
বিশেষ সংবাদদাতা
দেশে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহার বাড়লেও আন্তর্জাতিক লেনদেনে বাংলাদেশীদের ব্যয় ও বিদেশীদের বাংলাদেশে ব্যয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের আগস্টে বাংলাদেশের কার্ড ব্যবহারকারীরা বিদেশে তিন ধরনের কার্ডের মাধ্যমে মোট ৯৮৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। একই সময়ে বিদেশী নাগরিকরা বাংলাদেশে তাদের ইস্যু করা কার্ড ব্যবহার করে ব্যয় করেছেন ২৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অর্থাৎ বিদেশে বাংলাদেশীদের কার্ড ব্যয় দেশে বিদেশীদের ব্যয়ের প্রায় চার গুণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের বিগ ডাটা অ্যানালিটিকস অ্যান্ড ডাটা সায়েন্স ইউনিটের ‘অহ ঙাবৎারবি ড়ভ ঈধৎফ টংধমব চধঃঃবৎহং ডরঃযরহ ধহফ ঙঁঃংরফব ইধহমষধফবংয’ শীর্ষক আগস্ট ২০২৬-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে ইস্যু করা ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৯৬ শতাংশ। একই সময়ে এসব কার্ডে মোট লেনদেন বেড়েছে ১০৩ শতাংশ। এতে দেশের অর্থনীতিতে ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার এবং কার্ডভিত্তিক আর্থিক সেবার ব্যবহার বৃদ্ধির চিত্র ফুটে উঠেছে।
পাঁচ বছরে কার্ডের ব্যবহার দ্বিগুণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে দুই কোটি ৪২ লাখ ২৫ হাজার, ১৭ লাখ ৬৩ হাজার এবং ১০ লাখ ২৭ হাজার। ২০২৬ সালের আগস্টে ডেবিট কার্ড বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার কোটি আট লাখ ৭৮ হাজারে, ক্রেডিট কার্ড ২৮ লাখ পাঁচ হাজারে এবং প্রিপেইড কার্ড ৯২ লাখ ৭১ হাজারে।
এ সময়ে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৬৯ শতাংশ, ক্রেডিট কার্ড ৫৯ শতাংশ এবং প্রিপেইড কার্ড ৮০৩ শতাংশ। ফলে কার্ডের মোট সংখ্যা বেড়ে পাঁচ কোটি ২৯ লাখ ৫৪ হাজারে পৌঁছেছে।
অন্য দিকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এসব কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন ছিল দুই লাখ ৪৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকার সমপরিমাণ। ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে চার লাখ ৯৭ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। পাঁচ বছরে লেনদেনের প্রবৃদ্ধি ১০৩ শতাংশ।
আগস্টে দেশে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন ৪০ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা
২০২৬ সালের আগস্টে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ৪০ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকার সমপরিমাণ। জুলাই মাসে এ পরিমাণ ছিল ৪৩ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয়ের প্রায় অর্ধেকই হয়েছে ডিপার্টমেন্ট স্টোর বা বড় বিপণিবিতানে। আগস্টে এ খাতে লেনদেন হয়েছে ১৯ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকার সমপরিমাণ, যা মোট লেনদেনের ৪৮ দশমিক ১৪ শতাংশ।
এ ছাড়া খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ৫ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ বিভিন্ন পরিষেবার বিল পরিশোধে ৪ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা এবং ওষুধ ও ফার্মেসিতে ২ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। নগদ অর্থ উত্তোলনে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডে মোট লেনদেনের ৯৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ হয়েছে পণ্য ও সেবা কেনাকাটায়। নগদ অর্থ উত্তোলনের অংশ ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং অর্থ স্থানান্তরের অংশ শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ।
দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে ভিসার আধিপত্যও স্পষ্ট। আগস্টে এ ব্র্যান্ডের কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৩০ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা, যা মোট লেনদেনের ৭৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ। মাস্টারকার্ডের অংশ ১৬ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং আমেরিকান এক্সপ্রেসের অংশ ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ।
বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় ৫০৪৬ কোটি টাকা
আগস্টে বিদেশে বাংলাদেশের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীরা ৫০৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। জুলাইয়ে এ ব্যয় ছিল ৫২৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ফলে মাসের ব্যবধানে ক্রেডিট কার্ডে বিদেশে ব্যয় কমেছে প্রায় ৪ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।
বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে ডিপার্টমেন্ট স্টোরে। এ খাতে ব্যয় হয়েছে ১৫২ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৩০ দশমিক ২৯ শতাংশ। খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ব্যয় হয়েছে ৯০ কোটি ৩০ লাখ টাকা বা ১৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ। পরিবহন খাতে ৬১ কোটি টাকা এবং ওষুধ ও ফার্মেসিতে ৫৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি ক্রেডিট কার্ড লেনদেন হয়েছে। আগস্টে দেশটিতে ব্যয় হয়েছে ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে মোট ব্যয়ের ১৭ দশমিক ১৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, ভারত ও সিঙ্গাপুর।
ডেবিট কার্ডে বিদেশে ব্যয় বেড়েছে
আগস্টে বিদেশে ডেবিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৪২২ কোটি ১০ লাখ টাকা। জুলাইয়ে এ পরিমাণ ছিল ৪০১ কোটি ১০ লাখ টাকা। এক মাসে এ খাতে ব্যয় বেড়েছে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ।
ডেবিট কার্ডে বিদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্ট স্টোরে, যার পরিমাণ ৮৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সরকারি সেবায় ব্যয় হয়েছে ৭২ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ব্যবসায়িক সেবায় ৫৯ কোটি ১০ লাখ টাকা। নগদ অর্থ উত্তোলনে ব্যয় হয়েছে ৫৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
দেশভিত্তিক হিসাবে ডেবিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে যুক্তরাজ্যে, প্রায় ৫৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে ৫৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং ভারতে ৪৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
প্রিপেইড কার্ডে ব্যয় ৬০১ কোটি টাকা
আগস্টে বিদেশে প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ৬০ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা জুলাইয়ের ৫৭ কোটি ৮০ লাখ টাকার চেয়ে ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ বেশি।
প্রিপেইড কার্ডে বিদেশে সরকারি সেবায় সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ১২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। নগদ অর্থ উত্তোলনে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ডিপার্টমেন্ট স্টোরে ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাবে প্রিপেইড কার্ডে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ভারতে, প্রায় ১১ কোটি ২০ লাখ টাকা। যুক্তরাষ্ট্রে ৯ কোটি টাকা এবং সৌদি আরবে ৬ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
বিদেশী নাগরিকদের ব্যয় বেড়েছে ৬.২৭ শতাংশ
বাংলাদেশে বিদেশী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ইস্যু করা কার্ড ব্যবহার করে আগস্টে ২৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। জুলাইয়ে এ পরিমাণ ছিল ২৩৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এক মাসে এ লেনদেন বেড়েছে ৬ দশমিক ২৭ শতাংশ।
বিদেশীদের কার্ড ব্যবহারের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র ছিল ডিপার্টমেন্ট স্টোর। এ খাতে লেনদেন হয়েছে ৮৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা মোট লেনদেনের ৩৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। নগদ অর্থ উত্তোলনে ৫৯ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং পরিবহন খাতে ৩২ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের কার্ড ব্যবহারের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। আগস্টে তারা বাংলাদেশে ৫৩ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন, যা বিদেশীদের মোট কার্ড লেনদেনের ২১ দশমিক ২৯ শতাংশ। যুক্তরাজ্যের নাগরিকেরা ব্যয় করেছেন ২৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং ভারতের নাগরিকেরা ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
ডিজিটাল লেনদেনে বাড়ছে চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নগদবিহীন অর্থনীতির পথে অগ্রগতির পাশাপাশি কয়েকটি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, আর্থিক স্বাক্ষরতার ঘাটতি, সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর আস্থার অভাব এবং নগদনির্ভর অর্থনৈতিক সংস্কৃতি কার্ডভিত্তিক লেনদেনের বিস্তারে বাধা সৃষ্টি করছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে লেনদেনের ব্যয় এবং স্মার্টফোন ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা।
প্রতিবেদনে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো, ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা জোরদার এবং গ্রাহকদের সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কার্ড ব্যবহারের বিস্তার আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবায় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে; তবে জালিয়াতি প্রতিরোধ, তথ্য সুরক্ষা ও গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে ৪৭টি তফসিলি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্রেডিট কার্ডে বিতরণযোগ্য ঋণের অনুমোদিত সীমা ছিল ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের কাছে পাওনা বা বকেয়া স্থিতি ছিল ১৪ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা।
সামগ্রিকভাবে, কার্ডের সংখ্যা ও লেনদেনের প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার সম্প্রসারণ নির্দেশ করে। তবে বিদেশে কার্ডের মাধ্যমে অর্থ ব্যয় এবং দেশে বিদেশীদের ব্যয়ের ব্যবধানকে শুধু ভ্রমণ বা কেনাকাটার প্রবণতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর মধ্যে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসায়িক সেবা, অনলাইন কেনাকাটা ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের মতো বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই এ প্রবাহের প্রকৃতি বুঝতে খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার সাথে এর সম্পর্ক মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








