ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে চাই তবে সংস্কার হবে দেশের বাস্তবতায়
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে চাই তবে সংস্কার হবে দেশের বাস্তবতায়।


বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয়, রাজস্ব ঘাটতি, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা ও কর্মসংস্থান সঙ্কটের মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকসহ বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে দেশের বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থায়ন ও সংস্কার-সহায়তা চাইছে সরকার।
সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি ‘দুর্বলতা থেকে সমৃদ্ধি’ কৌশলগত কাঠামোর লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করে এ লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ নিয়ে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে দৈনিক নয়া দিগন্তের সিটি এডিটর আশরাফুল ইসলামের সাথে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
প্রশ্ন : আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ব্যাংকক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধান প্রাপ্তি কী? অর্থায়ন ও সংস্কারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কি প্রত্যাশিত সমর্থন পেয়েছে?
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর : ব্যাংককে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর সাথে আলোচনায় আমরা বাংলাদেশের  অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং উন্নয়নের অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরেছি। আমাদের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কটের বাড়তি চাপ এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব বিবেচনায় নিয়ে আমরা বাংলাদেশের উপযোগী অর্থায়ন ও সংস্কার সহায়তা চেয়েছি। এ বিষয়ে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা চলছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্ষদের অনুমোদন ও প্রাথমিক অর্থ ছাড়ের লক্ষ্য ডিসেম্বরের দিকে। তবে আমাদের সাফল্য শুধু সম্মেলনে আলোচনা বা অর্থায়নের প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং জনগণের জীবনমানের উন্নয়নই হবে প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
প্রশ্ন : আইএমএফের সংস্কার কর্মসূচিতে সাধারণত কঠোর শর্ত থাকে। বাংলাদেশ কেন প্রচলিত সংস্কার কাঠামোর বাইরে বিশেষ সুবিধা চাইছে? এতে কি সংস্কারের গতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই?
ড. রাশেদ তিতুমীর : আমরা সংস্কারের বিরোধিতা করছি না; বরং বাংলাদেশের বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংস্কার চাইছি। আমাদের পরিস্থিতি অন্য অনেক দেশের চেয়ে আলাদা। অতীতের আর্থিক অনিয়মে ব্যাংক খাত ও অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে। একই সাথে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সঙ্কটের চাপ এবং এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই সব দেশের জন্য একই ধরনের সংস্কারনীতি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে- এমনটা ধরে নেয়া ঠিক নয়। আমরা আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর সাথে কাজ করতে চাই। তবে সংস্কারের অগ্রাধিকার নির্ধারণে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং নির্বাচিত সরকারের কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের লক্ষ্য সংস্কারকে থামিয়ে দেয়া নয়, বরং কার্যকর ও টেকসই করা।
প্রশ্ন : অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য আইএমএফ ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর কাছে বিশেষ অর্থায়ন ও সংস্কার-সহায়তা চাওয়া হচ্ছে কেন? এ বিষয়ে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে সরকারের অবস্থান কী ছিল?
ড. রাশেদ তিতুমীর : বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বিদ্যমান দুর্বলতা এবং বর্তমান সঙ্কটের ধরন বিবেচনায় নিয়ে অর্থায়ন ও সংস্কারের পদ্ধতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন আলোচনায় আমরা সরকারের সংস্কার কর্মসূচি তুলে ধরেছি।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, অতীতের আর্থিক অনিয়মের কারণে অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কটের কারণে অর্থনীতির ওপর তৈরি হওয়া অতিরিক্ত চাপ মোকাবেলা করা। তৃতীয়ত, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণজনিত চ্যালেঞ্জ সামাল দেয়া।
আমরা আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীর সাথে কাজ করতে চাই। তবে সংস্কার কর্মসূচির মালিকানা বাংলাদেশের নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে থাকতে হবে। সব দেশের জন্য একই সংস্কার মডেল প্রয়োগ করলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। আমাদের নিজস্ব বাস্তবতা ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার অনুযায়ী অর্থায়ন এবং সংস্কারের শর্ত নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
আমরা সংশ্লিষ্ট ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে কারিগরি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ডিসেম্বরের দিকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ও প্রাথমিক অর্থ ছাড় হতে পারে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা বা আইডিএর পরবর্তী অর্থায়ন পর্বে আরো বেশি সহজ শর্তের অর্থায়ন পাওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের কাছে সম্মেলনের সাফল্য শুধু বৈঠক বা আলোচনার সংখ্যা দিয়ে বিচার করার বিষয় নয়। প্রকৃত সাফল্য হবে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের মাধ্যমে।
প্রশ্ন : ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজনের কথা বলা হচ্ছে। সরকার কিভাবে এই সঙ্কট মোকাবেলা করতে চায়?
ড. রাশেদ তিতুমীর : ব্যাংক খাতের দুর্বলতা আমাদের সামনে থাকা সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। আগের বছরগুলোতে আর্থিক খাতে যে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব এখন পুরো অর্থনীতিতে পড়ছে। আমাদের একটি রক্ষণশীল হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে পুনরুদ্ধারে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে।
ব্যাংকিং ব্যবস্থার ক্ষতি শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সাথে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের নিরাপত্তা জড়িত। অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে, বহু মানুষ চাকরি হারিয়েছেন এবং পর্যাপ্ত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ আরো বাড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। পরিশোধিত মূলধনের হিসাবে এটিকে দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং আমানতকারীদের সঞ্চয় ফেরত পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা।
গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেয়া শুরু হয়েছে। তবে ব্যবস্থাটিতে কিছু আমানতকারী তাদের জমা অর্থের পুরোটা ফেরত পাবেন না। এটি একটি বড় আর্থিক ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ। ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে শুধু আর্থিক পুনর্গঠন যথেষ্ট নয়। আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, উৎপাদনশীল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো এবং সরকারি অর্থের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে আর্থিক ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করাও জরুরি।
প্রশ্ন : বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়িয়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা কী? সুদের হার কমানোর প্রত্যাশা কতটা বাস্তবসম্মত?
ড. রাশেদ তিতুমীর : অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দুর্বল থাকলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে।
আমাদের পরিকল্পনা হলো ডিসেম্বরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৮০০ বিলিয়ন থেকে এক হাজার বিলিয়ন টাকায় উন্নীত করা। পাঁচ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি কোনো দেশের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য হতে পারে না। এ জন্য সরকার ৬০০ বিলিয়ন টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ প্রস্তুত করেছে। পাশাপাশি রাজস্ব ও মুদ্রানীতিতে বিভিন্ন সমন্বয় করা হয়েছে।
আমরা আশা করি, বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব রয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি থাকা সত্ত্বেও সুদের হার কমানো কখনো কখনো পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে পারে। তবে ঋণের ব্যয় কমালেই বিনিয়োগ বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মূল্যস্ফীতির প্রবণতা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং উৎপাদনশীল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পাচ্ছে কি না, সেসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। সমুদ্রসীমার তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ব্লকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ, মাতারবাড়ী জ্বালানি কেন্দ্রের উন্নয়ন এবং চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ-প্রতিশ্রুতি নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। আমাদের লক্ষ্য বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, উৎপাদন বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
প্রশ্ন : বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কট বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করেছে? ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে গিয়ে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে না কি?
ড. রাশেদ তিতুমীর : মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতের সাথে সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিস্থিতির কারণে তেল, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানিপণ্য আমদানির ব্যয় বেড়েছে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, গত আট মাসে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার। এটি একটি রক্ষণশীল হিসাব। এই বাড়তি ব্যয়ের পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভরতা এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অপর্যাপ্ত অগ্রগতিও রয়েছে। জ্বালানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত সরাসরি আমাদের অর্থনীতিতে এসে পড়ে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় সম্পদের অনুসন্ধান ও ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার পুরো চাপ সরাসরি ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া আমরা উপযুক্ত মনে করি না। বিশেষ করে নি¤œ আয়ের পরিবারগুলো মূল্যস্ফীতির কারণে আগে থেকেই চাপে রয়েছে। তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের ব্যয় হঠাৎ বেড়ে গেলে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়বে। তবে ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে গিয়ে সরকারি অর্থের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সময়ে ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধার, শিল্প কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করা এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের জন্যও অর্থ প্রয়োজন।
আমাদের পাঁচ বছর মেয়াদি ‘দুর্বলতা থেকে সমৃদ্ধি’ কাঠামোর উদ্দেশ্য হলো এসব সমস্যাকে সমন্বিতভাবে মোকাবেলা করা। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে গতি ফিরিয়ে আনা এবং নি¤œ আয়ের পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দেয়ার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
প্রশ্ন : সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি ‘দুর্বলতা থেকে সমৃদ্ধি’ কাঠামোর মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার কৌশল কী?
ড. রাশেদ তিতুমীর : আমাদের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামোর মূল উদ্দেশ্য হলো অর্থনীতিকে বর্তমান দুর্বলতা ও অস্থিতিশীলতা থেকে বের করে পুনরুদ্ধার, গতিশীলতা এবং দ্রুত প্রবৃদ্ধির ধারায় নিয়ে যাওয়া। ‘থ্রি-আর’ বা ‘তিন আর’ কাঠামোর মাধ্যমে আমরা এই প্রক্রিয়াকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছি।
প্রথম পর্যায় হলো অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা অর্জন। এ পর্যায়ে ব্যাংক খাতের সঙ্কট মোকাবেলা, আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় পর্যায় হলো অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ, ঋণপ্রবাহ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থান পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। তৃতীয় পর্যায় হলো দ্রুত পুনর্গঠন ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। 
এই তিন পর্যায়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। এর জন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রাজস্ব সক্ষমতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে ধারাবাহিক অগ্রগতি প্রয়োজন। আমরা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের নেতৃত্বের কাছে এই কাঠামো তুলে ধরেছি এবং তাদের সমর্থনের কথা জানিয়েছি।
একই সাথে ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ নীতির ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েছি। স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বরাদ্দ ধাপে ধাপে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করতে চাই। এ জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং মানবসম্পদে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। 
প্রশ্ন : বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে। আগামী পাঁচ বছরে এটি ১০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা কী? জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার কিভাবে এ লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখবে?
ড. রাশেদ তিতুমীর : বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে থাকা একটি গুরুতর দুর্বলতা। এই পর্যায়ের রাজস্ব আহরণ দিয়ে অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা কঠিন। তাই আগামী পাঁচ বছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছি। এ জন্য মূল্য সংযোজন কর, আয়কর ও শুল্কসহ রাজস্ব আহরণের প্রধান ক্ষেত্রগুলোকে বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। শুধু করের হার বাড়ানো বা নতুন কর আরোপ করলেই হবে না; কর পরিপালন, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজস্ব ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
অতীতের করব্যবস্থা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত হয়েছে এবং সরকারি বিনিয়োগ ও সামাজিক সেবার জন্য পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারেনি। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। প্রশাসনিক সমন্বয়ের ফলে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত রাজস্ব আদায় ১৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনে রাজস্ব আহরণের ভিত্তি আরো শক্তিশালী করতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রস্তুতি চলছে। এর গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম পৃথক করা। এ বিষয়ে একটি ঐকমত্য কমিটি ব্যবসায়ী সংগঠনসহ বিভিন্ন অংশীজনের সাথে আলোচনা করে সুপারিশের খসড়া তৈরি করছে। শিগগিরই এ বিষয়ে নির্বাহী আদেশ জারির কথা রয়েছে। এই সংস্কার কার্যকর হলে রাজস্ব প্রশাসনের দায়িত্বশীলতা বাড়ানো, কর পরিপালন সম্প্রসারণ এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আরো পূর্বানুমানযোগ্য করব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে উন্নয়ন ব্যয়ে নিজস্ব অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়বে এবং ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
প্রশ্ন : ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি মূল্যস্ফীতি মোকাবেলা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে কী ভূমিকা রাখবে?
ড. রাশেদ তিতুমীর : অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষের জীবনযাত্রার মানে দৃশ্যমান উন্নতি আনতে হবে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, আয় হ্রাস ও কর্মসংস্থানের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দেয়া জরুরি। সরকার ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে কৃষকদের ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয় এবং দায়িত্ব গ্রহণের ২৩ দিনের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হয়।
স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাক্কলন অনুযায়ী, শুধু ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমেই পাঁচ বছরে দারিদ্র্যের হার পাঁচ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে এর বাস্তব ফল নির্ভর করবে কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়ন এবং উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর ওপর।
আমরা সামাজিক সুরক্ষাকে আলাদা কোনো কল্যাণমূলক কর্মসূচি হিসেবে দেখি না; বরং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করি। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফও ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচির গুরুত্ব স্বীকার করেছে বলে আমরা মনে করি। নির্বাচনের আগে পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গিয়েছিলেন। এ পরিস্থিতিতে শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জন নয়, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
প্রশ্ন : স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ উন্নয়ন অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ক্ষেত্রে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে?
ড. রাশেদ তিতুমীর: স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। তবে এর সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার পরিবেশেও পরিবর্তন আসবে। ফলে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং নিজস্ব সম্পদ দিয়ে উন্নয়নকার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ বিবেচনা না করে অর্থায়নের শর্ত নির্ধারণ করা হলে উন্নয়নকার্যক্রমে চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণেই আমরা বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে আলোচনায় বিষয়টি তুলে ধরেছি। বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা বা আইডিএর পরবর্তী অর্থায়ন পর্বে আরো বেশি সহজ শর্তের অর্থায়ন পাওয়ার চেষ্টা করছি। এ ধরনের অর্থায়ন উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে এবং গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
একই সাথে দেশীয় রাজস্ব আহরণ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য দেশের নিজস্ব অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়ানোর সাথে সম্পর্কিত। ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রাজস্ব সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষায় সমন্বিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারলে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সহজ হবে। আমাদের প্রত্যাশা, উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্য বিবেচনায় নিয়ে অর্থায়ন ও সংস্কার-সহায়তার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবেন।
প্রশ্ন : স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দসহ একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে?
ড. রাশেদ তিতুমীর : আমাদের অর্থনৈতিক কর্মসূচির সাথে ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ নীতির ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য যুক্ত রয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং মৌলিক সেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। সরকার স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বরাদ্দ ধাপে ধাপে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করতে চায়। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাজস্ব আয়, উন্নত সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে থাকলে সরকারের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত অর্থ সংগ্রহ করা কঠিন। আগামী পাঁচ বছরে এ অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করতে পারলে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়বে। একই সাথে ব্যাংক খাতের আস্থা ফিরিয়ে আনা, উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি জরুরি। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না বাড়লে মানুষের আয় এবং সরকারের রাজস্ব- উভয়ই চাপে থাকবে।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ মানুষের সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। তাই আর্থিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব সংস্কার, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে একই অর্থনৈতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে এগিয়ে নিতে হবে।
প্রশ্ন : ব্যাংক খাতের বড় আর্থিক প্রয়োজন, জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয়, রাজস্ব ঘাটতি ও দুর্বল বিনিয়োগের মধ্যে সরকার কিভাবে এক ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে চায়? আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে প্রত্যাশা কী?
ড. রাশেদ তিতুমীর : আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং প্রতিটি চ্যালেঞ্জের সাথে অর্থনীতির অন্য অংশের সম্পর্ক রয়েছে। ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন হতে পারে। গত আট মাসে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ঋণপ্রবাহ সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব আহরণ বাড়াতে।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ‘দুর্বলতা থেকে সমৃদ্ধি’ কাঠামোর তিনটি পর্যায় সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রথমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, এরপর অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং সবশেষে পুনর্গঠন ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যাংক খাতে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো জরুরি। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ডিসেম্বরের মধ্যে ৮০০ বিলিয়ন থেকে এক হাজার বিলিয়ন টাকায় উন্নীত করা এবং ৬০০ বিলিয়ন টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ কার্যকর করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
রাজস্ব খাতে আগামী পাঁচ বছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাঠামোগত সংস্কার, কর পরিপালন বৃদ্ধি এবং রাজস্ব প্রশাসনের কার্যকারিতা উন্নত করার মাধ্যমে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা মোকাবেলার পাশাপাশি নি¤œ আয়ের পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দেয়া জরুরি। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচি এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। আমরা চাই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুফল মানুষের জীবনযাত্রায় প্রতিফলিত হোক।
আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, তারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিয়ে অর্থায়ন এবং সংস্কার-সহায়তা দেবেন। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ও অন্যান্য বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে আমরা কাজ করতে আগ্রহী। তবে আমাদের সংস্কার কর্মসূচির মালিকানা বাংলাদেশের সরকারের হাতেই থাকবে। আইডিএর পরবর্তী অর্থায়ন পর্বে আরো বেশি সহজ শর্তের অর্থায়ন পাওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ডিসেম্বরের দিকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ও প্রাথমিক অর্থ ছাড়ের লক্ষ্য রয়েছে। শেষ পর্যন্ত সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু অর্থায়ন পাওয়া বা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আলোচনা হওয়ার মাধ্যমে নয়। কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ কতটা বাড়ল, মানুষের জীবনযাত্রার মান কতটা উন্নত হলো এবং অর্থনীতি কতটা স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড়াল- এসব দিয়েই সাফল্য মূল্যায়ন করতে হবে। ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তুলতে আর্থিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব সংস্কার, বেসরকারি বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে একসাথে এগিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশের বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কার্যকর অভ্যন্তরীণ সংস্কারের সমন্বয়ই এ লক্ষ্য অর্জনের ভিত্তি।

Advertisement