
আলমগীর কবির
বেলা ৩টা ২৬ মিনিট। ভাইয়ের সাথে শেষ কথা বলেছিলেন সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী। ওপাশ থেকে ভাই মাহামুদুর রহমান সৈকত বলেছিলেন, ‘একটু পরে বাসায় চলে যাবো’। সেই ‘একটু পরে’ আর আসেনি। কিছুক্ষণ পর বাবার ফোনে এক সহযোদ্ধার কণ্ঠ ‘এই ফোনটি যার, সে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে, আপনারা দ্রুত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যান, অন্যথায় লাশও পাবেন না।’ একটি পরিবারের কাছে মুহূর্তেই বদলে যায় অপেক্ষার অর্থ; শুরু হয় হাসপাতালের মর্গে স্বজনের লাশ খোঁজার ছুটে চলা।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ১৮ ও ১৯ জুলাই ২০২৪ রাজধানীর ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৮ আসামির বিরুদ্ধে চলমান মামলায় এই বিবরণ দিয়েছেন সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী। গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের প্যানেলে নবম সাক্ষী হিসেবে তার জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
মামলাটিতে ১৮ ও ১৯ জুলাই ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় ৯ জনকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৮ জুলাই ফারহান ফাইয়াজ, মো: মাহিন মিয়া ও মো: রনিকে এবং ১৯ জুলাই আল শাহরিয়ার হোসেন, মো: রাজু আহমেদ, মাহামুদুর রহমান সৈকত, মো: ইসমাইল, মো: জসিম উদ্দিন ও জোবায়েদ হোসেন ইমনকে হত্যার ঘটনা এর আওতাভুক্ত। আসামিদের বিরুদ্ধে মোট তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
জবানবন্দীর শুরুতে নিজের পরিচয় দিয়ে সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী জানান, তিনি শহীদ মাহামুদুর রহমান সৈকতের বোন। সেবন্তী জবানবন্দীতে বলেন, ১৯ জুলাই ২০২৪ মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেয়ার সময় তার ভাই মাহামুদুর রহমান সৈকত পুলিশের গুলিতে নিহত হন।
ঘটনার সূত্রপাত হিসেবে ১৮ জুলাইয়ের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই দিন তার ভাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মা তাকে বাধা দেন। ওই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তন্নীকে ছাত্রলীগ নির্যাতন করেছে এমন দাবি করে তার রক্তাক্ত ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানান সেবন্তী। সেই ছবি দেখে তার ভাই আন্দোলনে যাওয়ার জন্য আরো ব্যাকুল হয়ে পড়েন।
সেবন্তীর ভাষ্যানুযায়ী, সৈকত নিজেও একজন ছাত্র ছিলেন এবং আন্দোলনটিকে ছাত্রদের ‘যৌক্তিক কোটাবিরোধী আন্দোলন’ হিসেবে মনে করতেন। সে কারণে তিনি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি। ওই দিন বিকেলে মাকে না জানিয়ে বন্ধু মো: আরাফাত হোসেনের সাথে আন্দোলনে যোগ দিতে বাসা থেকে বের হন সৈকত।
পরে আন্দোলনস্থল থেকে তিনি তার মাকে ফোন করে বাসার দরজা ও জানালা বন্ধ করে রাখতে বলেন বলে জবানবন্দীতে জানান সেবন্তী। কারণ আশপাশে ব্যাপক গোলাগুলি হচ্ছিল বলে সৈকত তার মাকে জানিয়েছিলেন। সেবন্তীর অভিযোগ, পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছিল।
তখন সৈকতের মা তাকে ধমক দিয়ে বাসায় ফিরে আসতে বলেন। সেবন্তীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন সন্ধ্যার পর সৈকত বাসায় ফিরে আসেন। সেবন্তী আরো জানান, ওই রাতেই ফেসবুকে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের খালার একটি পোস্ট ভাইরাল হয়। সেখানে ফারহান ফাইয়াজ গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছেন বলে লেখা ছিল। ওই পোস্ট দেখে তার ভাই আরো আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন বলে জানান তিনি।
পরদিন ১৯ জুলাই ২০২৪ শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে দুপুরের খাবার খেয়ে সৈকত নূরজাহান রোডের দক্ষিণ মাথায় স্টেপ জুতার দোকানের সামনে আন্দোলনে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন বলে জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন সেবন্তী। তিনি বলেন, ওই সময় তার মা বারবার সৈকতের মোবাইল ফোনে কল করলেও তিনি ফোন ধরছিলেন না। পরে মা তাকে ফোন করেন। তখন সেবন্তী বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারে ছিলেন। সেখান থেকে তিনি তার ভাইকে ফোন করলে সৈকত ফোনটি ধরেন।
সেবন্তীর ভাষ্যানুযায়ী, তিনি ভাইকে ধমক দিয়ে বাসায় ফিরে যেতে বলেন। জবাবে সৈকত জানান, তিনি একটু পরে বাসায় চলে যাবেন। ওই দিন ভাইয়ের সাথে সেটিই ছিল তার শেষ কথা। সেবন্তী জানান, শেষ কথোপকথনটি হয় বেলা ৩টা ২৬ মিনিটে। এর পরই পরিবারের কাছে আসে সৈকতের মৃত্যুর খবর।
জবানবন্দীতে সেবন্তী বলেন, তার বাবা বারবার সৈকতের মোবাইল ফোনে কল করছিলেন। একপর্যায়ে একজন সহযোদ্ধা ফোনটি রিসিভ করেন। ওই ব্যক্তি তার বাবাকে বলেন, ‘এই ফোনটি যার সে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে, আপনারা দ্রুত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যান, অন্যথায় লাশও পাবেন না।’ এই ফোন পাওয়ার পর তার বাবা কাজিন সাইফুর রহমান হায়দার কনক ও মো: আরাফাত হোসেনকে ফোন করে জানান, সৈকত গুলিবিদ্ধ হয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আছেন। তাদের দ্রুত হাসপাতালে যেতে বলেন তিনি।
সাক্ষীর ভাষ্যানুযায়ী- কনক ও আরাফাত দ্রুত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যান। সেখানে মর্গের সামনে স্ট্রেচারে শায়িত অবস্থায় সৈকতের রক্তাক্ত লাশ দেখতে পান তারা।
সেবন্তী জবানবন্দীতে বলেন, তার ভাইয়ের মাথার বাম পাশের কানের ওপর দিয়ে গুলি ঢুকে ডান পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়।
পরে বিষয়টি মায়ের কাছ থেকে জানতে পেরে সেবন্তী নিজেও দ্রুত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন। হাসপাতালে যাওয়ার পথে বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে পুলিশকে গুলি করতে দেখেছেন বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান তিনি।
হাসপাতালে পৌঁছে মর্গের ভেতরে ভাইয়ের লাশ দেখতে পান বলে জানান সেবন্তী। তার দাবি, সৈকতের লাশের পাশেই মোহাম্মদপুরের আরেক আন্দোলনকারী শহীদ রাজুর লাশসহ আরো পাঁচটি লাশ ছিল। তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন বলেও জানান তিনি। শহীদ রাজু মোহাম্মদপুরের একজন আন্দোলনকারী ছিলেন বলে জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন সেবন্তী।
সৈকতের লাশ হাসপাতাল থেকে বাসায় নেয়ার পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে সেবন্তী বলেন, ১৯ জুলাই রাত ৯টার দিকে মোহাম্মদপুরের মারকাজুল ইসলামে তার ভাইয়ের লাশ গোসল করানো হয় এবং সেখানেই রেখে দেয়া হয়।
সাক্ষীর ভাষ্যানুযায়ী, তার এক ফুফাতো ভাই তখন জানান, তাদের বাসার নিচে পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা অবস্থান করছিল। একই রাতে কারফিউ জারি করা হয়। এ কারণে লাশ সে দিন রাতে বাসায় নেয়া সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি। পরদিন ২০ জুলাই বেলা ১১টার দিকে কারফিউ শিথিল হলে সৈকতের লাশ বাসায় নিয়ে আসা হয়। এরপর মোহাম্মদপুর জামে মসজিদ কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয় বলে জবানবন্দীতে জানান সেবন্তী।
তিনি বলেন, হাসপাতাল থেকে তাদের কোনো কাগজপত্র দেয়া হয়নি। পরে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার কয়েক দিন পর হাসপাতাল থেকে সৈকতের মৃত্যুসংক্রান্ত সনদপত্র দেয়া হয়। ওই সনদে তার মৃত্যুর কারণ ‘গানশট’ বা গুলির আঘাত হিসেবে উল্লেখ ছিল বলে দাবি করেন সেবন্তী।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভাইয়ের মৃত্যু সনদপত্র আনতে গেলে সেখানে অসংখ্য গুলিবিদ্ধ লাশ দেখতে পেয়েছেন বলেও ট্রাইব্যুনালকে জানান তিনি।
জবানবন্দীর একপর্যায়ে ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডের জন্য কয়েকজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাকে দায়ী করার কথা জানান সেবন্তী। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, শেখ ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়াদ্দার, যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার ও এডিসি রওশানুল হক সৈকতের নাম উল্লেখ করেন।
তাদের সহযোগিতায় আওয়ামী লীগের শেখ বজলুর রহমান, আজিজুল হক রানা, এম এ সাত্তার এবং তৎকালীন কমিশনার আসিফ, কমিশনার রাষ্ট্রন, কমিশনার রাজিব, জাহাঙ্গীর কবির নানকের এপিএস বিপ্লব, মো: তোফায়েল সিদ্দিক তুহিন, ইসমাইল হোসেন, বিচ্চু জালাল, মাঈনুল হাসান রাসেল, কে এম ফজলে রাব্বি, মো: সাজ্জাদ হোসেনসহ আরো অনেকে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে গুলি ছুড়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জবানবন্দীর শেষ পর্যায়ে ভাইয়ের মৃত্যুর বিচার ও শাস্তি নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা জানান সেবন্তী। তিনি বলেন, তার ভাই শহীদ মাহামুদুর রহমান সৈকতসহ জুলাই আন্দোলনের সব হত্যাকাণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ফাঁসি চান।
এরপর তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন উল্লেখ করে সাক্ষী হিসেবে নিজের জবানবন্দী শেষ করেন সেবন্তী। মামলাটিতে ১৮ ও ১৯ জুলাই ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের কাঠামোর মধ্যে বিচার করা হচ্ছে। মামলার ২৮ আসামির মধ্যে চারজন গ্রেফতার আছেন। তারা হলেন সাবেক আনসার সদস্য মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মো: সাজ্জাদ হোসেন ও যুবলীগ কর্মী কে এম ফজলে রাব্বী। নানক, তাপসসহ এই মামলার ২৪ আসামি পলাতক।
_GDN_970x90px_English.gif&w=2048&q=75)








