয়োজনে পুনর্নিয়োগের সুযোগও রাখা হয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








