
লিভার প্রতিস্থাপনে নতুন যুগে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে সফলভাবে ৮টি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয় এবং বিশ^বিদ্যালয়ের চিকিৎসক ও প্রশাসনের সমন্বিত চেষ্টায় এই নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ। সব ঠিক থাকলে আগামী দিনে মাসে কমপক্ষে দুইটি লিভার প্রতিস্থাপন করা সম্ভব এই বিশ^বিদ্যালয়ে। বাংলাদেশের হেপাটোবিলিয়ারি পেনক্রিয়েটিক ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি বিভাগে এই প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়েছে। লিভার প্রতিস্থাপনে দাতার লিভার নিয়ে থাকেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়ের হেপাটোবিলিয়ারি পেনক্রিয়েটিক ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো: সাইফ উদ্দিন। লিভারের অস্ত্রোপচার বিষয়ে জানতে তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক নয়া দিগন্তের বিশেষ সংবাদদাতা হামিম উল কবির।
নয়া দিগন্ত : লিভার প্রতিস্থাপন কেন এত জটিল?
ডা. মো: সাইফ উদ্দিন : লিভার প্রতিস্থাপন শুধু একটি অস্ত্রোপচার নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে একজন অসুস্থ রোগীর পাশাপাশি একজন সুস্থ মানুষের নিরাপত্তা, কঠোর আইনগত প্রক্রিয়া এবং বহু বিভাগের সমন্বিত প্রস্তুতি। জীবিত এবং সুস্থ একজনের (দাতা) লিভারের (যকৃত) একটি অংশ গ্রহীতার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। তাই দাতা নির্বাচন থেকে শুরু করে অস্ত্রোপচার ও পরবর্তী পরিচর্যা - প্রতিটি ধাপেই সতর্কতা অপরিহার্য। এটা আসলেই একটি অত্যন্ত জটিল অস্ত্রোপচার।
নয়া দিগন্ত : কারা লিভার দান করতে পারেন, আর আইনগত যাচাই কেন জরুরি?
ডা. মো: সাইফ উদ্দিন : আইন ও বিধিমালার আওতায় নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে নির্দিষ্ট আত্মীয়ের পাশাপাশি অনুমোদনযোগ্য কিছু ক্ষেত্রে ইমোশনাল দাতার বিষয়টিও বিবেচিত হয়। তবে এ ধরনের দানের ক্ষেত্রে সম্পর্কের সত্যতা ও স্বেচ্ছাসম্মতি যাচাই করা জরুরি, যাতে অর্থের বিনিময়ে অঙ্গ কেনাবেচা বা কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগের সুযোগ না থাকে। দাতা কি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, এ প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর নিশ্চিত করতেই যাচাই-বাছাই ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া রাখা হয়েছে।
নয়া দিগন্ত : বিদেশে লিভার প্রতিস্থাপন করতে কত টাকা প্রয়োজন হতে পারে?
ডা. মো: সাইফ উদ্দিন : প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে শুধু হাসপাতালের প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত খরচই আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা হতে পারে; এর বাইরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাতায়াত, থাকা, ওষুধ এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপের ব্যয় যুক্ত হয়। ফলে পুরো চিকিৎসা-প্রক্রিয়ার জন্য বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হতে পারে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে খরচ এক কোটি টাকাও ছাড়াতে পারে। তবে হাসপাতাল, দেশ, রোগীর জটিলতা ও চিকিৎসার মেয়াদ অনুযায়ী ব্যয় পরিবর্তন হতে পারে।
নয়া দিগন্ত : একটি সফল প্রতিস্থাপনের জন্য কী ধরনের সার্জিক্যাল টিম ও যন্ত্রপাতি লাগে?
ডা. মো: সাইফ উদ্দিন : লিভার প্রতিস্থাপন একজন সার্জনের একক প্রচেষ্টায় সম্ভব না, এটি বহু-বিভাগভিত্তিক চিকিৎসা। একটি পূর্ণাঙ্গ লিভার সার্জারির জন্য সার্জনদের পাশাপাশি অভিজ্ঞ অ্যানেসথেসিয়া টিম, নিবিড় পরিচর্যা, কার্ডিওলজি, রেস্পিরেটরি মেডিসিন, নেফ্রোলজি, রেডিওলজি, ল্যাবরেটরি মেডিসিন, রক্ত পরিসঞ্চালন (ব্লাড ট্রন্সফিউশন) ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সহায়তা প্রয়োজন। লিভার সার্জারিতে দক্ষ নার্স ও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টরাও অপরিহার্য। আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, কুসা (ক্যাভিট্রন আল্ট্রাসনিক সার্জিক্যাল অ্যাসপিরেটর) মেশিন, ডপলার আল্ট্রাসাউন্ড, লিভারের ভলিউম নির্ণয়ের ব্যবস্থা এবং রক্ত জমাট বাঁধার মূল্যায়নে টিইজি মেশিনের মতো প্রযুক্তি চিকিৎসার নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়তা করে।
নয়া দিগন্ত : অস্ত্রোপচারে কত সময় লাগে এবং পরবর্তী সময় কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ডা. মো: সাইফ উদ্দিন : সাধারণত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা লাগতে পারে; জটিলতা দেখা দিলে সময় আরো বাড়ে। অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর শরীরে পুরনো লিভার অপসারণ ও নতুন লিভার প্রতিস্থাপনের মধ্যবর্তী পর্যায়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। অপারেশনের পর নিবিড় পর্যবেক্ষণ, সংক্রমণ প্রতিরোধ, গ্রাফটের (লিভারের যে অংশটি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে সেটা) কার্যকারিতা যাচাই এবং চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ ব্যবস্থাপনা জরুরি। অপারেশনের পর প্রথম সপ্তাহেই ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না। এই সময়েই অনেক গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা দেখা দিতে পারে, তাই নিয়মিত পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
নয়া দিগন্ত : দাতার নিরাপত্তা কিভাবে নিশ্চিত করা হয়?
ডা. মো: সাইফ উদ্দিন : লিভার প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দাতার নিরাপত্তা। কারণ দাতা একজন সুস্থ মানুষ; তিনি নিজের লিভারের একটি অংশ অন্যকে দান করেন। তাই লিভারের গঠন ও আয়তন, রক্তনালি ও পিত্তনালির বিন্যাস, সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি বিস্তারিতভাবে মূল্যায়ন করা হয়। উপযুক্ত বয়স নির্ধারণেও চিকিৎসক ও প্রচলিত নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি।
নয়া দিগন্ত : দাতা ও গ্রহীতা কত দিনে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন?
ডা. মো: সাইফ উদ্দিন : সুস্থ হওয়ার বিষয় এবং সময় ব্যক্তি ও জটিলতাভেদে আলাদা হয়। কারো কারো ক্ষেত্রে হাসপাতালে কয়েক দিন থেকে দুই সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। এরপরও ফলোআপ চালিয়ে যেতে হয়।
নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় কী লিভার প্রতিস্থাপনে এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ?
ডা. মো: সাইফ উদ্দিন : এখানে এখন পর্যন্ত আটটি লিভার প্রতিস্থাপন হয়েছে। এর মধ্যে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ছয়টি সম্পন্ন হয়েছে। এই ছয়টির মধ্যে একজন গ্রহীতা মারা গেছেন, কিন্তু সব দাতাই সুস্থ আছেন । এ ছাড়া ২০১৯ সালে প্রতিস্থাপন করা এক রোগী (কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব থানার বাসিন্দা) অস্ত্রোপচারের পর স্বাভাবিক জীবনযাপন করেছিলেন; পরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয় । তার মা, যিনি দাতা ছিলেন তিনি এখনো সুস্থ আছেন এবং আমাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, অস্ত্রোপচারের তাৎক্ষণিক সাফল্যই পুরো চিকিৎসার একমাত্র মানদণ্ড নয়; দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ, সংক্রমণ প্রতিরোধ সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নয়া দিগন্ত : কারা কাকে লিভার দান করতে পারেন ?
ডা. মো: সাইফ উদ্দিন : আটটি লিভার প্রতিস্থাপনের মধ্যে মা ছেলেকে, বোন ভাইকে, ছেলে মাকে, বাবা ছেলেকে, মেয়ে বাবাকে এবং এক বোন আরেক বোনকে, ছেলে মাকে এবং আরেকজন দাতা তার খালাকে দান করেছেন। আটজন দাতার সবাই সুস্থ আছেন; তাদের মধ্যে পাঁচজন দাতা নারী।
নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশে বছরে কতজনের লিভার প্রতিস্থাপন প্রয়োজন?
ডা. মো: সাইফ উদ্দিন : প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে বছরে ৫-১০ জনের অর্থাৎ বাংলাদেশে বছরে প্রায় দুই হাজার রোগীর লিভার প্রতিস্থাপন প্রয়োজন। দেশে চিকিৎসার সুযোগ বাড়লে বিদেশে যাওয়ার ব্যয় ও ভোগান্তি কমতে পারে। তবে প্রতিস্থাপনের প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ, রোগী নির্বাচন এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়মিত নথিবদ্ধ করা পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নয়া দিগন্ত : প্রতিস্থাপন কার্যক্রম বাড়াতে কী কী বিষয় প্রয়োজন?
ডা. মো: সাইফ উদ্দিন : দক্ষ সার্জন, অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট এবং নিবিড় পরিচর্যা সংশ্লিষ্ট জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, মাননিয়ন্ত্রণ ও ফলাফল পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সক্ষমতায় মাসে দুটি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব; এ সক্ষমতা বাস্তবে ধরে রাখতে জনবল, অবকাঠামো ও নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু অস্ত্রোপচারের সংখ্যা বাড়ালেই চলবে না, দাতা ও গ্রহীতার নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
নয়া দিগন্ত : কখন লিভার প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়?
ডা. মো: সাইফ উদ্দিন : লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যানসার, লিভার ফেইলিউর এবং কিছু বিরল রোগে প্রতিস্থাপন প্রয়োজন হতে পারে। তবে সব লিভার নষ্ট হয়ে যাওয়া রোগীর প্রতিস্থাপন করা যায় না; রোগের পর্যায়, জটিলতা, অন্যান্য চিকিৎসার সম্ভাবনা এবং রোগীর সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় বিশেষজ্ঞ দল সিদ্ধান্ত নেন কার এবং কখন লিভার প্রতিস্থাপন করা যাবে।
নয়া দিগন্ত : কখন কোন লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?
ডা. মো: সাইফ উদ্দিন : ক্ষুধামন্দা, পেট ফুলে যাওয়া, চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া, সহজে রক্তপাত বা কালশিটে পড়া, মানসিক বিভ্রান্তি, রক্তবমি কিংবা কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ গুরুতর অসুস্থতার ইঙ্গিত দেয়। এসব লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেয়া জরুরি; রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিলে অনেক জটিলতা কমানোর সুযোগ থাকে। নিয়মিত চিকিৎসা ও সময়মতো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া গুরুত্বপূর্ণ।
নয়া দিগন্ত : আপনাকে ধন্যবাদ নয়া দিগন্তকে সময় দেয়ার জন্য।
ডা. মো: সাইফ উদ্দিন : আপনাকে ও নয়া দিগন্তকে ধন্যবাদ।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








