দারিদ্র্যসীমার নিচে ২৭.৯৩ শতাংশ ঝুঁকিতে ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ

 বিশেষ সংবাদদাতা

Advertisement

বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার বাড়ার পাশাপাশি দারিদ্র্যসীমার ঠিক উপরে থাকা বিপুলসংখ্যক মানুষও অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে রয়েছেন। পরিবারের আয়-ব্যয়ের ব্যবধান সঙ্কুচিত হয়ে আসা, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার চিকিৎসা ব্যয়, ঋণের বোঝা, অপর্যাপ্ত কর্মসংস্থান এবং দৈনন্দিন সেবায় হয়রানি মানুষের আর্থিক নিরাপত্তাকে দুর্বল করে তুলছে। একই সাথে আয়বৈষম্য বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সীমিত আওতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নতুন গবেষণাগ্রন্থ ‘স্টেট অব দ্য রিয়েল ইকোনমি : ডাইনামিক্স অব রিভার্সালস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’-এ উঠে এসেছে এসব তথ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের মে মাসে দেশে মাঝারি দারিদ্র্যের হার ছিল ২৭.৯৩ শতাংশ, যা ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশের তুলনায় বেশি। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হার ৫.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯.৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ১৭.৯৭ শতাংশ পরিবার ‘ঝুঁকিপ্রবণ অদরিদ্র’ শ্রেণীতে রয়েছে। পরিবারগুলোর সদস্যসংখ্যা ও জাতীয় পরিবারের আনুমানিক হিসাব বিবেচনায় এ শ্রেণীর মানুষের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি ১০ লাখ। তারা বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার উপরে থাকলেও আয় কমে যাওয়া, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা অন্য কোনো আকস্মিক আর্থিক ধাক্কায় আবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁঁকিতে রয়েছেন।
আয়-ব্যয়ের ব্যবধান মাত্র ৭০ টাকা
জরিপে দেখা গেছে, একটি গড় বাংলাদেশী পরিবারের মাসিক আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা এবং ব্যয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা। অর্থাৎ মাস শেষে পরিবারের হাতে থাকে মাত্র ৭০ টাকা। আয় ও ব্যয়ের এই সামান্য ব্যবধান পরিবারের আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে।
নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর পরিস্থিতি আরো সঙ্কটপূর্ণ। সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ পরিবারের মাসিক গড় আয় আট হাজার ৪৭৭ টাকা, অথচ ব্যয় ১২ হাজার ২৯৪ টাকা। অর্থাৎ এই পরিবারগুলো প্রতি মাসে আয়ের চেয়ে নি হাজার ৮১৭ টাকা বেশি ব্যয় করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিচের ৪০ শতাংশ পরিবারের আয় তাদের ব্যয়ের তুলনায় কম। প্রকৃত উদ্বৃত্ত রয়েছে মূলত শীর্ষ ২০ শতাংশ পরিবারের মধ্যে।
পরিবারের মোট ব্যয়ের ৫৪.৯ শতাংশ খাবারের পেছনে যায়। গ্রামীণ পরিবারে এ হার ৫৭.৩৫ শতাংশ। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতসহ অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর জন্য পরিবারের হাতে সীমিত অর্থ অবশিষ্ট থাকে।
বৈষম্য বেড়েছে, গ্রামে দারিদ্র্য বেশি
পিপিআরসির জরিপে গ্রামীণ এলাকায় দারিদ্র্যের হার ৩১.৫৮ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ১৯.৬৬ শতাংশ পাওয়া গেছে। চরম দারিদ্র্য ও মাঝারি দারিদ্র্য মিলিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বড় অংশ গ্রামে বসবাস করছে।
গবেষণায় ব্যয়ভিত্তিক গিনি সহগ ০.৪৩৬ পাওয়া গেছে, যা ২০২২ সালের ০.৩৩৪-এর তুলনায় বেশি। শহরাঞ্চলে এ সহগ ০.৫৩২ এবং গ্রামে ০.৩৪৭। আয় ও ব্যয়ের বণ্টনে বৈষম্যের এই চিত্র অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে।
গবেষকদের হিসাবে, দারিদ্র্যের বিস্তার ঘটলেও অনেক পরিবার দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। ফলে সামান্য আর্থিক সহায়তায় তাদের অবস্থার উন্নতি সম্ভব হলেও বিপরীতভাবে ছোট কোনো ধাক্কাও তাদের আবার দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ঋণের চেয়ে সঞ্চয় কম
জরিপে পরিবারপ্রতি গড় ঋণের পরিমাণ এক লাখ ৮৯ হাজার ৩৩ টাকা এবং গড় সঞ্চয় এক লাখ ৩০ হাজার ৭২৮ টাকা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ গড় ঋণ সঞ্চয়ের তুলনায় ৪৪.৬ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে ঋণ ও সঞ্চয়ের ব্যবধান ২১৮ শতাংশ।
জরিপের আগের ছয় মাসে নিচের ৪০ শতাংশ পরিবারের নিট  ঋণ ৭ শতাংশ বেড়েছে। ঋণের ২৯.৩৩ শতাংশ নেয়া হয়েছে সংসারের ভোগব্যয় মেটাতে এবং ১০.৭৫ শতাংশ চিকিৎসার জন্য। উৎপাদনশীল কাজে ঋণের তুলনামূলক কম ব্যবহার পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পথে বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, ৫২.৫ শতাংশ পরিবারের অন্তত একজন সদস্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত। সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ৫৫.৩ শতাংশ। জরিপের আগের এক বছরে আর্থিক সঙ্কটে পড়া পরিবারগুলোর ৬৭.৪ শতাংশ চিকিৎসা ব্যয়কে সঙ্কটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ২০২৩ সালে দেশের স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৯.৩১ শতাংশ মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে মেটানোর তথ্যও গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে।
কাজ থাকলেও পর্যাপ্ত কর্মঘণ্টা নেই
জরিপ অনুযায়ী, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের ৫২.৩৩ শতাংশ আগের সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টা কাজ করেছেন। পুরুষদের মধ্যে এ হার ৮১.১৫ শতাংশ, নারীদের মধ্যে ২৫.৫৫ শতাংশ।
কর্মজীবীদের ৩৭.৭ শতাংশ সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার কম কাজ করেন। নারী কর্মীদের ক্ষেত্রে এ হার ৬৫.৫ শতাংশ, পুরুষদের ক্ষেত্রে ২৮.১ শতাংশ। কর্মসংস্থানের ৪৪.৯ শতাংশ আত্মকর্মসংস্থান এবং ১৮.১ শতাংশ দিনমজুরিভিত্তিক। নিয়োগকর্তা হিসেবে কাজ করেন মাত্র ৩.১ শতাংশ।
গবেষণায় ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়লেও এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে প্রতি ইউনিটে গড় কর্মসংস্থান ৩.১ থেকে কমে ২.৬ হয়েছে। গবেষকরা এ পরিস্থিতিকে ক্ষুদ্র উদ্যোগের ফাঁদ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
দৈনন্দিন সেবায় হয়রানির ব্যাপকতা
গবেষণায় স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে ৪৮.৯ শতাংশ পরিবার হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। বাজারে হয়রানির কথা বলেছে ৪১.৫ শতাংশ পরিবার, সরকারি সেবায় ২১.৬ শতাংশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৮.৪ শতাংশ।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৭৪.৬ শতাংশ ‘টাকা না দিলে কিছুই চলে না’- এ বক্তব্যকে হয়রানির সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল রূপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
২০২৪ সালের আগস্টের পর ঘুষ বা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ কমার তথ্য পাওয়া গেলেও অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের কাঠামো পুরোপুরি দূর হয়নি বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময়ের পর অর্থ আদায়ের অভিযোগের ক্ষেত্রে সরকারি দফতরের কথা বলেছেন ৪৬.৭৬ শতাংশ, পুলিশের কথা ৩৯.৩৭ শতাংশ এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কথা ৩৩.১৩ শতাংশ। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে আগের হার ছিল ২৪.৯৮ শতাংশ।
এ ছাড়া নিয়মকানুন নিয়ে বিভ্রান্তির কারণে অর্থ দিতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন, এমন উত্তরদাতার হার ৮.৫৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২১.০৯ শতাংশ হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তার সীমিত আওতা
গবেষণায় দেখা গেছে, ঝুঁকিপ্রবণ অদরিদ্র পরিবারগুলোর মাত্র ২৭.৫ শতাংশ কোনো না কোনো সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পায়। সামগ্রিকভাবে প্রায় ২৩.৫ শতাংশ পরিবার সরকারি নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী। যোগ্য দরিদ্র পরিবারের মধ্যে ফেয়ার প্রাইস কার্ড পাওয়ার হার মাত্র ৫.৩ শতাংশ।
সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধাভোগীদের প্রায় ৪৪ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার উপরে রয়েছেন। অন্য দিকে রেমিট্যান্স পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও বৈষম্য রয়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ পরিবারের মধ্যে ৩.৫ শতাংশ রেমিট্যান্স পায়, যেখানে সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ১৭.৮ শতাংশ।
পরিবারের আয়ের ১৮.৩ শতাংশ আসে ব্যক্তিগত সহায়তা থেকে। বিপরীতে সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অবদান ১ শতাংশেরও কম বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পিপিআরসির ‘স্টেট অব রিয়েল ইকোনমি’ জাতীয় খানা জরিপের ভিত্তিতে গ্রন্থটি তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের ৮ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দেশের আটটি বিভাগের গ্রামীণ ও শহুরে এলাকার আট হাজার ৬৭টি পরিবারের ওপর জরিপ চালানো হয়। নমুনা কাঠামো তৈরিতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর মাস্টার স্যাম্পল ব্যবহার করা হয়েছে।