
ডিসেম্বর যত এগিয়ে আসছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ততই আলোচনায় আসছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক তৎপরতা। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার মধ্যেই রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল, সমাবেশের চেষ্টা, আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে হোটেল-রেস্টুরেন্টে বৈঠক এবং পেশাজীবী সংগঠনের আড়ালে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য উপস্থিতির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে কি মাঠে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ? সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ বলছে, দলটি এখনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক সাংগঠনিক কাঠামোয় ফিরতে পারেনি। গেল সেপ্টেম্বরেই ঢাকার গুলশানে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় পুলিশ শতাধিক গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে। পুলিশের দাবি, মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। অবশ্য এ ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। তাদের মতে, প্রকাশ্য কর্মসূচির মাধ্যমে দলটির মূল লক্ষ্য হতে পারে সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাই, কর্মীদের মনোবল ধরে রাখা এবং নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাজনৈতিক অস্তিত্বের জানান দেয়া।
ডিসেম্বর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আওয়ামী লীগের জন্য ডিসেম্বর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাস হিসেবে মনে করেন তাদের নেতাকর্মীরা। বিজয়ের মাসকে ঘিরে দলীয় আবেগ, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং রাজনৈতিক প্রতীকের ব্যবহার, সবকিছুই আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য কর্মসূচির জন্য একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক পটভূমি তৈরি করতে পারে- এমনটিও ধারণা শীর্ষ নেতৃত্বের। এর সাথে যুক্ত হয়েছে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরকেন্দ্রিক বক্তব্য। জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের পলাতক কয়েকজন শীর্ষ নেতা ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানান। তবে শেখ হাসিনা সত্যিই ডিসেম্বরের মধ্যে ফিরবেন কি না, সেটি এখনো অনিশ্চিত এবং দলীয় শক্ত কোনো ভিত্তিও নেই। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ডিসেম্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে তার ফেরার সম্ভাব্য সময় নিয়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ আলোচনার কথাও উঠে এসেছে। তবে এগুলো এখনো দলীয় সূত্রনির্ভর দাবি। বরং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা দলীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয় করা এবং রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পতিত আওয়ামী লীগের মাঠের প্রস্তুতি কেমন?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে আওয়ামী লীগের প্রস্তুতিকে অন্তত তিনটি স্তরে দেখা যায়। প্রথমত, ছোট পরিসরে প্রকাশ্য উপস্থিতি। গুলশানের ঝটিকা মিছিলটি ছিল নিষেধাজ্ঞার পর দলটির নেতাকর্মীদের একটি উল্লেখযোগ্য প্রকাশ্য উপস্থিতি। পুলিশের হিসাবে সেখানে কয়েক শ’ মানুষ অংশ নেয়। এর আগে বিভিন্ন জায়গায় ছোট আকারে মিছিল, স্লোগান কিংবা দলীয় প্রতীকের উপস্থিতির ঘটনাও সামনে এসেছে।
দ্বিতীয়ত, নেতৃত্বের বিকল্প কাঠামো ধরে রাখার চেষ্টা। শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক সময়ে অনুপস্থিত অবস্থায় দলের সিনিয়র নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থাকার কথা জানিয়েছেন বলে এমনটি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এর মধ্য দিয়ে দলটির নেতৃত্বের প্রশ্নে একটি বার্তা দেয়ার চেষ্টা হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। যদিও শেখ সেলিমের নেতৃত্ব মেনে নেয়া বা মেনে না নেয়ার প্রশ্নে পতিত দলের অন্য প্রভাবশালী শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তৃতীয়ত, ডিসেম্বরকে রাজনৈতিক ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহার। শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে তার যোগাযোগ, দু’টিই ডিসেম্বরকে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলের সাথে যুক্ত করেছে। ফলে ডিসেম্বরের আগে দলটির সাংগঠনিক যোগাযোগ আরো দৃশ্যমান হয় কি না, সেটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
মাঠে ফেরার পথে বড় বাধা আইন
আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য মাঠে ফেরার সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে আইনি নিষেধাজ্ঞা। ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। নিষেধাজ্ঞার আওতায় মিছিল, সভা-সমাবেশ, সম্মেলন, প্রকাশনা এবং অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণাও রাখা হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার আইনি ভিত্তিও আরো শক্ত করা হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। এমনকি গত জুলাইয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ভিন্ন নাম বা ব্যানার ব্যবহার করেও আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে পারবে না। ফলে ডিসেম্বর ঘিরে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি নেয়া হলে সেটি সরাসরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সঙ্ঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
নতুন কৌশল কি ঝটিকা কর্মসূচি?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে একটি বিষয় লক্ষণীয়, বড় সমাবেশের পরিবর্তে কম সময়ের, দ্রুত সংগঠিত ও দ্রুত ছত্রভঙ্গ হওয়ার কর্মসূচি দেখা যাচ্ছে। গুলশানের ঘটনার মতো কর্মসূচি যদি ধারাবাহিক হয়, তাহলে এটিকে আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি পদ্ধতি হিসেবে দেখা যেতে পারে বলে মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্ট
রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের জন্য অনলাইন যোগাযোগ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনার বিভিন্ন সাক্ষাৎকার, দলীয় বক্তব্য এবং ডিসেম্বরকেন্দ্রিক বার্তা ইতোমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। এটি মাঠের সরাসরি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বিকল্প নয়। কিন্তু নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে যোগাযোগ, মনোবল ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যম হিসেবে বেশ সহজ এবং ঝুঁকিহীন বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তবে এখানেও আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলীয় প্রচারণার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নিরাপত্তা সংস্থার জন্য ডিসেম্বরের চ্যালেঞ্জ
সরকারের সামনে এখন দু’টি সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ। সেপ্টেম্বরের ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতাকর্মী প্রকাশ্যে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। একই সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে ডিসেম্বর ঘিরে কোনো ‘অশুভ শক্তি’ বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারবে না, এমন বক্তব্যও এসেছে। অন্য দিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকেও প্রশ্ন উঠেছে, নিষিদ্ধ একটি দল কিভাবে রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় কর্মসূচি পালনের সুযোগ পাচ্ছে। এসব অভিযোগের মধ্য দিয়ে ডিসেম্বরের আগেই রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।
আওয়ামী লীগ কি মাঠে ফিরতে পারবে?
আওয়ামী লীগ পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য কতটা প্রস্তুত তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। কারণ দলটির কার্যক্রম আইনগতভাবে নিষিদ্ধ, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বড় অংশ দেশের বাইরে বা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নজিরবিহীন পতনের পর দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব বিদেশে পালিয়ে যাওয়ায় দলটির প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর মতো চালিকাশক্তি আপাতত দৃশ্যমান নয়। তবে দলটি সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক মাঠ থেকে হারিয়ে যাওয়া ঠেকাতে মাঝে মধ্যে নানা ইস্যুতে সোশ্যাল মিডিয়ায় বক্তব্য বিবৃতি দিয়ে আলোচনায় থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক ঝটিকা কর্মসূচি, নেতৃত্বের বার্তা, ডিসেম্বরকেন্দ্রিক ফেরার ঘোষণা এবং বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মী-সমর্থকদের প্রকাশ্য উপস্থিতি, এসব ঘটনাও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরাবির্ভাবের প্রশ্নকে সামনে এনেছে। যদিও সম্প্রতি শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে ঢাকার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের প্রকাশ্য জমায়েতও প্রশাসনের নজরে এসেছে। তারপরও এই মুহূর্তে ‘আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে মাঠে ফিরবে কি না’ বা ‘ডিসেম্বর পর্যন্ত দলটি কতটা সংগঠিত হতে পারে এবং কতটা প্রকাশ্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে’ এটা রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি আলোচনার খোরাক যুগিয়েছে। ডিসেম্বর যত ঘনিয়ে আসছে, আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিয়ে ততই বাড়ছে আলোচনা। এখন দেখার বিষয়, ঘোষণার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত বাস্তবের মাঠে কতটা প্রতিফলিত হয়।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম মনে করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এ দেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি শেষ হয়ে গেছে। দুই বছরের মাথায় হঠাৎ ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে মূলত তিনি তার নেতাকর্মীদের মনোবল একটু উজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন। এ দিকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনার কথার ফাঁদে পড়ে মিছিল মিটিং করছেন, প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রমের স্বপ্ন দেখছেন, গোপনে মিলিত হয়ে বৈঠক করছেন আর এসব অপরাধে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে। তাদের পরিবার ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ রাজনীতি থেকে অনেকটা হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, তাদের অপকর্মের পাল্লা এত ভারী যে মানুষ তাদের শুধু ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে- এই অবস্থা থেকে আর উত্তোরণের কোনো পথ দেখি না। ঘোষণানুযায়ী, গণহত্যার নির্দেশদাতা শেখ হাসিনা যদি স্বেচ্ছায়ও ডিসেম্বরে ফিরে আসে তাহলে সাধারণ জনগণ তার ওপর কতটা চড়াও হবে সেটা সময়ই বলে দেবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








