
শুধু শীর্ষ সন্ত্রাসী নয়, অপরাধের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসছে কিশোর গ্যাংয়ের নাম। আগে ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক কারবার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ, জমি-ফ্ল্যাট দখল শীর্ষ সন্ত্রাসীরা করে থাকতেন। এখন সেসব ভয়ঙ্কর অপরাধ করছে কিশোর অপরাধীরা। তবে তাদের মাথার উপর থাকছে শীর্ষ সন্ত্রাসী বা রাজনৈতিক নেতাদের ছায়া। মুলত ভাড়াটিয়া হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া কিশোর অপরাধীদের উৎপাত এখন পৌছে গেছে দেশের প্রতিটি কোণায়।
সম্প্রতি কিশোর অপরাধীদের ঠেকাতে কড়া বার্তা দিয়েছে পুলিশ সদরদফতর। কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মেট্রোপলিটন এলাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে পুলিশ সদস্যদের কঠোর ভুমিকা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। শুধু পুলিশ সদরদফতরই নয়, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলামও কিশোর অপরাধ নির্মূলে তিন মাসের সময় বেঁধে দিয়েছেন। ইতিমধ্যে কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের বিপুল পরিমাণ সদস্য গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, কিশোর অপরাধী এবং তাদের শেল্টারদাতা চিহ্নিত করার কাজ প্রায় শেষের পথে। অনেক এলাকার কাজ শেষ হয়ে অপরাধীদের ধরতে অভিযানও শুরু হয়ে গেছে। তবে গোয়েন্দারা বলছেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা শুধু রাজনৈতিক নেতাদের হয়ে কাজ করে না, যারাই টাকা দেয় তাদের হয়ে কাজ করে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে কিশোর অপরাধ নির্মুল করা যাবে না। এর জন্য কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের যারা শেল্টার দিচ্ছে আগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
গোয়েন্দা তথ্যমতে, শেল্টারদাতারা পরিবর্তন হলেও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা একই থাকছে। বিগত সরকারের সময় স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনার ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের হয়ে কিশোর গ্যাংয়ের যেসব সদস্যরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছে এখনো প্রায় তারাই রয়েছে। শুধু পরিবর্তন হয়েছে শেল্টারদাতার। অবশ্য মাঠ পর্যায়ের কেউ কেউ সিনিয়র হয়ে এখন রাজনৈতিক নেতা হওয়ার দৌড়ে অংশগ্রহণ করছে।
প্রথম দিকে অ্যাডভেঞ্চার হিসাবে বড়ভাইদের পেছনে লাঠিসোটা নিয়ে ঘুরলেও এখন হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ছিনতাই, ফুটপাথ নিয়ন্ত্রণ, পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, ইভেন্ট নিয়ন্ত্রণ, অনলাইন প্রতারণা এমনকি ভাড়াটিয়া খুনি হিসেবেও আবির্ভূত হচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধমূলক উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা আসায় এই গ্যাংয়ে যুক্ত হচ্ছে বিপথগামী কিশোর-যুবকরা।
মূলত কাঁচা টাকার লোভেই পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, বেকার ও হতাশাগ্রস্ত কিশোর-যুবকরা ঝুঁকছে কিশোর গ্যাংয়ের দিকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘অ্যাডভেঞ্চার’ কিংবা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের নেশায় শিশুরাও হাতে তুলে নিচ্ছে অস্ত্র। ফলে একের পর এক ঘটছে হত্যাসহ নানা অপরাধমূলক ঘটনা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষ এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষ আতঙ্ক নিয়ে চলাফেরা করেন।
সূত্রমতে, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রক নেতাদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট। কোন নেতার ছত্রছায়ায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, ওই এলাকায় আগে কোন নেতা শেল্টার দিতেন, তা চিহ্নিত করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, অপরাধ বিশ্লেষক ও স্থানীয় সূত্র বলছে, এটি আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং তাদের আয়ের উৎস এখন বহুমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কম বয়সের সুযোগ নিয়ে অনেক সময় আইনগত জটিলতা এড়াতে বড় মাদক কারবারিরা কিশোরদের ব্যবহার করে। ফুটপাথের দোকান, কাঁচাবাজার, বাসস্ট্যান্ড, টেম্পুস্ট্যান্ড, ট্রাক টার্মিনাল, এমনকি নির্মাণাধীন ভবনসহ সবখানেই তারা ‘নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠা করে নিয়মিত টাকা আদায় করছে। অনেক এলাকায় ছোট ছোট গ্রুপ নিজেদের মধ্যে এলাকা ভাগ করে নিয়ে এই অর্থ আদায় করে থাকে। যখনই অন্য কোনো গ্রুপ সেখানে ভাগ বসাতে চেষ্টা করে, তখনই শুরু হয় দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ ও রক্তক্ষয়ী হামলা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং কিছু অসাধু প্রভাবশালীর প্রশ্রয়ে এসব নিয়ন্ত্রণ বাণিজ্য আরো শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
এ ছাড়াও আয়ের বড় একটি অংশ আসে মাদক কারবার থেকে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মূলত বড় সিন্ডিকেটের হয়ে ‘রানার’ বা খুচরা বিক্রেতা হিসেবে কাজ করে। ইয়াবা, গাঁজা ছাড়াও কিছু এলাকায় নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদক সরবরাহে তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে। এতে দ্রুত নগদ অর্থ পাওয়ার সুযোগ থাকায় কিশোররা সহজেই এতে জড়িয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদেরও মাদক পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় কিশোর গ্যাং এখন অনলাইন প্রতারণায়ও সক্রিয়। ফেসবুক বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে ভুয়া পেজ খুলে পণ্য বিক্রির নামে প্রতারণা, মোবাইল ব্যাংকিং ফিশিং, বিকাশ-নগদ অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, এমনকি গেমিং আইডি বিক্রির ছলনায় অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা বিদেশী প্রতারণা চক্রের কৌশল নকল করছে। সাইবার অপরাধ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ কিশোরদের একটি অংশ খুব সহজেই এই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এছাড়াও নিজেদের গ্যাংকে ‘ব্র্যান্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। টিকটক, ফেসবুক রিলস বা ইউটিউব শর্টস ব্যবহার করে তারা নিজেদের পরিচিতি বাড়ায়, যা নতুন সদস্য আকর্ষণ এবং ভয়ভীতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অস্ত্র প্রদর্শন, বাইক শোডাউন, মারামারির ভিডিও কিংবা প্রতিপক্ষকে হুমকি দিয়ে ভিডিও প্রকাশের প্রবণতাও বাড়ছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব কনটেন্ট থেকেই পরোক্ষ আয়ের পথও তৈরি হচ্ছে।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক গোলাম রব্বানী নয়া দিগন্তকে বলেন, দিন দিন কিশোর গ্যাং কালচার ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। কোনো না কোনো গডফাদার বা বড় ভাইয়ের ছত্রছায়ায় ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ছিনতাই, চুরিসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে আয় করছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বটবৃক্ষ হিসেবে বেছে নিচ্ছে এলাকার প্রভাবশালী কাউকে। তিনি বলেন, যেহেতু এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা কিশোর তাই সরকারি, বেসরকারিভাবে কিশোর উন্নয়ন সেন্টারে পর্যাপ্ত মোটিভেশন করা প্রয়োজন। একই সাথে সেখানে বৃত্তিমূলক কারিগরিসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে উন্নয়নমুলক কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন।
সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা সমূলে উৎখাত করা হবে। তিনি বলেন, আমরা কোনো হেলমেট বাহিনী দেখতে চাই না, হাতুড়ি বাহিনী তৈরির কোনো ইচ্ছা বর্তমান সরকারের নেই। আমাদের দায় চাপানোর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, শুধু কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধেই নয়, তাদের শেল্টার দেয়া গডফাদারদেরও বিরুধে অভিযান শুরু করা হয়েছে। এক্ষেত্রে যাদেরই নাম আসবে তাদের কেউ ছাড়া পাবে না।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








