
এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি বিএনপির মাঠপর্যায়ের রাজনীতি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলটির কিছু অতি উৎসাহী নেতাকর্মীর মধ্যে রাতারাতি ক্ষমতা, সম্পদ ও আধিপত্য দখলের যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য চরম বিব্রতকর।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দলটির সরকার গঠনের পর সবচেয়ে বড় চাঞ্চল্য ও পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে এর তৃণমূল স্তরে। রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হওয়ার পর থেকেই বিএনপির মাঠের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে ক্ষমতার এক নতুন ও জটিল সমীকরণ। এক দিকে দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও বঞ্চিত নেতাদের মূল্যায়ন, অন্য দিকে সুযোগসন্ধানী ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনের চ্যালেঞ্জ- সব মিলিয়ে এক ভিন্ন সাংগঠনিক বাস্তবতার মুখে দল। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ক্ষমতার গতি-প্রকৃতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা আলোচনা।
সূত্র মতে, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে থাকা স্থানীয় ক্ষমতার উৎসগুলো- যেমন হাটবাজার, পরিবহন টার্মিনাল, স্থানীয় ব্যবসা ও উন্নয়ন প্রকল্প- এখন নতুন বিন্যাসের মুখোমুখি। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর তৃণমূল পর্যায়ে একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই শূন্যস্থান পূরণে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা অবতীর্ণ হয়েছেন। তবে এই ক্ষমতার বিন্যাসে সবচেয়ে বড় সমীকরণ হলো দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী বনাম নব্য প্রভাবশালীদের দ্বন্দ্ব। দীর্ঘদিন মামলা-হামলা ও জেল-জুলুম সহ্য করা কর্মীরা এখন শাসনব্যবস্থায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চান। অন্য দিকে দল সরকারে আসার পর অনেক নিষ্ক্রিয় বা নব্য সুবিধাবাদী অংশ ক্ষমতার কেন্দ্রে আসতে তৎপর হয়ে উঠেছে, যা তৃণমূলের ভেতর একধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত ক্ষমতার লড়াই তৈরি করেছে।
জানা গেছে, সরকার গঠনের পর সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান দিক হলো দলের হাইকমান্ড তথা প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের কড়া নজরদারি এবং ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে কেন্দ্র থেকে অভূতপূর্ব কঠোরতা দেখানো হচ্ছে। দলীয় দফতরের হিসাব অনুযায়ী, সরকার গঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত দলের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করা, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব বা বিশৃঙ্খলার অভিযোগে মূল দল ও অঙ্গসংগঠনের সহস্রাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বহিষ্কার, পদ স্থগিত কিংবা কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়েছে। শুধু ঢাকা মহানগরেই মিরপুরের একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি ভেঙে দেয়া হয়েছে এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ পদক্ষেপ তৃণমূলের সামনে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, দল সরকারে থাকলেও ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার করে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তৃণমূলের ক্ষমতার নতুন সমীকরণের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন (ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা ও পৌরসভা)। নির্বাচন কমিশন সূত্র অনুযায়ী, আগামী বছরের শুরুর দিকেই ধাপে ধাপে এসব নির্বাচন শুরু হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী মনে করেন, দীর্ঘদিন পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপি একটি বড় ঐতিহাসিক সুযোগের মুখোমুখি হলেও তাদের সামনে জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে। তৃণমূলের দীর্ঘদিনের কোন্দল মেটানো এবং আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করা দলটির জন্য এ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে একধরনের ‘ক্ষমতার ক্ষুধা’ থাকা স্বাভাবিক। এটিকে দক্ষতার সাথে লাগাম না টানলে তা সরকারের বড় সংস্কার এজেন্ডাগুলোকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান শৃঙ্খলার পাশাপাশি তৃণমূল কর্মীদের মনস্তত্ত্ব বোঝার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য কেন্দ্রের কঠোর অবস্থান অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে এটি করতে গিয়ে যেন দীর্ঘদিনের নিবেদিত ও ত্যাগী কর্মীরা নিজেদের বঞ্চিত মনে না করেন বা দল থেকে দূরে সরে না যান, সে দিকেও ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন। সামনেই স্থানীয় নির্বাচন। তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে যদি অসন্তুক্ষ বা হতাশা বাড়ে, তবে তারা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে পারে, যা নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলবে।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার গঠনের পর বিএনপির তৃণমূলের ক্ষমতার সমীকরণটি কেবল পদ-পদবি পাওয়ার লড়াই নয়; এটি মূলত নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও উপযোগিতা প্রমাণের পরীক্ষা। কেন্দ্র থেকে যেভাবে কঠোর সাংগঠনিক ছড়ি ঘোরানো হচ্ছে, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেশ বিরল ও ইতিবাচক। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ও পরামর্শ অনুযায়ী, কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা কমিটি বিলুপ্ত করেই তৃণমূলকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন পদ্ধতি। একই সাথে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়টিকেও তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন।
অনেকেই বলছেন, সাধারণ নেতাকর্মীরা একটি পরিচ্ছন্ন, দুর্নীতিমুক্ত, শোষণহীন ও স্থিতিশীল সরকারের স্বপ্ন দেখলেও কিছু অতি উৎসাহী নেতাকর্মীর আধিপত্য দখলের প্রতিযোগিতায় তারা হতাশ হতে শুরু করেছেন। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে বিএনপিকে সবার আগে দলের ভেতরে কঠোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রশাসনের ভেতরে থাকা অদৃশ্য অন্তর্ঘাতকদের মোকাবেলা করতে হবে অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান, কৌশলী ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হওয়ার পর থেকেই তৃণমূল নেতাদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি একধরনের দায়বোধ তৈরি হয়েছে। নিজ উদ্যোগে তারা ভোটারদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। রাস্তাঘাট মেরামত, স্কুল-কলেজের প্রয়োজনীয়তা এবং এলাকার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে করণীয় নির্ধারণে ভূমিকা রাখছেন। বিএনপি একটি বড় দল, তবে যারাই অপরাধে জড়াচ্ছে, কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না।’
নীতিনির্ধারকরা বলছেন, দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলটির জন্য নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে বিভিন্ন সময়ে কিছু নেতার অতি উৎসাহী কর্মকাণ্ড বা অনাকাক্সিক্ষত বিতর্কের কারণে দলকে দীর্ঘ সময় খেসারত দিতে হয়েছে। ফলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনোভাবেই সেই সুযোগ দিতে চায় না দল।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া বিএনপির জন্য নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নয়। সরকার গঠনের পরও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। এখন শুধু সাংগঠনিক শাস্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না সেই ব্যবস্থা। অভিযোগ গুরুতর হলে কোথাও কোথাও নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








