পুঁজিবাজার, বিএসইসি
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। ইন্টারনেট

 

Advertisement

বহুজাতিক কোম্পানিসহ দেশী-বিদেশী মৌলভিত্তিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজতর করা এবং বাজারে ভালো শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ উন্মুক্ত করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। গত সোমবার এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। সংশ্লিষ্টদের মতে, উদ্যোগটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পুঁজিবাজারের গভীরতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগের বিকল্প সম্প্রসারণ এবং ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের অতীত অভিজ্ঞতা বিনিয়োগকারীদের মনে যে সংশয় তৈরি করেছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
কারণ, পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির প্রবেশের সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সেই কোম্পানির শেয়ার কী দামে বিক্রি হচ্ছে, উদ্যোক্তারা কতটুকু শেয়ার ছাড়ছেন, উত্তোলিত অর্থের ব্যবহার কী, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কতটা ঝুঁকি নিচ্ছেন এবং তালিকাভুক্তির পর কোম্পানিটির কার্যক্রম কিভাবে তদারক করা হচ্ছে- এসব প্রশ্নেরও সুস্পষ্ট জবাব থাকতে হবে। অতীতে বেসরকারি কোম্পানির ডিরেক্ট লিস্টিং নিয়ে যে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে, তার আলোকে এবার নতুন ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বিনিয়োগকারী সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর।
ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ ও অতীতের অভিজ্ঞতা : বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানির তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয় এবং কোম্পানির শেয়ার ইস্যু ও মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধিবিধান অনুসরণ করতে হয়। অন্যদিকে, ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধিমালার আওতায় কোনো কোম্পানির শেয়ার সরাসরি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তির সুযোগ তৈরি হয়। তবে সরাসরি তালিকাভুক্তি মানেই সব ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়ায় শেয়ার ইস্যু, একইভাবে অর্থ উত্তোলন কিংবা আইপিওর সব ধাপ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নয়। সংশ্লিষ্ট বিধিমালা ও অনুমোদনের শর্তের ওপর নির্ভর করে প্রক্রিয়াটির প্রকৃত ধরন নির্ধারিত হয়।
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সাময়িকভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বাইরের কোম্পানির জন্যও ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ দেয়া হয়। ২০০৮ সালে এসিআই ফরমুলেশন ও শাইনপুকুর সিরামিকস এ পদ্ধতিতে তালিকাভুক্তির সুযোগ পায়। পরবর্তী সময়ে বেসরকারি কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি আবার বন্ধ করা হয় এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য তা সীমিত রাখা হয়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেসরকারি কোম্পানির জন্যও ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ আবার চালু করা হয় বলে তৎকালীন  বাজারসংশ্লিষ্টদের বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের খুলনা পাওয়ার কোম্পানি এবং সেবা খাতের ওশান কনটেইনার্স লিমিটেড এ পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত হয়। কোম্পানি দু’টিকে সামিট গ্রুপের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
এই তালিকাভুক্তিগুলো ঘিরে পরবর্তী সময়ে যেসব প্রশ্ন তৈরি হয়, সেগুলো শুধু সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের শেয়ার বিক্রির সুযোগ, শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নিয়েও বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করে। ফলে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের বিষয়টি আবার সামনে আসার সাথে সাথে অতীতের অভিজ্ঞতাও নতুন করে আলোচনায় আসছে।
খুলনা পাওয়ার : উচ্চমূল্যে তালিকাভুক্তি, পরবর্তী দরপতন : ডিরেক্ট লিস্টিং নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সংশয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে খুলনা পাওয়ার কোম্পানির শেয়ারদরের দীর্ঘমেয়াদি পতনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তালিকাভুক্তির সময় কোম্পানিটির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার ২২০ থেকে ৩৪০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে শেয়ারটির দর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তালিকাভুক্তির কয়েক বছরের মধ্যে শেয়ারটির দর ৪০ টাকায় নেমে আসে এবং পরবর্তী সময়ে ৯ দশমিক ৯ টাকায় দাঁড়ায়। তালিকাভুক্তির সময় উদ্যোক্তারা কোম্পানিটির ৩০ শতাংশের বেশি শেয়ার বিক্রি করেন এবং শেয়ার বিক্রি থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করেন। 
ওশান কনটেইনার্সের বিলুপ্তি ও করপোরেট সুশাসনের প্রশ্ন : ওশান কনটেইনার্স লিমিটেড ২০১৩ সালে একই গ্রুপের আরেকটি কোম্পানির সাথে একীভূত হওয়ার মাধ্যমে স্বতন্ত্র সত্তা হারায়। তালিকাভুক্তির অল্প সময়ের মধ্যে কোনো কোম্পানি একীভূত হয়ে গেলে বিনিয়োগকারীদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে: একীভূত হওয়ার পরিকল্পনা তালিকাভুক্তির আগে ছিল কি না, এ-সংক্রান্ত তথ্য যথাসময়ে প্রকাশ করা হয়েছিল কি না, একীভূতকরণের বিনিময় অনুপাত কিভাবে নির্ধারিত হয়েছিল এবং সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল কি না।
একীভূতকরণ নিজে কোনো অনিয়ম নয়। ব্যবসায়িক দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যয় কমানো, সম্পদের কার্যকর ব্যবহার কিংবা ব্যবসায়িক পুনর্গঠনের জন্য দুটি কোম্পানি একীভূত হতে পারে। কিন্তু তালিকাভুক্তির পর অল্প সময়ের মধ্যে এ ধরনের পরিবর্তন ঘটলে সংশ্লিষ্ট লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের প্রতি কোম্পানির দায়িত্বশীলতা বিশেষ গুরুত্ব পায়।
বিশেষত, একই করপোরেট গ্রুপের একাধিক কোম্পানির মধ্যে একীভূতকরণ, সম্পদ স্থানান্তর কিংবা ব্যবসায়িক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে স্বার্থের সঙ্ঘাতের সম্ভাবনা যথাযথভাবে বিবেচনা করা দরকার। স্বাধীন মূল্যায়ন, পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ এবং সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের লেনদেনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। অন্যথায়, আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান নয়া দিগন্তকে বলেন, অতীতে যা কিছু ঘটেছে সবকিছুই আমাদের মাথায় রয়েছে। কিন্তু এবার ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের অনুমোদন দিলেও তা খুব একটা সহজ করা হয়নি। বহুজাতিক কোম্পানির পাশাপাশি  দেশী ভালো কোম্পানিগুলোর মধ্যে যাদের পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকা তারাই এ পদ্ধতিতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আবেদন করতে পারবে। এ ছাড়াও কোম্পানি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কমিশন তার সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করেই তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেবে। 
তিনি আরো বলেন, ভালো কোম্পানির শেয়ারের ঘাটতিই এ মুহূর্তে আমাদের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এ মুহূর্তে বাজার যে অস্থির আচরণ করছে তা থাকবে না যদি বাজারে ভালো শেয়ারের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। দেশী মৌলভিত্তিসম্পন্ন ও  বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ার ছাড়া তা সম্ভব নয়। আর দ্রুততম সময়ে এটা করতে হলে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের কোনো বিকল্প নেই। 
বিশিষ্ট পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি)  চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেয়া উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। কিন্তু অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবে প্রক্রিয়াটি যেভাবে ব্যবহৃত হয়েছে তা কাম্য ছিল না। বিএসইসি অবশ্যই এ বিষয়টি মাথায় রাখবে। আর দ্রুত ভালো শেয়ার বাজারে আনতে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের বিকল্প নেই। এখন ভালো কোম্পানিগুলো চাইলে তাদের বিদ্যমান শেয়ারের সামান্য একটি অংশও বাজারে ছেড়ে কর অব্যাহতির সুযোগ নিতে পারে। আর এর মাধ্যমে বাজারের বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগের উপযুক্ত ইন্সস্ট্রুমেন্ট খুঁজে পাবেন যা দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারের জন্য খুবই ফলদায়ক বিবেচিত হবে। এর ফলে দেশী বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। 
অধ্যাপক আবু আহমেদ আরো বলেন, আইপিও,  তা বুক বিল্ডিং বা ফিক্সড প্রাইস যেই পদ্ধতিই হোক না কেন, একটি কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত হতে অনেক সময় নেয়। আর এ ধরনের কোম্পানিগুলোর বাছ-বিচার করাও খুব সহজ নয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত কোনো কোম্পানির ক্ষেত্রে এটি অনেকটা সহজ হয়। তাই এগুলোকে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমেই যত দ্রুত সম্ভব বাজারে নিয়ে আসা উচিত। তা ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে তো তেমন কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তাই এই পদ্ধতিটি উন্মুক্ত হলে তা রাষ্টায়ত্ত লাভজনক কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তিও সহজ করে আনবে।  
২০১০ সালের বাজারধস ও ডিরেক্ট লিস্টিং
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ২০১০ সালের ধস বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছে। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে বাজারসংশ্লিষ্টদের একটি বড় অংশের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, শেয়ারমূল্যের অস্বাভাবিক উত্থান, যথাযথ নজরদারির অভাব এবং স্বার্থান্বেষী মহলের কর্মকাণ্ড বাজারের স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।
ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কিছু কোম্পানিকে ঘিরে পরবর্তী সময়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়, তা এই বৃহত্তর অবিশ্বাসকে আরো গভীর করেছে। তবে ২০১০ সালের পুঁজিবাজার ধসের জন্য শুধু ডিরেক্ট লিস্টিংকে দায়ী করা তথ্যগতভাবে যথার্থ হবে না। ওই সময়ের বাজার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে হলে সামগ্রিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো, বাজারে তারল্যের প্রবাহ, ঋণনির্ভর বিনিয়োগ, শেয়ারমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা এবং তদারকির কার্যকারিতা- সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে।
তবু অতীতের বিতর্ক থেকে একটি শিক্ষা স্পষ্ট : কোনো প্রক্রিয়া আইনসম্মত হলেই তার প্রতিটি প্রয়োগ বিনিয়োগকারীদের জন্য ন্যায্য হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বিধিমালার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে কোনো পক্ষ অতিরিক্ত সুবিধা পেলে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকির অসম বণ্টনের মুখে পড়লে বাজারের প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের নতুন ব্যবস্থায় শুধু আনুষ্ঠানিক আইনগত বৈধতা নয়, বাস্তব ফলাফল এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষাও মূল্যায়নের কেন্দ্রে থাকতে হবে।
ডিরেক্ট লিস্টিং কেন প্রয়োজন হতে পারে
অতীতের অভিজ্ঞতা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের ধারণাটিকে নীতিগতভাবে বাতিল করে দেয়ার প্রয়োজন নেই। বরং সঠিক বিধিবিধান, উপযুক্ত কোম্পানি নির্বাচন এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে এটি পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রথমত, বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী কিছু বহুজাতিক কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসায়িক পরিসর এবং করপোরেট সুশাসনের মান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হতে পারে। এ ধরনের কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন এবং বাজারের খাতভিত্তিক বৈচিত্র্য বাড়তে পারে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান বহুজাতিক হলেই তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালো বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তার আর্থিক অবস্থান, ভবিষ্যৎ আয়, মূল্যায়ন এবং শেয়ারহোল্ডারদের অধিকারও সমান গুরুত্বে দেখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বড় মূলধন ও শক্তিশালী ব্যবসায়িক ভিত্তিসম্পন্ন দেশীয় কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির আওতায় আনা গেলে পুঁজিবাজারের আকার ও গভীরতা বাড়তে পারে। এতে বিনিয়োগকারীদের হাতে আরো বেশি বিকল্প থাকবে এবং বাজারে কয়েকটি খাত বা কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমার সুযোগ তৈরি হবে।
তৃতীয়ত, পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়লে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ শক্তিশালী হতে পারে। ব্যাংকঋণনির্ভর অর্থায়নের পাশাপাশি বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজারের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পেলে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্পও বাড়বে।
তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানোই একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। কোম্পানিগুলোর মান, শেয়ারের মূল্যায়ন, লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং তালিকাভুক্তির পর বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এক হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন কি যথেষ্ট?
বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানিয়েছেন, এবার ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ দেয়া হলেও প্রক্রিয়াটি সহজ করা হয়নি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বহুজাতিক কোম্পানির পাশাপাশি অন্তত এক হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনসম্পন্ন দেশীয় ভালো কোম্পানি এ পদ্ধতিতে তালিকাভুক্তির আবেদন করতে পারবে। কোম্পানি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও কমিশন সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে।
পরিশোধিত মূলধনের ন্যূনতম সীমা নির্ধারণের উদ্দেশ্য হতে পারে বড় ও তুলনামূলকভাবে সক্ষম প্রতিষ্ঠানকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা। কিন্তু শুধু বড় পরিশোধিত মূলধন কোনো কোম্পানির আর্থিক সুস্থতা কিংবা বিনিয়োগযোগ্যতার নিশ্চয়তা দেয় না। একটি কোম্পানির প্রকৃত শক্তি নির্ধারণে তার আয়, মুনাফার ধারাবাহিকতা, নগদ প্রবাহ, ঋণের বোঝা, সম্পদের মান, ব্যবসায়িক ঝুঁকি এবং করপোরেট সুশাসন বিবেচনা করা প্রয়োজন।
উদাহরণস্বরূপ, একটি কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন বড় হলেও তার পরিচালন আয় দুর্বল হতে পারে, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা সীমিত হতে পারে কিংবা ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকতে পারে। আবার তুলনামূলকভাবে কম মূলধনের কোনো কোম্পানির ব্যবসা, নগদ প্রবাহ ও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা শক্তিশালী হতে পারে। সুতরাং পরিশোধিত মূলধনকে প্রাথমিক যোগ্যতার একটি মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা গেলেও এটিকে কোম্পানির গুণগত মানের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোম্পানির শেয়ারবাজারে প্রবেশের যোগ্যতা এবং তার শেয়ারের উপযুক্ত মূল্য- দু’টি পৃথক প্রশ্ন। একটি কোম্পানি তালিকাভুক্তির সব শর্ত পূরণ করলেও তার শেয়ার অতিরিক্ত দামে বিক্রি হলে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। আবার ভালো কোম্পানির শেয়ারও অনুপযুক্ত মূল্যায়নে কেনা হলে প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই যোগ্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি প্রকাশ এবং স্বাধীন মূল্যায়নের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্তই আস্থার ভিত্তি
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্কট নতুন নয়। অতীতে বিভিন্ন সময়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা, শেয়ারমূল্যের অস্বাভাবিক ওঠানামা এবং প্রভাবশালী পক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে নতুন কোনো ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার সদিচ্ছার ঘোষণা যথেষ্ট হবে না; সেই সদিচ্ছার বাস্তব প্রয়োগও দৃশ্যমান হতে হবে।
বিশেষ করে, ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় কোম্পানি নির্বাচনের মানদণ্ড স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। কোন ধরনের আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন, তথ্য প্রকাশ এবং মূল্যায়নের ভিত্তিতে একটি কোম্পানি অনুমোদন পাবে, তা যত বেশি স্বচ্ছ হবে, সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের সুযোগ তত কমবে।
একই সাথে আবেদনকারী কোম্পানি, তাদের উদ্যোক্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিষয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে তা যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করতে হবে। অভিযোগকে প্রমাণ হিসেবে ধরে নেয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রভাবশালী পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে বলে প্রয়োজনীয় তদন্ত এড়িয়ে যাওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং সবার জন্য একই বিধিবিধান প্রয়োগই হওয়া উচিত নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূলনীতি।
শেষ পর্যন্ত পরীক্ষাটি আস্থার
দীর্ঘদিন পর বেসরকারি কোম্পানির জন্য ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ উন্মুক্ত করার উদ্যোগ পুঁজিবাজারের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। বহুজাতিক কোম্পানি এবং শক্তিশালী দেশীয় প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়লে বাজারের বৈচিত্র্য ও গভীরতা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে অতীতের বিতর্ক থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
খুলনা পাওয়ারের শেয়ারদরের দীর্ঘমেয়াদি পতন, ওশান কনটেইনার্সের একীভূতকরণ এবং ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের শেয়ার বিক্রি নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোকে নিছক অতীতের ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এসব অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে সতর্কতার ভিত্তি হতে পারে। তবে অতীতের প্রতিটি ঘটনা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও নথির যথাযথ যাচাইও প্রয়োজন।
বিএসইসি চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় কোম্পানি নির্বাচনের ক্ষেত্রে কঠোরতা বজায় রাখা হবে এবং যোগ্যতার শর্ত পূরণকারী প্রতিষ্ঠানই তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবে। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নীতিগত অবস্থান বাস্তবে কতটা নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা হয়। আবেদনকারী কোম্পানির পরিচয় বা প্রভাব নয়, বরং তার আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার স্থায়িত্ব, সুশাসন, মূল্যায়নের যৌক্তিকতা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার ব্যবস্থা- এসব বিষয়ই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত।
পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি আনার প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের নামে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি বাড়ানোর সুযোগ নেই। উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ ও বিনিয়োগ নগদায়নের ন্যায্য সুযোগ যেমন থাকতে হবে, তেমনি সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরও পর্যাপ্ত তথ্য, ন্যায্য মূল্যায়ন এবং কার্যকর সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়- বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের মনোভাবও অনেকটা তেমন। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া এই সংশয় দূর করার দায়িত্ব এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার। স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি এবং কার্যকর তদারকির মাধ্যমে বিএসইসি যদি প্রমাণ করতে পারে যে ডিরেক্ট লিস্টিং কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর সুবিধা আদায়ের পথ নয়, বরং মানসম্পন্ন কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ানোর একটি গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা, তাহলেই এই উদ্যোগ পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। অন্যথায়, ভালো কোম্পানি আনার প্রত্যাশায় চালু হওয়া নতুন ব্যবস্থাটিও পুরনো অবিশ্বাসের ভারে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।