
কয়েক দিন পরই ছোট মেয়ে তাসনিয়া মারজানের বিয়ে। সব প্রস্তুতিও প্রায় শেষ। গত শুক্রবার সকালে মেয়েকে নিয়ে অফিসার্স ক্লাবে যান সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো: মোশাররফ হোসেন (৭২)। সেখানে অনুষ্ঠান আয়োজনের বুকিংয়ের জন্যই যাওয়া। কিন্তু বুকিং আর দেয়া হয়নি। চোখের দৃষ্টিশক্তি কম থাকায় ভুলে ভবনের নির্মাণাধীন একটি অংশে চলে যান তিনি। এর পরই ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ভবনটির তিনতলায় একটি ফাঁকা জায়গা দিয়ে অসাবধানতায় নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। সেখান থেকে পরে একটি হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে এই মর্মান্তিক মৃত্যু কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি অন্য কিছু- এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে স্বজনদের মধ্যে। একটি সংবেদনশীল স্থানের নির্মাণাধীন ভবনে এমন দুর্ঘটনা সহজভাবে নিতে পারছেন না কেউ। সন্দেহ দানা বাঁধলে পরে সিসি ক্যামেরার দৃশ্য পরিষ্কার দেখা গেলেও ভবনের নির্মাণে গাফলতির কারণে এই মৃত্যু বলে দায়ী করা হচ্ছে বিভিন্ন মাধ্যমে।
স্বজনরা জানান, মেয়েকে সাঁতার শেখাতে অফিসার্স ক্লাবের সুইমিংপুলে গিয়েছিলেন মোশাররফ হোসেন। মেয়েকে সুইমিংপুলে রেখে তিনি একপর্যায়ে নির্মাণাধীন ভবনটির ভেতরে চলে যান। বেলা সোয়া ১১টার দিকে ভবনের নিচতলায় সিঁড়ির পাশ থেকে তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে বারডেম হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়।
নিহতের ছোট মেয়ে তাসনিয়া মারজান বলেন, সে দিন বাবাকে নিয়ে অফিসার্স ক্লাবে যান তিনি। কয়েক দিন পরপর সুইমিং করার জন্য অফিসার্স ক্লাবে যেতেন। সে দিনও বাবাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, বাবা আমার বিয়ের অনুষ্ঠানের বুকিংয়ের জন্য গিয়েছিলেন। আজ বাবা নেই। বাবাকে ছাড়া কিভাবে বিয়ে করবেন তিনি।
তাসনিয়া বলেন, অসাবধানতাবশত বাবা ভবনের অন্য দিকের একটি নির্মাণাধীন সাইডে চলে আসেন। তিনি চোখে খুব কম দেখতেন। তিনি আসলে লিফট খুঁজে পাচ্ছিলেন না, একবার সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন, একবার উঠছিলেন। এর মধ্যেই ফাঁকা একটি জায়গা দিয়ে তিনি নিচে পড়ে যান। তাকে আহতাবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশের পক্ষ থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পাঠানো হয়।
মোশাররফ হোসেন বিসিএস ৮১ ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন। বাড়ি মুন্সীগঞ্জ সদর পশ্চিম দেওভুনা গ্রামে। বর্তমানে তিনি বনানীর ৫ নম্বর রোডের ৪০ নম্বর বাড়ির সি/৩ এই বাসায় বসবাস করতেন। দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে আমেরিকায় থাকেন। ছোট মেয়ে তাসনিয়া মারজান বাবার সাথেই থাকতেন। তিনি অফিসার্স ক্লাবের সদস্য ছিলেন। ঢাকা মেডিক্যালে তাকে নিয়ে আসা নিহতের মামা+তো ভাই মো: নাজমুল হাসান মিলন জানান, শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে মোশাররফ হোসেন তার ছোট মেয়ে তাসনিয়া মারজানকে নিয়ে অফিসার্স ক্লাবে যান। তিনি চোখে কম দেখতেন বলে লিফট খুঁজে পাচ্ছিলেন না। একবার সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন একবার উঠছিলেন। এর মধ্যে নিচে থেকে কারেন্টের তার তোলার জন্য একটা ফাঁকা জায়গা ছিল সেখান দিয়ে পড়ে যান।
তিনি আরো জানান, তার এই মৃত্যুতে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। কারণ আমরা পরিবারের সদস্যরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখেছি। প্রশাসন থেকেও সিসিটিভি ফুটেজ দেখে এই মৃত্যুকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবেই বলেছে। তার বয়সের কথাও চিন্তা করে আমরা ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ গ্রহণ করেছি। নিহতের বড় মেয়ে আমেরিকা থেকে ফিরলেই তার দাফন সম্পন্ন হবে বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
গতকাল অফিসার্স ক্লাবের একজন কর্মকর্তা সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজের কথা উল্লেখ করে বলেন, মেয়েকে সুইমিং করাতে এসেছিলেন সাবেক এই অতিরিক্ত সচিব। মেয়েকে রেখে তিনি অফিসার্স ক্লাবের অফিসের দিকে আসেন। কিন্তু ভুল করে লিফটে না উঠে সিঁড়িতে চলে যান। সিঁড়ি ধরে ভবনের বেজমেন্টে চলে যান। সেখান থেকে বের হওয়ার রাস্তা (এক্সিট) খুঁজে পাননি। এভাবে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজতে গিয়ে একপর্যায়ে নিচে (সেখানকার একটি গর্তের মতো জায়গা) পড়ে যান। এগুলো পরে সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখা গেছে।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, পরে অতিরিক্ত সচিব মোশাররফ হোসেনের মেয়ে এসে জানান, তার বাবাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখা হয়। প্রথমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে মোশাররফ হোসেন ক্লাবের বাইরে বের হননি। তখন খুঁজতে খুঁজতে বেজমেন্টে তাকে ওই অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে পুলিশ আসে। তারাও সিসিটিভি ক্যামেরা পর্যালোচনা করে দেখেছে কিভাবে ঘটনাটি ঘটেছে।
মোশাররফ হোসেনের চোখে আগেই অপারেশন করা হয়েছিল বলে তার ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন। আগে থেকে তিনি কম দেখতেন উল্লেখ করে অফিসার্স ক্লাবের ওই কর্মকর্তা বলেন, সাবেক অতিরিক্ত সচিবের ভুলে যাওয়ার রোগও আছে। পুরো ঘটনাটি আসলে দুর্ভাগ্যবশত ঘটেছে। শুক্রবার হওয়ায় সকালের দিকে ক্লাবে লোকজনও কম ছিল।
পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, এটি নিছক একটি দুর্ঘটনা। এখানে কোনো সন্দেহের কারণ নেই। সিসিটিভি ফুটেজে সব পরিষ্কার বোঝা গেছে। তারা ময়না তদন্ত ছাড়াই লাশ চেয়েছে। বর্তমানে লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে আছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








