
- বাংলাদেশের অনুরোধে ভারত আইনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে
- রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেরও ফাঁকফোকর রয়েছে
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরা নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনীতিতে নানা হিসাব-নিকাশ রয়েছে। শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার প্রক্রিয়াগত বিষয়ে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ফিরতে হবে বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। যদিও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইনগত বিষয় নয়। এখানে ভারত সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেরও বিষয় রয়েছে। ২০১৩ সালে প্রত্যর্পণ চুক্তির পর ২০১৬ সালে একটি ধারায় সংশোধনী আনা হয়। ওই সংশোধনীতে রাজনৈতিক চরিত্রের অপরাধের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রাখা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ভারত সরকারের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণে রাজনীতির মারপ্যাঁচ রয়েছে। তার দেশে ফেরা নির্ভর করছে সেখানকার সরকারের অনেকটা সদিচ্ছার ওপর।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রত্যার্পণ মূলত একটি আইনি কাঠামো দিয়ে শুরু হলেও (যেখানে আদালত প্রমাণ ও দলিলাদি যাচাই করে), এর চূড়ান্ত বাস্তবায়ন বা প্রত্যাখ্যান অনেকাংশেই ভারতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং কৌশলগত অবস্থানের ওপর নির্ভর করছে। আইনি মারপ্যাঁচ কিংবা ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ সংক্রান্ত ধারা ব্যবহার করে যেকোনো আবেদন দীর্ঘায়িত বা বাতিল করার পূর্ণ সুযোগ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের হাতে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার বিষয়টিও ভারত সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।
তাছাড়া ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার বন্দী প্রত্যার্পণ প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়টি আইনি ও ভূ-রাজনৈতিক, উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। এই দুই দিকের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে একটি অর্থবহ ধারণা পাওয়া যেতে বলে মনে করেন সংবিধান ও রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
আইনি প্রক্রিয়া
চুক্তি ও আইন : ২০১৩ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি বন্দী প্রত্যার্পণ চুক্তি (ঊীঃৎধফরঃরড়হ ঞৎবধঃু) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ভারতের ক্ষেত্রে এটি মূলত ‘দ্য এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট, ১৯৬২’ এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
প্রমাণ ও তথ্যাদি : প্রত্যার্পণের আবেদন জানাতে হলে নির্দিষ্ট অপরাধের পক্ষে যথেষ্ট প্রাথমিক প্রমাণ বা ঢ়ৎরসধ ভধপরব প্রমাণ এবং তদন্তকারী কর্মকর্তার হলফনামা ও আইনি নথি যথাযথ আদালতের মাধ্যমে জমা দিতে হয়।
ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকা : কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে এ বিষয়ে তদন্ত ও শুনানি হয়। আদালতের সন্তুষ্টি সাপেক্ষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হয়।
রাজনৈতিক অপরাধের ব্যতিক্রম : ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যার্পণ চুক্তিতে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে, যার মধ্যে ‘রাজনৈতিক চরিত্রের অপরাধ’ (ড়ভভবহপব ড়ভ ধ ঢ়ড়ষরঃরপধষ পযধৎধপঃবৎ) হিসেবে গণ্য হলে প্রত্যার্পণ স্থগিত বা প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ থাকে। এ ছাড়া দ্বৈত অপরাধের নীতি (উঁধষ ঈৎরসরহধষরঃু) বজায় থাকাও আবশ্যক।
ভারতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত
সার্বভৌম ক্ষমতা : আইনি প্রক্রিয়া থাকলেও শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানো হবে কি হবে না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করে আশ্রয়দাতা দেশের (যেমন : ভারত) সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কৌশলগত অবস্থানের ওপর।
রাজনৈতিক আশ্রয় ও পরিস্থিতি : বিশেষ পরিস্থিতিতে (যেমন ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা ট্র্যাজিক পরিস্থিতির সময়) কোনো রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতা বা ব্যক্তিকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়া বা রক্ষা করার ক্ষেত্রে ভারত সরকার ভূ-রাজনৈতিক কৌশল ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও এ বিষয়টি প্রাধান্য পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সময়সীমা ও অনিশ্চয়তা : রাজনৈতিক বিবেচনার কারণে প্রত্যার্পণ মামলার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে না। এটি কূটনৈতিক সম্পর্ক, উভয় দেশের সরকারের পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘ সময় ঝুলিয়ে রাখা হতে পারে।
এ দিকে ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যে আবারো নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ভারত। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ একটি আইনি বিষয়। সম্প্রতি নয়া দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ একটি আইনি বিষয়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।
সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের নজিরবিহীন পতনের পর দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। এর পর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। তাকে দেশে ফেরাতে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। ভারত গত জুলাইয়ে জানিয়েছিল, সেই অনুরোধ তারা পেয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পরীক্ষা করছে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে দুই দেশের ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৬ সালে ওই চুক্তির একটি ধারা সংশোধন করে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া আরো সহজ ও দ্রুত করার ব্যবস্থা করা হয়। সংশোধনের পর প্রত্যর্পণের অনুরোধের ক্ষেত্রে অপরাধের বিস্তারিত প্রমাণ দাখিলের বাধ্যবাধকতা কমানো হয় এবং সংশ্লিষ্ট আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানাকে গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে চুক্তিতে প্রত্যর্পণ না করার কিছু সুযোগও রাখা রয়েছে। চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় রাজনৈতিক চরিত্রের অপরাধের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সাথে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, অপহরণ, সন্ত্রাসবাদসহ বেশ কিছু গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করার কথাও বলা হয়েছে। আবার ৮ নম্বর ধারায় অভিযোগ সৎ উদ্দেশ্যে এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে করা হয়নি বলে মনে হলে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রয়েছে।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক মামলা রয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন দমনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। যদিও শেখ হাসিনা ওই বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেন। এই মৃত্যুদণ্ডের পরও ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দেয়ার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। বরং নয়াদিল্লির বক্তব্য হলো, বিষয়টি আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ দিকে গত ৩ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারও জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ আইনি পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে এবং তার বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ভারত দিতে পারছে না। ফলে গত বুধবারের বক্তব্যে নতুন কোনো প্রত্যর্পণ সিদ্ধান্তের ঘোষণা না থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। শেখ হাসিনাকে ফেরানোর প্রশ্নে ঢাকা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে যতই চাপ দিক, নয়াদিল্লি আপাতত বিষয়টিকে আইনি কাঠামোর মধ্যেই রাখতে চাইছে। একই সাথে বাংলাদেশ সরকারের সাথে ভবিষ্যৎমুখী ও গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার বার্তাও দিয়েছে ভারত।
বিশেষজ্ঞ মতামত
বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ ইকতেদার আহমেদ বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে ফিরতে হলে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ফিরতে হবে। তবে এখানে ভারতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তি অনুযায়ী ভারত সরকার যদি মনে করে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে, বাংলাদেশে ফিরলে তাকে হয়রানি করা হতে পারে সেক্ষেত্রে ভারত সরকার চাইলে তাকে নাও পাঠাতে পারে।
বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম মনে করেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা না ফেরার বিষয়টি যতটুকু তার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে তারচেয়ে বেশি সদিচ্ছা থাকতে হবে ভারত সরকারের। কারণ গত ১৭ বছর শেখ হাসিনা ভারতকে যা দিয়েছে তারা আজীবন মনে রাখবে- এই কথাটা শেখ হাসিনা নিজেও বলেছেন। ফলে শেখ হাসিনা ভারত সরকারের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে তার পূর্ণ নিরাপত্তা না পেলে কখনোই ভারত সরকার বাংলাদেশে তাকে পাঠাতে সম্মত হবে না। আইনি কাঠামোর অজুহাত দিয়ে রাজনীতির মারপ্যাচে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা আটকে যেতে পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








