
জামায়াতে ইসলামীতে তরুণরা দ্রুত নেতৃত্ব ও কাজের সুযোগ পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মনির। তিনি বলেছেন, দলটির গঠনতন্ত্র সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলছে। শিগগিরই একটি ‘উপদেষ্টা কাউন্সিল’ গঠনের উদ্যোগ নেয়া হবে। অভিজ্ঞদের পরামর্শ এবং তরুণদের নেতৃত্ব- এই দুইয়ের সমন্বয়ে জামায়াতকে এগিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করে শিশির মনির বলেন, ৩ আগস্ট শহীদ মিনারে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাস এবং ৪ আগস্ট আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি দেখে তার মনে হয়েছিল, পুরনো সরকারের পক্ষে আর টিকে থাকা সম্ভব নয়। ৫ আগস্ট পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকার গঠন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তখন বিপ্লবী সরকার, জাতীয় সরকার কিংবা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার- বিভিন্ন ধরনের বিকল্পই খোলা ছিল। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্তকে তিনি ওই সময়ের জন্য বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেন।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র কাঠামোকে নতুনভাবে সাজানো প্রয়োজন। তবে সরকারের কিছু নীতি ও সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি এগুলোকে ‘পলিসিগত ভুল’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সাথে তিনি বলেন, ‘আমরা এটাও চাই না সরকার ব্যর্থ হোক।’
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে তিনি বিভিন্ন দেশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও পালিয়ে যাওয়া নেতাদের পুনরায় নিজ দেশের রাজনীতিতে সফলভাবে ফিরে আসার নজির খুবই সীমিত।
জুলাই অভ্যুত্থান, অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থা, সংস্কার, সরকারের নীতি, জামায়াতের সাংগঠনিক পরিবর্তন, তরুণদের নেতৃত্ব এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়া দিগন্তকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন অ্যাডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মনির।
প্রশ্ন : জুলাই অভ্যুত্থানের কোন পর্যায়ে আপনার মনে হয়েছিল, শেখ হাসিনা আর ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন না?
শিশির মনির : আমার কাছে এক্সাক্টলি টিকবেন না- এটা মনে হয়েছিল ৩ আগস্ট। সেদিন শহীদ মিনারে একটি সমাবেশে গিয়েছিলাম। সেখানে মানুষের যে উচ্ছ্বাস দেখেছি- নারী, পুরুষ, শিশু, পরিবারসহ একটা উৎসবমুখর পরিবেশ। সেদিন মনে হলো, আর মনে হয় সম্ভব হচ্ছে না। সব সিস্টেম ভেঙে পড়েছে, ছাত্রদের আর কন্ট্রোল করা সম্ভব হচ্ছে না।
এর আগে পর্যন্ত আমার মধ্যে একটা দোলাচল ছিল। মনে হতো, এই বুঝি সরকার অগ্রসর হচ্ছে, এই বুঝি পিছপা হচ্ছে; এই বুঝি সামনে যাচ্ছে, আবার এই বুঝি পেছনে যাচ্ছে।
কিন্তু ৩ আগস্টের পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানুষের মধ্যে যে আত্মবিশ্বাস ও স্বতঃস্ফূর্ততা দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে পরিস্থিতি আর আগের জায়গায় নেই।
প্রশ্ন : ৪ আগস্ট কি আপনার সেই ধারণাকে আরো দৃঢ় করেছিল?
শিশির মনির : অবশ্যই। ৪ আগস্টের ঘটনা ছিল আরো ভিন্ন। ছাত্ররা যে সমাবেশের ডাক দিয়েছিল, সেটি হওয়ার কথা ছিল ৬ আগস্ট। পরে তা এক দিন এগিয়ে আনা হয়।
৪ আগস্ট ছিল শেষ কোর্ট। কোর্টে গেলাম এবং শাহবাগ হয়ে হেঁটে আসি, কারণ তখন গাড়ি আর চলছিল না। রাস্তায় রাস্তায় মানুষের উচ্ছ্বাস। চার দিকে খবর পাওয়া যাচ্ছিল সংঘর্ষ হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বিভিন্ন জায়গায় অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে ছিলেন। তখন আমার মনে হয়েছে, সরকার হেলপলেস হয়ে গেছে। মানুষ তখনই এ ধরনের পরিস্থিতিতে যায়, যখন আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।
প্রশ্ন : ৫ আগস্টের পর বিপ্লবী সরকার গঠনের সুযোগ কি ছিল?
শিশির মনির : ছিল। তখন যারা অভ্যুত্থানকারী ছিলেন, তারা যে পদ্ধতি পছন্দ করতেন, সেটাই হতে পারত। সেটি বিপ্লবী সরকার হতে পারত, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার হতে পারত, আবার যেভাবে অন্তর্বর্তী সরকার হয়েছে সেভাবেও হতে পারত।
এমনকি শহীদ মিনারে গিয়ে বর্তমান সংবিধানকে সাসপেন্ড করে একটি প্রোক্লেমেশন কিংবা ডিক্রির মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন করাও সম্ভব ছিল। এসব অপশন সম্পূর্ণরূপে তখনকার বিপ্লবীদের হাতে ছিল।
প্রশ্ন : বিপ্লবী সরকার হলে কি ভালো হতো?
শিশির মনির : আমার বিবেচনায় বিপ্লবী সরকারই বলি, জাতীয় সরকারই বলি- একজন এক্সেপ্টেবল লোককে তার প্রধান হতে হতো। যিনি সঙ্কীর্ণ রাজনীতির বাইরে এবং দেশে-বিদেশে যাদের এক্সেপ্টেন্স আছে।
এই বিবেচনায় ইউনূস সাহেবকে সিলেক্ট করা ছিল সবচেয়ে ওয়াইজ ডিসিশন। কারণ এ ধরনের বিপ্লব-পরবর্তী যে ধরনের সরকার গঠিত হয়, তখন অর্থনীতি ও প্রশাসন ভঙ্গুর থাকে। ওয়ার্ল্ডওয়াইড এক্সেপ্টেন্স যদি না পাওয়া যায়, তখন এ ধরনের সরকার দীর্ঘক্ষণ সাসটেইন করে না।
এই প্রেক্ষাপটে যদি সর্বদলীয় সরকার গঠন হতো, আমার বিবেচনায় সেটার প্রধান জনাব ইউনূস সাহেবের হওয়া উচিত ছিল। বিপ্লবী সরকার হলেও সেখানে এ ধরনের গ্রহণযোগ্য একজন থাকা দরকার ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার হলেও এ ধরনের গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল।
ফরম্যাট নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে- কোনটা হওয়া উচিত, কোনটা হওয়া উচিত না। কিন্তু প্রধান যাকে করা হয়েছে, এর চেয়ে অ্যাপ্রোপ্রিয়েট চয়েজ বাংলাদেশের মানুষের কাছে আর ছিল না।
প্রশ্ন : আপনি বলছেন, বিপ্লবের নিজস্ব একটি আইনগত চরিত্র থাকে?
শিশির মনির : বিপ্লব নিজেই আইন তৈরি করে। কোনো আইন বিপ্লবকে বৈধতা দেয় না; বিপ্লব আইনকে বৈধতা দেয়। এটাকেই বলা হয় ‘কমান্ড অব সার্বভৌমত্ব’।
৫ আগস্ট কমান্ডটা ছিল মানুষের কাছে। মানুষের হয়ে তা ছিল বিপ্লবী মুখপাত্রদের কাছে।
তবে আমি মনে করি, তৎকালীন সামরিক কর্তৃপক্ষ একটি শান্তিপূর্ণ ট্রানজিশন করার চেষ্টা করেছে। তারা ক্যাজুয়ালটি কমিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি নতুন ডাইমেনশন তৈরি করার চেষ্টা করেছে।
প্রশ্ন : তাহলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্তকে আপনি কীভাবে দেখেন?
শিশির মনির : বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে বিপ্লবী সরকার, জাতীয় সরকার কিংবা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার- যেকোনো ফরম্যাটই হতে পারত। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্তকে আমি ওই সময়ের জন্য বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত মনে করি।
কারণ তখন দেশের অর্থনীতি অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। প্রশাসনিক কাঠামোতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একজন নেতার প্রয়োজন ছিল। ড. ইউনূস সেই জায়গায় একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পেরেছিলেন।
প্রশ্ন : রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপনার অবস্থান কী?
শিশির মনির : রাষ্ট্র কাঠামোকে নতুনভাবে সাজানো, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সংস্কারের কোনো বিকল্প ছিল না।
আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, সেটি পরিবর্তন করা দরকার। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে। একই সাথে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কার্যকর স্বাধীনতা দিতে হবে।
সংস্কার মানে শুধু কিছু আইন পরিবর্তন করা নয়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে কাজ করবে, ক্ষমতার ভারসাম্য কিভাবে নিশ্চিত হবে এবং জনগণের কাছে রাষ্ট্র কিভাবে জবাবদিহি করবে- এসব বিষয়কে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে।
প্রশ্ন : সংস্কার নিয়ে অনেক কিছু হলো, কিন্তু গণভোট তো মানা হলো না?
শিশির মনির : ইউনূস সরকার আমলে সংস্কার নিয়ে যে কথাগুলো হয়েছে, এগুলো ছিল বাংলাদেশকে নতুন করে সাজানোর তরিকা বা পদ্ধতি। ৫৬ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশের মানুষ যে ধরনের নতুনত্ব চেয়েছে, তার একটি বাস্তব নমুনা ছিল এই চিন্তাভাবনা। রাষ্ট্র কাঠামো নতুন করে সাজানো, নতুন ডাইমেনশনে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রতিষ্ঠানকে ডেভেলপ করা। গণতন্ত্রের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফ্রি, ফেয়ার ও ক্রেডিবল করার জন্য এই সংস্কারগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ৫ আগস্টের মতো এত ম্যাসিভ ঘটনা আগে ঘটেনি। তবে নব্বইয়ে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে, পঁচাত্তরে সিপাহি-জনতার বিপ্লব হয়েছে, একাত্তরে দেশ স্বাধীন হয়েছে। এসব ঘটনা থেকেই জনগণের মধ্যে এক ধরনের স্পৃহা কাজ করেছে যে, দেশটাকে নতুন করে সাজানোর সুযোগ আছে। সেই চিন্তাভাবনা থেকে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করার চেষ্টা, ট্রান্সপারেন্সি ও অ্যাকাউন্টেবিলিটি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এই চিন্তা থেকে সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। একটা সংবিধান-সম্পৃক্ত, আরেকটা সংবিধান ছাড়া অন্য পদ্ধতিতে। সংবিধান-সম্পৃক্তগুলো তৎকালীন সরকার করতে পারেনি। কিন্তু বাকিগুলো অধ্যাদেশ ও সার্কুলার জারি করে করা হলেও যার বড় একটা অংশ বর্তমান সরকার বাদ দিয়েছে।
এখানে ডেডলক তৈরি হয়েছে গণভোটের ফলাফল মানা বা না মানা নিয়ে। রাষ্ট্রপতির একটি আদেশের মাধ্যমে একটি লিগ্যাল ফাউন্ডেশন তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল। সংবিধান যেহেতু সেই নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের লিগ্যাল ফাউন্ডেশন দেয়নি, সেহেতু বলা হয়েছিল- সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণের কাছে সবসময় থাকে। এই অভ্যুত্থানের মালিক যেহেতু জনগণ, সুতরাং সেই পাওয়ার ব্যবহার করে রাষ্ট্রপতি একটি আদেশ জারি করতে পারেন।
উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতের রোডম্যাপটা পরিষ্কার করা- কোনটার পর কোনটা, কিভাবে হবে। জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। গণভোটে যদি ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়, তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে এবং ওই ৪৭টি সংস্কার এই পরিষদের মধ্যে গৃহীত হবে এবং ১৮০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে।
প্রশ্ন : বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আপনার কি অসন্তোষ আছে?
শিশির মনির : আছে। তবে আমরা এটাও চাই না সরকার ব্যর্থ হোক। সরকার ব্যর্থ হলে ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও জনগণেরই হবে।
কিন্তু কিছু নীতি ও সিদ্ধান্তকে আমি পলিসিগত ভুল মনে করি। বিচারক নিয়োগ আইন, সচিবালয় প্রতিষ্ঠা আইন কিংবা মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে আগে যে কার্যকর ব্যবস্থাগুলো ছিল, সেগুলো পরিবর্তন বা দুর্বল করার উদ্যোগ যথেষ্ট সতর্কতার সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।
এসব ক্ষেত্রে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আরো বেশি পরামর্শ, অভিজ্ঞতা এবং বাস্তবতার আলোকে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা উচিত।
প্রশ্ন : দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়েও তো মানুষের উদ্বেগ আছে?
শিশির মনির : অবশ্যই। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি- দু’টিই সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
এ ধরনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে আরো সতর্ক হতে হবে। অভিজ্ঞ লোকজনকে সাথে নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। অর্থনীতি, বাজারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক বাস্তবতা- সবগুলোকে একসাথে বিবেচনায় নিতে হবে।
প্রশ্ন : জামায়াতে ইসলামীতে সাংগঠনিক কোনো পরিবর্তন আসছে কি?
শিশির মনির : জামায়াতে ইসলামীতে তরুণরা খুব দ্রুত নেতৃত্ব ও কাজের সুযোগ পাচ্ছে। এটা দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। আমরা দেখছি, তরুণদের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে এবং তারা সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করছে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আসা প্রয়োজন।
প্রশ্ন : দলের গঠনতন্ত্রেও পরিবর্তনের উদ্যোগ আছে?
শিশির মনির : হ্যাঁ। জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে এটি একটি সাংগঠনিক বিষয়। যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
প্রশ্ন : ‘উপদেষ্টা কাউন্সিল’ গঠনের কথা বলা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য কী?
শিশির মনির : খুব শিগগিরই একটি ‘উপদেষ্টা কাউন্সিল’ গঠনের উদ্যোগ নেয়া হবে। আমার মনে হয়, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের জ্ঞান ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। একই সাথে তরুণদের উদ্যম ও নতুন চিন্তাকে কাজে লাগাতে হবে। এই দুইয়ের সমন্বয় হলে সংগঠন আরো শক্তিশালী হয়।
প্রশ্ন : জামায়াতের রাজনীতিতে তরুণদের ভূমিকা আগামী দিনে কী হতে পারে?
শিশির মনির : তরুণরা দ্রুত নেতৃত্বে আসছে এবং কাজের সুযোগ পাচ্ছে। আমি মনে করি, আগামী দিনে তাদের ভূমিকা আরো বাড়বে।
নতুন প্রজন্মের হাত ধরে জামায়াতে ইসলামী রাজনীতিতে আরো ভালো করবে বলে আমি আশাবাদী। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝে নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করা জরুরি।
প্রশ্ন : সংসদে জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
শিশির মনির : জামায়াত এবং অন্যান্য সমমনা দলগুলো মিলে পার্লামেন্টে একটি কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।
সংসদ শুধু আইন পাস করার জায়গা নয়। সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, জনগণের সমস্যা তুলে ধরা এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীতিগত আলোচনা করাও সংসদের দায়িত্ব।
আমরা চাই সংসদ কার্যকর হোক এবং সেখানে জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হোক।
প্রশ্ন : শেখ হাসিনা আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরতে পারবেন বলে আপনি মনে করেন?
শিশির মনির : বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা দেখেছি, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে যাওয়া নেতাদের পক্ষে আবার নিজ দেশের রাজনীতিতে সফলভাবে ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন।
অতীতে যেসব দেশে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরশাসকরা পালিয়ে গেছেন, তাদের পুনরায় সে দেশের রাজনীতিতে সফলভাবে রিহ্যাবিলিটেটেড বা পুনর্বাসিত হওয়ার নজির প্রায় নেই বললেই চলে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও যদি কোনো পলাতক রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে সর্বোচ্চ শাস্তির রায় আসে, তাহলে রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে যায়।
তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আইন, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর নির্ভর করবে।
প্রশ্ন : জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
শিশির মনির : জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, জনগণের আকাক্সক্ষাকে উপেক্ষা করে কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক করতে হবে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। একই সাথে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
জুলাই আমাদের সামনে রাষ্ট্রকে নতুনভাবে সাজানোর একটি সুযোগ তৈরি করেছে। এই সুযোগ যদি আমরা কাজে লাগাতে পারি, তাহলে একটি আরো জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
প্রশ্ন : আগামী দিনের বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
শিশির মনির : আমি মনে করি, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন একটি নতুন প্রজন্ম সামনে আসছে। তাদের চিন্তা, প্রযুক্তি-নির্ভরতা, যোগাযোগের ধরন এবং রাজনৈতিক প্রত্যাশা আগের প্রজন্মের চেয়ে অনেক ভিন্ন।
রাজনৈতিক দলগুলোকে এই পরিবর্তন বুঝতে হবে। শুধু পুরনো কাঠামো দিয়ে নতুন বাংলাদেশের রাজনীতি পরিচালনা করা যাবে না।
আমাদের এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হবে না; রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় স্বার্থের অধীন হবে না; ক্ষমতার পরিবর্তন হবে, কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, সেটিকে টেকসই করতে হলে রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং জনগণ- সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
_GDN_970x90px_English.gif&w=2048&q=75)








