রাজনীতি নিয়ে তরুণদের প্রত্যাশা
  •  সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন চায়
  •  জনসংখ্যার প্রায় ২৬ শতাংশ তরুণ
  •  ২০৩৬ সালে তরুণ জনসংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে তরুণেরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। গণ-অভ্যুত্থানে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রাজনীতি নিয়ে তাদের আগ্রহ ও প্রত্যাশাকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল। তবে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ধীরগতি, জুলাই গণহত্যার বিচার, গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে তরুণদের একাংশের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে আগ্রহে ভাটা পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক সংস্কারের দৃশ্যমান অগ্রগতিই তরুণদের জাতীয় রাজনীতির প্রতি আগ্রহ বাড়াতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ভোটারের মধ্যে জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী তরুণ ভোটারের সংখ্যা প্রায় চার কোটি ৩২ লাখ। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ। অন্য দিকে বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৬ শতাংশ তরুণ, যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। এই বয়সী জনসংখ্যা প্রায় চার কোটি ৭০ লাখ। প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩৬ সালে দেশে তরুণ জনসংখ্যার আকার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে।
ভোট দেয়া নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে ভোটারদের। তবে এসব প্রত্যাশার বাস্তবায়ন কতটা দৃশ্যমান হচ্ছে, তা নিয়ে তরুণদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন ও হতাশা তৈরি হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক দল ও সরকার প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি, ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীনতার নীতি নিশ্চিত করবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিস আব্দুল্লাহ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও সেগুলো বাস্তবায়ন করছে না। আওয়ামী লীগ মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছে, বিএনপিও প্রতিশ্রুতি দিয়ে একই পথে হাঁটছে। এবার ভেবেছিলাম, বর্তমান সরকার সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভাঙবে। কিন্তু আমরা হতাশ হয়েছি। শেষ পর্যন্ত যে দলই ক্ষমতায় আসুক, মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ওপর ভর করেই ক্ষমতায় আসছে। ফলে ৫ আগস্টের পর তরুণদের মধ্যে যে রাজনৈতিক উদ্দীপনা তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই কমে গেছে। তরুণেরা এখন নিজেদের ব্যক্তিগত কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন।
তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তরুণদের মধ্যে দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, নির্বাচনের পর তা অনেকটাই কমে গেছে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিম শেয়ার করলেও অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়তে হয়।
অন্য দিকে কবি নজরুল সরকারি কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আজিজুল হাকিম চেয়েছিলেন বৈষম্যমুক্ত সমাজ। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের বিপ্লবের মূল প্রতিপাদ্য ছিল বৈষম্যমুক্ত সমাজ। চাকরির ক্ষেত্রে মেধার মূল্যায়ন হবে, কিন্তু তা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, নিরপরাধ ব্যক্তিরা মুক্তভাবে চলাফেরা করতে পারবেন এবং সবাই তাদের অধিকার ফিরে পাবেন। প্রত্যেক নাগরিক নির্ভয়ে নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলবেন। 
আজিজুল হাকিম বলেন, প্রবাসীদের অধিকার নিয়ে কথা বলায় মেজর (অব:) আখতারুজ্জামানকে কারাগারে যেতে হয়েছে। অথচ প্রকৃত অপরাধী, ধর্ষক ও খুনিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতি আমাদের হতাশ করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোস্তাকিম বিল্লাহ বলেন, মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো তরুণদের নতুন চিন্তাভাবনাকে জায়গা দিচ্ছে না। তারা এখনো পুরনো ধারার গৎবাঁধা রাজনীতিকেই আঁকড়ে ধরে আছে। সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয়করণ, দখল, মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ ও বাকস্বাধীনতা সঙ্কুচিত করার মতো বিষয়গুলো অনেকটাই আগের মতো রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, বিরোধী দলও তরুণদের নতুন চিন্তাভাবনার আলোকে কাজ করতে পারছে না। সরকারের ভুলগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ প্রতিবাদও করতে পারছে না। অন্য দিকে, তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে পুরনো ধারার কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতিতে আটকে আছে।
সংস্কার, জুলাই গণহত্যার বিচার, গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে তরুণদের বেশির ভাগ রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি, দখলদারি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনীহা এবং হত্যাকারীদের প্রকাশ্যে চলাফেরা তরুণদের গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে। ফলে রাজনীতির প্রতি আস্থা হারাচ্ছে তরুণরা। এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া তাদের মধ্যে রাজনৈতিক আগ্রহ সৃষ্টি করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম মনে করেন, সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ধীরগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডে হতাশার কারণে তরুণদের মধ্যে রাজনীতির প্রতি অনীহা বাড়ছে। তার মতে, বর্তমান সরকারের বিভিন্ন অঙ্গীকার বাস্তবায়িত না হওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব তরুণদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পারিপার্শ্বিক বাস্তবতায় দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি ও অপরাধের বিস্তার দেখে তরুণদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে।
অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, অতীতে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ছাত্রলীগের নিপীড়ন ও অনিয়মের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনীতিবিমুখতা সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমানেও শিক্ষাঙ্গনে একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে প্রশাসনের দলীয়করণ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের অভিযোগ থাকায় তরুণেরা প্রত্যাশিত ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন না। ফলে রাজনীতি নিয়ে তাদের হতাশা বাড়ছে।
তার মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠার পেছনে সামাজিক পূর্বধারণা, ভীতি ও স্বার্থের সঙ্ঘাতও ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে, জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত কিছু পূর্ব ধারণা ও ভীতির কারণে বৃহত্তর তরুণ সমাজের একটি অংশ দলটিকে সহজে গ্রহণ করতে পারে না। অন্য দিকে অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তন হলে নিজেদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও কাজ করতে পারে। এ ছাড়া আইন প্রয়োগে বৈষম্য এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণের ধারণা তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ায়।
অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম আরো মনে করেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আচরণের মধ্যে অসঙ্গতি তরুণদের আস্থার সঙ্কটকে গভীর করছে। শীর্ষ নেতৃত্ব ইতিবাচক বক্তব্য দিলেও মাঠপর্যায়ে অনুসারীদের একাংশের আচরণে তার প্রতিফলন না থাকলে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। তার মতে, সমাজে কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা ও দলীয় আধিপত্যের প্রবণতা থেকেও বেরিয়ে আসা জরুরি।
মেজর (অব:) আখতারুজ্জামানকে গ্রেফতার ও হেনস্তার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রবাসীদের অধিকার নিয়ে কথা বলার পর তার সাথে যে আচরণ করা হয়েছে, তা অনুচিত। তার বক্তব্যে কোনো অসঙ্গতি থাকলেও আইনগত নোটিশ বা অন্য উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় বিষয়টি মোকাবেলার সুযোগ ছিল। অন্য দিকে হত্যা ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ার অভিযোগ এবং ভিন্ন মত প্রকাশকারীদের হয়রানির ধারণা তরুণদের ক্ষোভ আরো বাড়িয়ে তুলছে।

Advertisement

তরুণদের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম রাজনৈতিক সংস্কারের দৃশ্যমান বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, বিশেষ করে জুলাই সনদ আন্তরিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এবং রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কার্যকর সংস্কার নিশ্চিত করলে তরুণ ও যুবসমাজের অন্তত একটি অংশ আবার ইতিবাচকভাবে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হতে আগ্রহী হতে পারে। এ জন্য প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি সুশাসন, জবাবদিহি, আইনের সমান প্রয়োগ এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।