বায়োচার প্রযুক্তি, মাটি

 

Advertisement

মাটির উর্বরতা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস, দিন দিন রাসায়নিক সারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা এবং কৃষিবর্জ্যের অব্যবস্থাপনা-বাংলাদেশের কৃষি খাতে এই ত্রিমুখী সঙ্কট এখন চরম বাস্তবতা। নিবিড় চাষাবাদের কারণে দেশের অধিকাংশ আবাদি জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে ১.৫ থেকে ২ শতাংশের নিচে নেমেছে। ঠিক এমন এক সন্ধিক্ষণে কৃষিবর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর এবং মাটির স্বাস্থ্য ফেরাতে বিশ্বজুড়ে মনোযোগ কাড়ছে ‘বায়োচার’ প্রযুক্তি। নিয়ন্ত্রিত তাপে সীমিত বা বাতাসহীন পরিবেশে উদ্ভিজ্জ বর্জ্য পুড়িয়ে তৈরি বিশেষ এই কার্বনসমৃদ্ধ উপাদান আন্তর্জাতিক কৃষি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে উন্নত বিশ্বে এর সম্প্রসারণ ঘটলেও বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চল, মাটির অম্লতা ও উপকূলীয় লবণাক্ততার বাস্তবতায় এটি কতটা কার্যকর এবং কৃষকের জন্য কতটা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক, তা এখন গভীর পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে।
আন্তর্জাতিক বায়োচার উদ্যোগের (আইবিআই) ২০২৫ সালের বৈশ্বিক বাজার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে বায়োচারের বাণিজ্যিক উৎপাদন দ্রুত গতিতে বাড়ছে। ২০২৩ সালে যেখানে বিশ্বব্যাপী উৎপাদন ছিল প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন, ২০২৫ সালে তা দুই দশমিক নয় গুণ বেড়ে পৌঁছেছে প্রায় পাঁচ লাখ ২০ হাজার ৮১০ মেট্রিক টনে। বিশ্বের ৯৬টি দেশের ৯৩০ জন অংশীজনের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এই পরিসংখ্যান বিশ্ববাজারে বায়োচারের জোরালো উপস্থিতির প্রমাণ দেয়। তবে এই বিপুল পরিমাণ উৎপাদনের সবটুকু কৃষিজমিতে সরাসরি ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিয়ে এখনো কোনো একক ও সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
চীন ও ভারত বিপুল পরিমাণ ফসলের অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে বায়ুদূষণ ঠেকানো এবং মাটির গুণমান বাড়াতে বায়োচার উৎপাদন ও গবেষণায় শীর্ষ সারিতে রয়েছে। চীন দূষিত মাটির পুনর্বাসন ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে বায়োচারকে কাজে লাগাচ্ছে। অন্যদিকে ভারতে ধানের খড় ও তুষ থেকে বায়োচার তৈরি করে মাটির পানি ও পুষ্টি ধরে রাখার সক্ষমতা বাড়ানোর গবেষণা চলছে। তবে তা এখনো কৃষকদের মধ্যে ঢালাওভাবে ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ দেয় না। অস্ট্রেলিয়া মাটিতে আর্দ্রতা রক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদে কার্বন সংরক্ষণের ওপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বায়োচারের গুণমান ও ভারী ধাতু নিয়ন্ত্রণে ইউরোপীয় বায়োচার সনদের মতো কঠোর আইনি কাঠামো কার্যকর করেছে। এ ছাড়া কেনিয়া, ইথিওপিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও পেরুতে স্থানীয় কৃষিবর্জ্য দিয়ে বায়োচার তৈরি করে সুফল মিললেও প্রযুক্তিগত খরচ ও কৃষকের ক্রয়ক্ষমতা এখনো এর বিস্তারে বড় অন্তরায় হয়ে আছে।
বায়োচারের মূল শক্তি মূলত এর অতিসূক্ষ্ম ছিদ্রযুক্ত স্পঞ্জসদৃশ গঠন এবং তুলনামূলক স্থায়ী কার্বন কাঠামো। ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘বায়োচার’-এ প্রকাশিত ৫৯টি গবেষণার এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বায়োচার ব্যবহারে মাটির জৈব কার্বন গড়ে ২৭ শতাংশ, পিএইচ ৪৬ শতাংশ এবং ক্যাটায়ন এক্সচেঞ্জ ক্যাপাসিটি বা পুষ্টি ধরে রাখার ক্ষমতা ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। একই সাথে মাটির ঘনত্ব হ্রাস পেয়ে রন্ধ্রতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। ফলন বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ফলাফল মিলছে। ২০২৫ সালে ‘সয়েল ইউজ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের অম্লীয় মাটির গবেষণার এক মেটা-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্বল্পমেয়াদে বায়োচার প্রয়োগে বিভিন্ন ফসলের গড় ফলন ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তবে অতি-অম্লীয় মাটিতে প্রয়োগমাত্রার হেরফের হলে আশানুরূপ ফল কম পাওয়ার তথ্যও গবেষণায় চিহ্নিত হয়েছে।
জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যানুযায়ী, নিবিড় শস্য বিন্যাস এবং গোবর ও খড় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশের মাটিতে জৈব পদার্থ ফেরত দেয়ার স্বাভাবিক চক্র ভেঙে পড়েছে। দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জমি কোনো না কোনো মাত্রার অম্লতায় আক্রান্ত। 
গত রোববার রাজধানীর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক জাতীয় কর্মশালায় দেশীয় গবেষকরা এ সংক্রান্ত চমকপ্রদ তথ্য তুলে ধরেন। বিএআরসির মৃত্তিকা ইউনিট ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ আয়োজিত ওই কর্মশালায় মূল প্রবন্ধে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মফিজুর রহমান জাহাঙ্গীর জানান, সুষম রাসায়নিক সারের সাথে সঠিক মাত্রায় বায়োচার প্রয়োগ করলে ভুট্টার ফলন ২৯ শতাংশ বেড়ে হেক্টরপ্রতি ৯ দশমিক ২১ টন হয়। এ ছাড়া আউশ ধানের ফলন ২৩ শতাংশ বেড়ে চার দশমিক ৯৭ টন, বোরো ধানের ফলন ২১ শতাংশ বেড়ে ছয় দশমিক শূন্য দুই টন এবং সরিষার ফলন ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। 
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান বায়োচারকে ‘থ্রি-ইন-ওয়ান’ প্রযুক্তি আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি একাধারে মাটির ভৌত গুণ উন্নত করে, সারের কার্যকারিতা বাড়িয়ে অপচয় কমায় এবং দেশের অম্লীয় মাটির সমস্যা দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৭ লাখ টন ইউরিয়া সার ব্যবহৃত হয়, যার একটি বড় অংশ লিচিং বা গ্যাসীয় আকারে অপচয় হয়ে থাকে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, বায়োচার ও কম্পোস্ট ব্যবহারে ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া গ্যাসের অপচয় প্রায় ৩৭ শতাংশ কমে। 
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক ড. মো: রফিকুল ইসলাম বলেন, বায়োচার মাটির ক্ষতিকর নাইট্রাস অক্সাইড নির্গমন প্রায় ৩৮ শতাংশ কমিয়ে দেয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে মাটিতে কার্বন আটকে রাখে বলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক কার্বন ক্রেডিট বাজার থেকে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার পথও তৈরি হতে পারে। উপকূলীয় লবণাক্ত জমিতেও এর সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। 
বায়োচার ব্যবহারে বিজ্ঞানভিত্তিক সতর্কবার্তা দিচ্ছেন গবেষকরা। সদ্য প্রস্তুতকৃত কাঁচা বায়োচার কখনোই সরাসরি জমিতে প্রয়োগ করা যাবে না। কাঁচা বায়োচার মাটিতে দিলে তা উল্টো মাটির বিদ্যমান পুষ্টি উপাদান শোষণ করে সাময়িক নাইট্রোজেন সঙ্কট তৈরি করতে পারে। তাই একে প্রথমে গোবর বা কম্পোস্টের সাথে মিশিয়ে ‘কো-কম্পোস্টিং’ প্রক্রিয়ায় পুষ্টিসমৃদ্ধ করে নিতে হয়। 
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ মনজুরুল কাদির জামালপুরের চরাঞ্চলের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, সুগার মিলের আখের ছোবড়া দিয়ে বায়োচার তৈরি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবে দেশের যেসব অঞ্চলে ব্যাপক হারে ভুট্টার আবাদ হচ্ছে, সেখানে জমিতে পড়ে থাকা ভুট্টার মোচা ও উদ্ভিজ্জ অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করে বায়োচার বানালে উৎপাদন খরচ অনেকটাই সহনীয় মাত্রায় নেমে আসে।
বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো: আবদুছ ছালাম মনে করেন, কৃষকের লাভ-ক্ষতির পূর্ণ হিসাবই প্রযুক্তির স্থায়িত্ব নির্ধারণ করবে। উৎপাদন, পরিবহন ও প্রয়োগের মোট খরচ বাদ দিয়ে কৃষকের পকেটে চূড়ান্তভাবে কতটা অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে, তা নিশ্চিত না হলে কেবল পরিবেশের দোহাই দিয়ে এটি বিস্তার করা যাবে না। বায়োচারের উজ্জ্বল সম্ভাবনার আড়ালে কিছু মারাত্মক ঝুঁকিও রয়েছে। অনিরাপদ কাঁচামাল বা অনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় তৈরি বায়োচারে ক্ষতিকর ভারী ধাতু যেমন সিসা, ক্যাডমিয়াম এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন (পিএএইচ) থাকতে পারে, যা মাটি পেরিয়ে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি করে। 
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক শহিদুল ইসলাম, মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. আফসার আলী, বিএআরসির সাবেক সদস্য পরিচালক ড. বক্তীয়ার হোসেন এবং মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ফরিদুল আলমসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন যে, কেবল গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ে সমন্বিত নীতিকাঠামো গ্রহণ করতে হবে। আঞ্চলিক বৈচিত্র্য অনুযায়ী বরেন্দ্রের অম্লীয় মাটি, দক্ষিণের লবণাক্ত মাটি, চরাঞ্চলের বালুময় জমি ও হাওর এলাকার জন্য আলাদা আলাদা দীর্ঘমেয়াদি মাঠ গবেষণা চালাতে হবে। প্রযুক্তিটির মান নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের জন্য ‘বাংলাদেশ বায়োচার অ্যাসোসিয়েশন’ ও একটি উচ্চপর্যায়ের স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।