জেলে, জলদস্যু
সাগরে মাছ ধরতে না যেতে পারায় নদীতীরে অলস সময় পার করছেন জেলেরা : নয়া দিগন্ত। নয়া দিগন্ত


উত্তাল ঢেউ আর বৈরী আবহাওয়ার চরম ঝুঁকি উপেক্ষা করে জীবন-জীবিকার তাগিদে বঙ্গোপসাগরে পাড়ি জমান পটুয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলের জেলেরা। পরিবার-পরিজন ছেড়ে টানা কয়েক দিন, এমনকি সপ্তাহজুড়ে সাগরে অবস্থান করার একমাত্র উদ্দেশ্য- জাল ফেলে রুপালি ইলিশ শিকার করে সংসারের মুখে হাসি ফোটানো। কিন্তু হাড়ভাঙা খাটুনির পরও এই মেহনতি মানুষদের চোখে-মুখে এখন শুধুই দুশ্চিন্তার ছাপ। প্রকৃতির রুদ্র রূপের চেয়েও তাদের কাছে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে জলদস্যুদের তাণ্ডব। 
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার উপকূলীয় জেলেদের অভিযোগ, বঙ্গোপসাগরে আবার বেপরোয়া হয়ে উঠেছে দস্যুদল। তারা দল বেঁধে ট্রলারে চড়ে জেলেদের গতিরোধ করছে। এরপর অস্ত্র ঠেকিয়ে ইলিশ, জ্বালানি তেল, নগদ টাকা, মোবাইল ফোন এমনকি পুরো ট্রলার পর্যন্ত ছিনিয়ে নিচ্ছে। প্রতিবাদ করলে জোটে শারীরিক নির্যাতন। জলদস্যুদের এই ক্রমবর্ধমান উৎপাতের কারণে বর্তমানে জীবন রক্ষায় সাগরে যেতে পারছেন না শত শত জেলে। এতে করে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে তাদের আয়ের প্রধান পথ। 
সম্প্রতি রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজ মৎস্যঘাটে দেখা যায় শতাধিক ট্রলার নোঙর করে অলস সময় পার করছেন জেলেরা। জলদস্যুদের ভয়ে অনেকেই ক্যামেরার সামনে মুখ খুলতে রাজি হননি। আতঙ্কিত জেলেদের দাবি, দস্যুরা খুব ভয়ঙ্কর। পরিচয় দিলে ওরা আমাদের জানে মেরে ফেলবে।
২০১০ সাল থেকে সাগরে ইলিশ শিকার করা আলী আহম্মেদ নামের এক জেলে বলেন, সাগরে নাকি রোজ দুই-একটা ট্রলারে ডাকাতি হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে ট্রলার ঘাটে বেঁধে রেখেছি। ২০১৫ সালেও সোনারচরের দক্ষিণে দস্যুরা আমার ট্রলার আটকে গভীর সাগরে নিয়ে গিয়েছিল। লোহার রড দিয়ে মারধর করায় হাতের হাড্ডি ভেঙে যায়। এখনো হাতে এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকার চিকিৎসা বাকি। গত কিছু দিন পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত থাকলেও এখন আবার জলদস্যু বেড়েছে। সামনে মা ইলিশ রক্ষার নিষেধাজ্ঞা আসছে, তার আগেই যদি সাগরে নামতে না পারি, তবে না খেয়ে মরা ছাড়া উপায় নেই। 
আরেক জেলে ইব্রাহিম আকন জানান, সাগরে নামলেই দস্যুদের কবলে পড়ার নিশ্চিত ঝুঁকি রয়েছে। আঘাত করার পাশাপাশি সব কেড়ে নেয় তারা। অথচ সাগর ও নদীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কার্যকর টহল চোখে পড়ছে না। বাধ্য হয়ে ঘাটে বসেই দিন পার করতে হচ্ছে। এ দিকে গত বৃহস্পতিবার ডাকাত সন্দেহে ৯ জনকে আটক করে নৌপুলিশের কাছে সোপর্দ করেছেন ভুক্তভোগী জেলেরা। পরে তাদের বিরুদ্ধে মৎস্য আইনে মামলা করে নৌপুলিশ। 
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ও মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, জেলেরা যাতে নির্বিঘেœ জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন, বঙ্গোপসাগরে সেই নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। সামনে ইলিশ প্রজননের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে। এর ঠিক আগে জলদস্যুর ভয়ে সাগরে নামতে না পারাটা জেলেদের জন্য চরম আর্থিক ক্ষতি। এতে অনেক পরিবার ঋণের জালে আটকে পড়বে। জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর টহল জোরদার করা অতীব জরুরি।
রাঙ্গাবালী নৌপুলিশের ইনচার্জ আন নূর যায়েদ জানান, বঙ্গোপসাগরের গভীর এলাকা তাদের আওতাধীন নয়। তবে তাদের আওতাধীন এলাকায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি এবং কোনো জেলে লিখিত অভিযোগও দেননি। অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। রাঙ্গাবালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন জানান, বিষয়টি তিনি এরই মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন। জেলেরা যাতে কোনো আতঙ্ক ছাড়াই সাগরে মাছ ধরতে পারেন, সে জন্য কোস্ট গার্ড ও নৌপুলিশকে যৌথভাবে জোরদার অভিযান পরিচালনার জন্য অনুরোধ জানানো হবে।

Advertisement