
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই বিদ্যুৎ ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) খাতে ভর্তুকির চাপ সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। মাত্র তিন মাসে দুই খাতে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে, যা পুরো অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৪২ হাজার কোটি টাকার প্রায় ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ বছরের এক-চতুর্থাংশ সময় না যেতেই ভর্তুকি বাজেটের প্রায় অর্ধেক ব্যয় হয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত, এলএনজি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয়ের অনিশ্চয়তা এবং দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বছরের শেষ নাগাদ এ ব্যয় আরো অনেক বাড়তে পারে। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সাথে এলএনজি খাতে ব্যয় ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। সে ক্ষেত্রে দুই খাতেই সরকারের মোট ভর্তুকি ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তিন মাসেই ১৯ হাজার কোটি
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২১ সেপ্টেম্বর আগস্ট মাসের বিদ্যুৎ ভর্তুকি বাবদ ৪ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা এবং সেপ্টেম্বর মাসের এলএনজি আমদানি ভর্তুকি বাবদ ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। একসাথে দুই খাতে ছাড় হয়েছে ৭ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা।
বাজেটের মাসিক গড় হিসাবের সাথে তুলনা করলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। দুই খাতে মাসে গড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব ধরে বরাদ্দ দেয়া হলেও এক দফাতেই ছাড় করা হয়েছে এর দ্বিগুণেরও বেশি- প্রায় ১২৭ শতাংশ।
এর আগে জুলাই মাসেই বিদ্যুৎ ভর্তুকি এবং জুলাই-আগস্টের এলএনজি ভর্তুকি বাবদ ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ছাড় করতে হয়েছিল। ফলে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই মোট ছাড় প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের জন্য এর তাৎপর্য হলো- বাজেটে নির্ধারিত অর্থের সাথে বাস্তব ব্যয়ের ব্যবধান দ্রুত বাড়ছে। এই ব্যবধান পূরণ করতে হলে পরবর্তী সময়ে সংশোধিত বাজেটে অতিরিক্ত বরাদ্দ দিতে হবে অথবা সরকারের অন্য খাতের ব্যয় সঙ্কোচন করতে হবে।
বিদ্যুতে ৩৬ হাজারের জায়গায় ৫০ হাজার!
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বিদ্যুৎ ভর্তুকির জন্য ৩৬ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ মাসিক গড় ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে বাস্তব প্রয়োজন প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা করে।
এ হিসাবে বছরে প্রয়োজন দাঁড়ায় প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগের বর্তমান হিসাব অনুযায়ী ভর্তুকির পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছিল প্রায় ৪৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার ব্যয় আরো কয়েক হাজার কোটি টাকা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর পেছনে অন্যতম কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি ব্যয়। কয়লার দাম ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, আমদানি করা জ্বালানির মূল্য এবং ডলারভিত্তিক ক্রয়মূল্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্য দিকে বিদ্যুতের খুচরামূল্য পুরোপুরি উৎপাদন ব্যয়ের সাথে সমন্বয় করা না হলে সেই ব্যবধান শেষ পর্যন্ত সরকারের ভর্তুকি হিসাবেই আসে।
অর্থাৎ ভর্তুকি শুধু একটি বাজেটীয় ব্যয় নয়; এটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও গ্রাহকের কাছ থেকে আদায়কৃত মূল্যের মধ্যকার ব্যবধানের আর্থিক প্রতিফলন।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এলএনজিতে
বিদ্যুৎ খাতের তুলনায় বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এলএনজি আমদানিতে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এলএনজি ভর্তুকির জন্য মাত্র প্রায় ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বরাদ্দ ইতোমধ্যেই অপ্রতুল হয়ে পড়েছে।
প্রথম আড়াই মাসেই এলএনজি খাতে প্রায় ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়ার প্রয়োজন হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাব। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, নির্ধারিত বরাদ্দের বাইরে এ খাতে ইতোমধ্যে অতিরিক্ত প্রায় ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পুরো অর্থবছরে এলএনজি আমদানির মোট ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একই সাথে বদলে গেছে একটি কার্গোর মূল্য। সঙ্ঘাতের আগে একটি এলএনজি কার্গো কিনতে যেখানে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা লাগত, সেখানে এখন ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ একটি কার্গোতেই ব্যয় বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ।
হরমুজের ঝুঁকি কতটা?
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির বড় অংশ আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত তীব্র হলে শুধু জ্বালানির উৎপাদন বা সরবরাহ নয়, পরিবহন ও বীমা ব্যয়ও বাড়ে। হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বাজারে ঝুঁকির প্রিমিয়ামও বাড়তে পারে।
ফলে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে বাংলাদেশকে বেশি দামে কার্গো কিনতে হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পেট্রোবাংলার আমদানি ব্যয়ে। সেই ব্যয়ের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত সরকারকে ভর্তুকি হিসেবে বহন করতে হয়।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে শুধু এলএনজি আমদানির ব্যয় বাড়ে না; গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়ে। ফলে একই আন্তর্জাতিক মূল্য-ধাক্কা এক দিকে এলএনজি ভর্তুকি এবং অন্য দিকে বিদ্যুৎ ভর্তুকি- দুই হিসাবেই চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ভর্তুকির দ্বৈত চাপ
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে গ্যাসের আমদানি ব্যয় বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়ে। অন্য দিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও সেই অনুপাতে গ্রাহকপর্যায়ে মূল্য সমন্বয় না হলে সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজন বাড়ে।
এ কারণে এলএনজি বাজারের অস্থিরতা এখন শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এটি বিদ্যুৎ, বাজেট, বৈদেশিক মুদ্রা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সাথে যুক্ত হয়ে গেছে।
বিশেষ করে এলএনজি আমদানির জন্য ডলারের প্রয়োজন হয়। আমদানি ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়। আবার ভর্তুকি দিতে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করতে হলে উন্নয়ন ও অন্যান্য সরকারি ব্যয়ের ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
তেলের দাম বাড়িয়েও চাপ কমছে না
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের চাপ মোকাবেলায় গত ২১ সেপ্টেম্বর দেশে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা।
তেলের দাম বাড়ানোর মাধ্যমে সরকার বাজারমূল্যের সাথে অভ্যন্তরীণ দামের ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু বিদ্যুৎ ও এলএনজির ক্ষেত্রে একই সাথে আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সামগ্রিক জ্বালানি ব্যয়ের চাপ পুরোপুরি কমছে না।
এখানে সাধারণ মানুষের ওপরও দ্বিমুখী প্রভাব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। আর বিদ্যুৎ ও গ্যাসের উৎপাদন ব্যয় বাড়লে শিল্প ও ব্যবসার ব্যয়ও বাড়তে পারে।
বাজেটের হিসাব বনাম বাস্তবতা
চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের সময় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকবে- এমন প্রত্যাশার ওপর হিসাব করা হয়েছিল। কিন্তু বাজেট ঘোষণার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সঙ্ঘাত পরিস্থিতি বদলে দেয়।
জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রীও আকস্মিক আন্তর্জাতিক ঝুঁকির বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১০ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সঙ্কট তৈরি হয় এবং এর ফলে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের আন্তর্জাতিক দাম বড় ধরনের ঊর্ধ্বমুখী চাপের মুখে পড়ে।
এই বাস্তবতায় বাজেটের প্রাথমিক হিসাব দ্রুত অচল হয়ে পড়ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের উন্নয়ন ব্যয় বাবদ প্রস্তাব করা হয়েছে ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। কিন্তু ভর্তুকির প্রয়োজন যদি বাজেটের তুলনায় কয়েক হাজার কোটি টাকা বাড়ে, তাহলে উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থের ওপরও পরোক্ষ চাপ তৈরি হতে পারে।
সামনে তিনটি বড় ঝুঁকি
সংশ্লিষ্টদের সামনে এখন মূলত তিনটি ঝুঁকি। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত দীর্ঘায়িত হলে এলএনজির আন্তর্জাতিক মূল্য ও পরিবহন ব্যয় আরো বাড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির ব্যয় বাড়লে বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা আরো বাড়বে। তৃতীয়ত, রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে বাড়তি ভর্তুকির অর্থ জোগাড় করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিদ্যুৎ খাতে ৫০ হাজার কোটি এবং এলএনজিতে ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হলে দুই খাতে মোট ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এটি মূল ৪২ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
সমাধান কোথায়
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাময়িকভাবে বাড়তি ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওপর নির্ভরশীল আমদানি ব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে তুলনামূলক কম মূল্যে জ্বালানি সরবরাহ- এই দুইয়ের ব্যবধান যত বাড়বে, সরকারের আর্থিক দায় তত বাড়বে।
তাই প্রয়োজন জ্বালানি আমদানির বহুমুখীকরণ, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কার্যকর ব্যবহার, বিদ্যুৎ উৎপাদনের দক্ষতা বৃদ্ধি, সিস্টেম লস কমানো এবং জ্বালানি ব্যবহারে অপচয় রোধ। একই সাথে ভর্তুকি কোনপর্যায়ে এবং কোন গ্রাহক শ্রেণির জন্য প্রয়োজন- সেটিও নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা, বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের একটি বড় ধাক্কা বাংলাদেশের বাজেটকে কত দ্রুত প্রভাবিত করতে পারে। বছরের প্রথম তিন মাসেই যদি প্রায় অর্ধেক ভর্তুকি বরাদ্দ ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে সামনে বাকি ৯ মাসের হিসাবই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় আর্থিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।









