গঙ্গা চুক্তি, বাংলাদেশ, ভারত
গঙ্গা চুক্তি। নয়া দিগন্ত

 

Advertisement
  • নবায়ন নয়, নতুন চুক্তি  চায় ঢাকা
  •  গ্যারান্টি ক্লজে ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিতের দাবি  আলোচনা চলছে   কারিগরি পর্যায়ে
  •  ১২ ডিসেম্বরের আগেই সমঝোতা

গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আবারো একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ১২ ডিসেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে। চুক্তির শেষ প্রান্তে পৌঁছে ঢাকার স্পষ্ট অবস্থান- পুরনো চুক্তি স্রেফ নবায়ন নয়; বরং নতুন ও অধিকতর কার্যকর একটি চুক্তি সম্পাদন। বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মূল দাবিগুলোর একটি হলো- নতুন চুক্তিতে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ন্যায্য অংশের পানি পাওয়ার পূর্ণ নিশ্চয়তা থাকে।
অন্য দিকে ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, গঙ্গার মতো অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন সংক্রান্ত যাবতীয় আলোচনা যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। নয়াদিল্লি আরো উল্লেখ করেছে, চুক্তি সংক্রান্ত কারিগরি পর্যায়ের বৈঠকগুলো বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত ২৯ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে নয়াদিল্লির এই সতর্ক অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে আলোচনার পথ খোলা থাকলেও মূল কূটনৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে- নতুন চুক্তিতে বাংলাদেশ যে কার্যকর ন্যূনতম পানিপ্রবাহের নিশ্চয়তা চাইছে, ভারত শেষ পর্যন্ত তা কতখানি গ্রহণ করতে প্রস্তুত?
চুক্তির মেয়াদ শেষ প্রান্তে
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তিটি প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মে- এই পাঁচ মাসের চরম শুষ্ক মৌসুমে কার্যকর থাকে। বাংলাদেশ সরকারের যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে চুক্তিটি বাস্তবায়িত হয়ে আসছে।
চুক্তির মূল কাঠামোগত ভিত্তি হলো- ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজে গঙ্গার পানিপ্রবাহ পরিমাপ করে একটি নির্ধারিত গাণিতিক সূত্র অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টন করা।
চুক্তির পরিশিষ্ট-১ অনুযায়ী পানি বণ্টনের সূত্র হলো : ফারাক্কা পয়েন্টে পানিপ্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে ভারতের অংশ ৫০% এবং বাংলাদেশের অংশ ৫০%। আর পানিপ্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেক হলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫ হাজার কিউসেক এবং ভারত পাবে অবশিষ্ট প্রবাহ। ফারাক্কা পয়েন্টে পানিপ্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেক বা তার বেশি হলে ভারত পাবে ৪০ হাজার কিউসেক এবং বাংলাদেশ পাবে অবশিষ্ট প্রবাহ। এর পাশাপাশি, ১১ মার্চ থেকে ১০ মে’র মধ্যে ভারত ও বাংলাদেশ বিকল্প বা চক্রানুক্রমিক (ৎড়ঃধঃরড়হধষ) পদ্ধতিতে তিনটি ১০ দিন মেয়াদি চক্রে ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি পাওয়ার একটি বিশেষ সুবিধা পায়।
তবে এখানেই ঢাকার বর্তমান দাবির সাথে ১৯৯৬ সালের কাঠামোর একটি মৌলিক ও ঐতিহাসিক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
চুক্তিতে যে ‘গ্যারান্টি’ অনুপস্থিত
বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করার মতো পূর্ণাঙ্গ গ্যারান্টি ক্লজ রাখা হয়নি।
১৯৯৬ সালের চুক্তির অনুচ্ছেদ ২-এ বলা হয়েছে, ফারাক্কায় কোনো ১০ দিনের চক্রে মোট পানিপ্রবাহ যদি ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে যায়, তবে উভয় দেশ জরুরি ভিত্তিতে আলোচনায় বসে পরিস্থিতি সমন্বয়ের উদ্যোগ নেবে। অর্থাৎ, পানিপ্রবাহ সঙ্কটজনক পর্যায়ে নামলে বাংলাদেশকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম পরিমাণ পানি দেয়ার বাধ্যবাধকতা রাখার বদলে কেবল আলোচনা ও পারস্পরিক সমন্বয়ের সুযোগ রাখা হয়েছিল।
অন্য দিকে অনুচ্ছেদ ১১-এ উল্লেখ রয়েছে, পর্যালোচনার পর কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারলে নতুন প্রবাহ নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশকে তার সূত্রভিত্তিক অংশের অন্তত ৯০ শতাংশ পানি সরবরাহ অব্যাহত রাখবে।
চুক্তিতে কিছু প্রতিরক্ষামূলক ধারা থাকলেও ঢাকার বর্তমান চাওয়া অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট- নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ হ্রাস পেলেও যেন বাংলাদেশের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ন্যূনতম পানিপ্রবাহ আইনিভাবে সংরক্ষিত থাকে।
১৯৭৭ সালের ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ আবার আলোচনায় কেন?
১৯৭৭ সালের ফারাক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ন্যূনতম প্রবাহের আইনি সুরক্ষা বা ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ বিদ্যমান ছিল। পানিসম্পদ সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণা ও চুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, ওই ব্যবস্থায় নদীতে পানির প্রাকৃতিক প্রবাহ কমে গেলেও বাংলাদেশ তার নির্ধারিত অংশের একটি ন্যূনতম মাত্রার পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা পেত।
চলতি বছরের আগস্টে বাংলাদেশের পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ মন্তব্য করেন, ১৯৭৭ সালের চুক্তির তুলনায় পরবর্তী ব্যবস্থাগুলোতে বাংলাদেশের জন্য সমপরিমাণ সুরক্ষার গ্যারান্টি ছিল না; তাই বর্তমান সরকার নতুন চুক্তিতে পানির এই গ্যারান্টি নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
একই সুরে পানিসম্পদমন্ত্রী মো: শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানিও জোর দিয়ে বলেছেন, ১৯৭৭ সালের অনুরূপ একটি গ্যারান্টি ক্লজ নতুন চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করাই ঢাকার প্রধান লক্ষ্য। তার মতে, ভাটির দেশ হিসেবে শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ সুনিশ্চিত করা বাংলাদেশের পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য।
কেন শুষ্ক মৌসুমের পানি এত গুরুত্বপূর্ণ?
গঙ্গার পানি বণ্টন স্রেফ একটি নদীর পানি ভাগাভাগির বিষয় নয়। বাংলাদেশে প্রবেশ করে ‘পদ্মা’ নাম ধারণ করা এই সুদীর্ঘ নদীর প্রবাহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন, ভূগর্ভের পানির পুনর্ভরণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানিপ্রবাহ অস্বাভাবিক কমে গেলে এর বহুমাত্রিক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে সুপেয় পানির প্রবাহ হ্রাস পেয়ে চরম লবণাক্ততা বৃদ্ধির ঝুঁকি দেখা দেয়। এর ফলে কৃষি ও মৎস্যসম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়, নদীর নাব্যতা সঙ্কটাপন্ন রূপ নেয় এবং সুন্দরবনসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পরিবেশগত সাম্যাবস্থা বিঘিœত হয়। ফলে ঢাকার বর্তমান কৌশল কেবল ‘অতিরিক্ত পানি দাবি করা’- এমন কোনো সরল সমীকরণ নয়; বরং এর সাথে যুক্ত রয়েছে পানি প্রাপ্তির পূর্বানুমেয়তা এবং দঢ়ঢ আইনি নিশ্চয়তা।
সংক্ষেপে প্রশ্নটি এখন দাঁড়িয়েছে : গঙ্গায় পানিপ্রবাহ সঙ্কটজনক স্তরে নামলে বাংলাদেশের ন্যায্য ভাগ কিভাবে নিশ্চিত হবে?
জলবায়ু পরিবর্তন বদলে দিচ্ছে পুরনো হিসাব
চলতি দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় যে বিষয়টি সবচেয়ে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, তা হলো বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন।
১৯৯৬ সালের চুক্তিটি প্রণয়নের সময় নদীর যে জলবিদ্যুৎ ও প্রবাহসংক্রান্ত উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছিল, তার বেশির ভাগই ছিল ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সময়কালের ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণভিত্তিক। ভারতের রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স’ (আইসিডব্লিউএ)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও স্বীকার করা হয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের ঋতুভিত্তিক পরিবর্তন এবং ঘন ঘন খরার প্রবণতা নদীর পুরনো জলবায়ুসংক্রান্ত হিসাব-নিকাশকে দারুণভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই বাস্তবতায়, নতুন চুক্তি যদি ১৯৯৬ সালের পুরনো ডাটা ও সূত্রের পুনরাবৃত্তি করে তৈরি করা হয়, তবে ভবিষ্যতে অবধারিতভাবে একই ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাই তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে : ১. নদীর রিয়েল-টাইম বা বাস্তব সময়ের পানিপ্রবাহের সঠিক তথ্য; ২. জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রবাহের সম্ভাব্য পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি; ৩. অনাকাক্সিক্ষত পানি সঙ্কটে উভয় দেশ কিভাবে ঘাটতির বোঝা সমতার ভিত্তিতে ভাগ করবে।
ফারাক্কা থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ- তথ্যের স্বচ্ছতা
পানি বণ্টনের আলোচনায় কেবল ফারাক্কা পয়েন্টে কতটুকু পানি মজুদ আছে, তা পরিমাপ করাই যথেষ্ট নয়; বরং ফারাক্কা অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশের পর পদ্মায় বাস্তবে কতটুকু পানি পৌঁছাচ্ছে, তা যাচাই করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে ফারাক্কা ও বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজে সমন্বিত পানিপ্রবাহ পরিমাপ এবং ডাটা আদান-প্রদান আলোচনার একটি অন্যতম কারিগরি দিক।
২০২৬ সালের মে মাসে দুই দেশের কারিগরি বিশেষজ্ঞদল ফারাক্কায় যৌথ পরিদর্শন সম্পন্ন করে পানিপ্রবাহের তথ্য সংগ্রহ করে। পরবর্তী সময়ে জেআরসি-এর কারিগরি কমিটির বৈঠকে এই তথ্যাবলি বিস্তারিত পর্যালোচিত হয়।
একই সাথে, বাংলাদেশ অংশেও হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে নিয়মিত প্রবাহ পরিমাপ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সেখানে ডিসচার্জ মেজারমেন্ট পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়মিত সক্ষমতা ও কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যৎ চুক্তির ক্ষেত্রে এই কারিগরি সমন্বয় ব্যবস্থার কয়েকটি রূপরেখা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে : দুই দেশের প্রবাহ পরিমাপের অভিন্ন পদ্ধতি ও তথ্যের স্বচ্ছতা; নিয়মিত ভিত্তিতে যৌথ যাচাই ও ডিজিটাল তথ্য প্রকাশ; পরিমাপ সংক্রান্ত বিরোধ দেখা দিলে প্রয়োজনে তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তিগত নিরীক্ষার ব্যবস্থা।
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিল সমীকরণ
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার এই আলোচনা দ্বিপক্ষীয় হলেও গঙ্গার পানি বণ্টন ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও আন্তঃরাজ্য কাঠামোর সাথে গভীরভাবে যুক্ত। বিশেষ করে, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের স্বার্থ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের দরকষাকষির একটি প্রধান নিয়ামক। পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্প্রতি কেন্দ্রকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, নতুন কোনো চুক্তি সম্পাদনের আগে রাজ্যের পানীয় জল, শিল্প, হুগলি নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং কলকাতা বন্দরের সচলতা সম্পর্কিত পরিবেশগত স্বার্থ কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, পাশের রাজ্য বিহারেও এই চুক্তি নিয়ে আপত্তির সুর জোরালো হয়েছে। গত আগস্টে বিহারের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক জোটের শীর্ষ নেতারা গঙ্গা চুক্তি নবায়নের সরাসরি বিরোধিতা করে বিভিন্ন বক্তব্য প্রদান করেছেন, যা ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। ফলে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক হিসাবটি বেশ জটিল। 
শুধু ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ কি সমস্যার সমাধান?
চুক্তিতে কেবল একটি ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ যুক্ত করলেই যে মাঠপর্যায়ে সব সঙ্কটের অলৌকিক সমাধান হয়ে যাবে, এমনটা ভাবা কঠিন। কারণ জলবায়ুর প্রভাবে নদীতে যদি বাস্তব পানির প্রবাহই চরম মাত্রায় কমে যায়, তবে কাগজে-কলমে লেখা একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা কিভাবে বাস্তবায়িত হবে- সেটিই মূল প্রশ্ন।
সুতরাং, নতুন চুক্তির খসড়া তৈরিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নিচের বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে উত্থাপন করা যুক্তিযুক্ত হতে পারে :
১. ন্যূনতম প্রবাহ সুনিশ্চিতকরণ : শুষ্ক মৌসুমে যেকোনো পরিস্থিতিতে একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম পানিপ্রবাহ রক্ষা করা। 
২. সমতার ভিত্তিতে ঘাটতি বণ্টন : নদীতে প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেলে একতরফাভাবে বাংলাদেশের অংশ কমবে না; বরং উভয় দেশ কিভাবে সেই ঘাটতির ক্ষতি ভাগ করে নেবে, তার সুনির্দিষ্ট ফর্মুলা থাকা। 
৩. তথ্যের অবাধ স্বচ্ছতা : ফারাক্কা, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও অন্যান্য পয়েন্টের ডাটা রিয়েল-টাইমে পারস্পরিক আদান-প্রদানের আইনি বাধ্যবাধকতা। 
৪. জলবায়ু অভিযোজন ধারা : দীর্ঘমেয়াদে অববাহিকার প্রবাহ পরিবর্তিত হলে চুক্তি কিভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানিয়ে নেবে , তার সুযোগ রাখা।
৫. পরিবেশগত প্রবাহ : মানুষের ব্যবহারের পাশাপাশি নদীর সার্বিক পরিবেশ ও জীবনচক্র বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রবাহ নিশ্চিত করা। 
৬. কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি : ফারাক্কায় প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নামলে কেবল ‘আমলাতান্ত্রিক আলোচনার’ আশ্বাস না রেখে পূর্বনির্ধারিত জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রাখা।
আন্তর্জাতিক ফোরাম ও কূটনৈতিক কৌশল
গত আগস্টে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, প্রয়োজন হলে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক ফোরামে যাওয়ার সার্বিক প্রস্তুতিও সরকারের রয়েছে।
তবে বর্তমান বাস্তবতায় দুই দেশই দ্বিপক্ষীয় জেআরসি কাঠামোর মাধ্যমেই আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক ফোরামের প্রসঙ্গটি এই মুহূর্তে আলোচনার প্রধান বিকল্প নয়; বরং এটি কূটনৈতিক দরকষাকষি ও ব্যাকআপ কৌশল হিসেবে কাজ করছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর সামান্য কিছু দিন বাকি; কিন্তু নয়াদিল্লির সর্বশেষ বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনা এখনো জে আর সি এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞ পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কারিগরি পর্যায়ে কেবল ডাটা, পরিমাপ পদ্ধতি ও গাণিতিক সূত্র নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব; কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি একটি সম্পূর্ণ ‘নতুন চুক্তি’ সম্পাদন করতে হয়, তবে তা কারিগরি গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে পৌঁছানো অপরিহার্য।
আসন্ন কূটনৈতিক দরকষাকষির আসল রূপ নির্ধারিত হবে তিনটি মৌলিক প্রশ্নে : ১. বাংলাদেশ বাস্তবে কতটুকু পানি পাবে? ২. সেই পানি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি কতটা শক্তিশালী? ৩. নদীতে অনাকাক্সিক্ষত পানি সঙ্কট দেখা দিলে সেই ঝুঁকির বোঝা উভয় দেশ কিভাবে ভাগ করে নেবে?