বিডিআরসিএস, নির্বাচন
। ইন্টারনেট

 

Advertisement

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (বিডিআরসিএস) ২০২৬-২৮ মেয়াদের ব্যবস্থাপনা পর্ষদ নির্বাচন ঘিরে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনের ২৯ সেপ্টেম্বর ও ১৪ অক্টোবরের দু’টি চিঠিতে প্রকাশিত পরস্পরবিরোধী অবস্থান কমিশনের ভূমিকা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রথম চিঠিতে নির্বাচন পরিচালনায় ‘আর কোনো করণীয় নেই’ বলে জানানো হলেও মাত্র ১৫ দিন পর দ্বিতীয় চিঠিতে কমিশন জানিয়েছে, তারা নির্বাচনের জন্য পূর্ণ প্রস্তুত।
এ দিকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ৬ অক্টোবরের আদেশে ২৬ অক্টোবর ২০২৬-এর মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্য দিকে সোসাইটির পক্ষ থেকে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন এবং অসমাপ্ত জেলা ইউনিটগুলোর নির্বাচন সম্পন্ন করে ডেলিগেট নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি আগের কমিশনের দায়িত্ব ও এখতিয়ার, ভোটার তালিকার নির্ভুলতা এবং ডেলিগেটদের বৈধতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও  গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন স্থগিতের পটভূমি
সোসাইটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তৎকালীন তিন মাস মেয়াদি অ্যাডহক ম্যানেজিং বোর্ডের মেয়াদ ও সাংগঠনিক বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় ১৭ সেপ্টেম্বর নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এ লক্ষ্যে তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠন করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেয়া হয়।
কিন্তু সোসাইটির ৬৮টি ইউনিটের মধ্যে ২৮টি জেলা রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের নির্বাচন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন না হওয়ায় কেন্দ্রীয় নির্বাচনের ডেলিগেট মনোনয়ন ও তাদের বৈধতা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। অ্যাডহক কমিটি এবং আগে নির্বাচিত কয়েকটি ইউনিট কমিটির প্রতিনিধিত্ব নিয়েও আপত্তি ওঠে। এসব বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সংক্ষুব্ধ পক্ষ আদালতের শরণাপন্ন হয়। ফলে ভোটার তালিকার নির্ভুলতা, ডেলিগেটদের বৈধতা এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আরো জোরালো হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলনের অংশীদার ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি) এবং ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেড ক্রসের (আইসিআরসি) উদ্বেগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
এ পরিস্থিতিতে ভোটার তালিকা ও ডেলিগেটদের বৈধতা নিয়ে বিরোধ, অসমাপ্ত ইউনিট নির্বাচন এবং আইনি জটিলতা বিবেচনায় নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কর্তৃপক্ষের অবস্থান অনুযায়ী, নির্বাচনটি পিও-২৬ অব ১৯৭৩, অনুমোদিত নির্বাচন নির্দেশিকা এবং প্রযোজ্য বিধিবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। বৈধ প্রতিনিধিত্ব ও আইনগত গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত না করে নির্বাচন আয়োজন করলে পরবর্তী সময়ে আরো বিরোধ সৃষ্টির আশঙ্কা ছিল।
এর ধারাবাহিকতায় ১০ সেপ্টেম্বর জারি করা নোটিশে ১৭ সেপ্টেম্বরের বিশেষ সাধারণ সভা ও নির্বাচন স্থগিত করার পাশাপাশি তৎকালীন নির্বাচন কমিশন বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। পরে ১৪ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট নোটিশগুলোর কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। এরপর আপিল বিভাগের আদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়সীমা নির্ধারণ ও সংশোধনের বিষয়টি সামনে আসে।
২৯ সেপ্টেম্বরের চিঠি : আর কোনো করণীয় নেই
নির্বাচন কমিশনের স্মারক নম্বর বিডিআরসিএস/ম্যাংবোর্ড/নির্বাচন/২০২৬-৫১, তারিখ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর চিঠিতে নির্বাচন পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার কারণে কমিশনের আর কোনো করণীয় নেই বলে জানানো হয়। একই সাথে নির্বাচনসংক্রান্ত দায় বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ওপর বর্তাবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
চিঠির বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়, তৎকালীন পরিস্থিতিতে কমিশন নির্বাচন পরিচালনায় নিজেদের কার্যকর ভূমিকার সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছিল। কিন্তু মাত্র ১৫ দিন পর একই কমিশন যখন নির্বাচনের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতির কথা জানায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- এই সময়ের মধ্যে কী পরিবর্তন ঘটেছিল? কমিশন কি নতুন কোনো নির্দেশনা পেয়েছিল, নাকি আদালতের আদেশের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে তাদের অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে? এ বিষয়ে কমিশনের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
১৪ অক্টোবরের চিঠি :  পূর্ণ প্রস্তুত কমিশন
১৪ অক্টোবর জারি করা স্মারক নম্বর বিডিআরসিএস/ম্যাংবোর্ড/নির্বাচন/২০২৬-৬১-এ কমিশন জানায়, আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তারা নির্বাচন পরিচালনায় পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। চিঠিতে স্থগিত পর্যায় থেকে নির্বাচনী কার্যক্রম পুনরায় শুরু এবং ২৫ বা ২৬ অক্টোবর বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাবও দেয়া হয়।
চিঠিটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এতে ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী অধ্যাপক ডা. মো: রফিকুল কবিরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সর্বশেষ অবস্থা জানানো হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই কমিশনের দু’টি চিঠিতে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ও প্রস্তুতি সম্পর্কে ভিন্ন অবস্থান প্রকাশিত হওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি স্পষ্ট করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, কমিশনের পরবর্তী চিঠিতে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়ে থাকলে, সেই দ্বিধার কারণ, প্রকৃতি এবং তা নিরসনের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা জরুরি। আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে কমিশনের দায়িত্ব ও এখতিয়ার কিভাবে নির্ধারিত হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
আপিল বিভাগের নির্দেশনা ও ২৬ অক্টোবরের সময়সীমা
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের আদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়সীমা ৮ অক্টোবর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে বিডিআরসিএসের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৬ অক্টোবরের আদেশে আগের নির্দেশ সংশোধন করে ২৬ অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয়া হয়।
আদালতে আবেদনকারীর আইনজীবীর বক্তব্য হিসেবে উঠে আসে, প্রতিটি ইউনিট থেকে উপযুক্ত ডেলিগেট নিশ্চিত করা এবং নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। এ বক্তব্য নির্বাচনী প্রস্তুতি ও প্রতিনিধিত্বের বৈধতা নিয়ে বিদ্যমান জটিলতার গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে আইনজীবীর বক্তব্য, আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশনা পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ দিকে সোসাইটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগের নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করায় অনুমোদিত নির্বাচন নির্দেশিকা অনুসরণ করে নতুন কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সমাজকল্যাণ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ৬৮টি ইউনিটকে যেসব স্থানে নির্বাচন বাকি রয়েছে, সেখানে ১৬ অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করে ডেলিগেট নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এখানেই নতুন প্রশ্নের অবতারণা হয়েছে। নতুন কমিশন গঠনের উদ্যোগ চলমান থাকলে আগের কমিশন কী ভিত্তিতে ১৪ অক্টোবর নির্বাচনের পূর্ণ প্রস্তুতির কথা জানাল? নতুন কমিশন গঠন এবং আগের কমিশনের কার্যক্রমের মধ্যে দায়িত্বগত কোনো সমন্বয় হয়েছিল কি না, কিংবা আদালতের নির্দেশনার আলোকে কমিশনের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল কি না- এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
ভোটার তালিকা, ডেলিগেটের বৈধতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে অভিযোগ
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ভোটার তালিকার গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ রয়েছে। ব্যবস্থাপনা পর্ষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের পক্ষ থেকে সোসাইটির কর্তৃপক্ষের কাছে দু’টি পৃথক লিখিত আবেদন ও অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগগুলোতে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো কোনো প্রার্থীকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটার তালিকা তৈরির পদ্ধতি এবং নির্বাচনী সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছেন।
স্বচ্ছ নির্বাচনই আস্থার ভিত্তি
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি দুর্যোগ মোকাবেলা, মানবিক সহায়তা, রক্তদান কর্মসূচি এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পর্ষদ নির্বাচন তাই কেবল নেতৃত্ব নির্ধারণের বিষয় নয়; এর সাথে সুশাসন, জবাবদিহি, সাংগঠনিক স্থিতিশীলতা এবং জনআস্থাও জড়িত।
নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করতে ভোটার তালিকা ও ডেলিগেটদের বৈধতা যাচাই, আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ও এখতিয়ার স্পষ্ট করা এবং সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
সার্বিক পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ও সোসাইটির কর্তৃপক্ষের কাছে প্রত্যাশা, তারা ২৯ সেপ্টেম্বর ও ১৪ অক্টোবরের চিঠিতে প্রকাশিত অবস্থানের পার্থক্য, কমিশনের বর্তমান দায়িত্ব এবং নতুন কমিশন গঠনের উদ্যোগ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেবেন। একই সাথে ভোটার তালিকা, ডেলিগেটদের বৈধতা ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর জবাব দেবেন।
২৬ অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করা যেমন আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নির্বাচনটি আইনসম্মত, স্বচ্ছ ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য হওয়াও সমান জরুরি। নির্ধারিত সময়সীমা রক্ষার পাশাপাশি বৈধ প্রতিনিধিত্ব, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে তবেই এই মানবিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করছেন।