সংসদ, সনদ, সংস্কার
সংসদ। ইন্টারনেট

 

জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি এবং তাদের স্বাধীন ও অবাধ কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বিরোধী দলকে কেবল ‘অসহযোগী সমালোচক’ হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার বিকল্প শক্তি বা ‘ছায়া সরকার’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাজনৈতিক সংস্কারের বিভিন্ন সনদে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে বারবার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল- সংসদকে কার্যকর করা হবে, বিরোধী দলকে দেয়া হবে উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক স্থান এবং প্রতিষ্ঠা করা হবে এক ভারসাম্যপূর্ণ আইনসভা। তবে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দেখা যায়, জাতীয় সংসদের বিগত কার্যক্রম, সংসদীয় কমিটির গঠন এবং কার্যপ্রণালী বিধির প্রয়োগে সনদের সেই শুভ প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন ঘটেনি; বরং বিরোধী দলের ঝুড়িতে  জমা হয়েছে শুধুই ‘শূন্য প্রাপ্তির খাতা’।
সনদের প্রতিশ্রুতি : কার্যকর ছায়া সরকার ও ভারসাম্যপূর্ণ সংসদ
রাষ্ট্র সংস্কার, সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে জাতীয় অঙ্গনে যেসব সনদ ও রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছিল, তার মূল ভিত্তি ছিল সংসদকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জবাবদিহিতার কেন্দ্রে পরিণত করা। এসব সনদের মূল প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল : ১. ভারসাম্যপূর্ণ সংসদ প্রতিষ্ঠা : আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে বিরোধী দলের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া এবং সংসদীয় কমিটিতে কেবল আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী কমিটিগুলোর প্রধানের পদ বিরোধী দলের জন্য উন্মুক্ত রাখা। ২. সংসদীয় কমিটির স্বাধীন ভূমিকা : কমনওয়েলথভুক্ত বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশের অনুকরণে সংসদীয় কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ওপর কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা। ৩. ছায়া সরকারের চর্চা : সংসদে বিরোধী দলকে পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ দেয়া, যাতে তারা সরকারের প্রতিটি নীতি ও পরিকল্পনার বিপরীতে বিকল্প জাতীয় নীতি প্রস্তাব করতে পারে। এসব প্রতিশ্রুতির মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশবাসীকে আশ্বস্ত করা যে, সংসদ কেবল সরকারি দলের বিল পাসের হাতিয়ার হবে না; বরং এটি হবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর গঠনমূলক বিতর্ক ও চুলচেরা বিশ্লেষণের স্থান।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বাস্তবতা : ৫০টির মধ্যে মাত্র একটি!
সনদের লিখিত প্রতিশ্রুতির সাথে বাস্তব কাঠামোর ব্যবধান সবচেয়ে প্রকট হয়ে ওঠে জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ায়। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্থায়ী কমিটিগুলোকে বলা হয় ‘সংসদের হৃৎপিণ্ড’। এখানেই সরকারি মন্ত্রণালয়গুলোর দৈনন্দিন কাজ, বাজেট বরাদ্দ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোর বস্তুনিষ্ঠ নজরদারি ঘটে। মোট ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিবিশিষ্ট সংসদে গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী বিরোধী দলের অনুকূলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কমিটির সভাপতিত্ব বরাদ্দ থাকা বাঞ্ছনীয়। বিশেষ করে সরকারি হিসাব সংক্রান্ত কমিটি (চঁনষরপ অপপড়ঁহঃং ঈড়সসরঃঃবব - চঅঈ) এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটির শীর্ষ পদ বিরোধী দলের কাছে হস্তান্তর করা একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিশ্বজনীন নিয়ম। কিন্তু বাস্তব চিত্রে দেখা গেছে, ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মধ্যে বিরোধী দলের ভাগে জুটেছে মাত্র একটি কমিটির চেয়ার!
প্রশাসনিক নজরদারির পথরুদ্ধ : সংসদীয় কমিটির প্রায় সব ক’টির সভাপতিত্ব যখন সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের হাতে থাকে, তখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম, দুর্নীতি বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা আড়াল করার প্রবণতা বাড়ে।
ভারসাম্যের অভাব : স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব ও সভাপতিত্ব না থাকায় কমিটিগুলোর বৈঠক আয়োজন, এজেন্ডা নির্ধারণ কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার ক্ষমতা সরকারি দলের মর্জির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
‘একপাক্ষিক কমিটিতে’ রূপান্তর : ৫০টির মধ্যে ৪৯টি কমিটির সরাসরি নিয়ন্ত্রণ সরকারি দলের হাতে থাকায় সংসদীয় নজরদারি ব্যবস্থার মূল ভাবমর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সনদের প্রতিশ্রুতির সরাসরি বিপরীত।
প্রশ্ন ও নোটিশ পর্ব : কোণঠাসা বিরোধী দল
সংসদ ভবনের মূল অধিবেশনে বিরোধী সংসদ সদস্যদের প্রধান গণতান্ত্রিক হাতিয়ার হলো ‘প্রশ্ন ও উত্তর পর্ব’ এবং জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশ। এর মাধ্যমেই তারা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের প্রত্যক্ষ জবাবদিহিতা দাবি করেন। তবে বর্তমানে এই প্রক্রিয়াটি অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়েছে।
১. সময় বণ্টনে অসমতা : অধিবেশন চলাকালীন সংসদে বিরোধী দলের বক্তব্য রাখার জন্য বরাদ্দকৃত সময় অত্যন্ত সীমিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারি দলের প্রশংসাসূচক বক্তব্যে কার্যদিবসের বড় অংশ ব্যয় হয়, অথচ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিরোধীদের নোটিশগুলো সময়স্বল্পতা বা প্রযুক্তিগত অজুহাতে বাতিল হয়ে যায়।
২. কার্যপ্রণালী বিধির প্রয়োগ : কার্যপ্রণালী বিধির বিশেষ ধারায় বিরোধী দলের আনা নোটিশ কিংবা মুলতবি প্রস্তাব সংসদে আলোচনার সুযোগ পাওয়ার হার অত্যন্ত কম। কোনো জরুরি নীতিগত বিষয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও তা ‘অনুমোদিত নয়’ বলে নাকচ করে দেয়ার ঘটনাই সচরাচর দেখা যায়।
৩. এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা : প্রশ্নোত্তরের সময় সরকারি মন্ত্রীদের কাছ থেকে আসা উত্তরগুলো অনেক ক্ষেত্রেই সংক্ষিপ্ত বা কৌশলগতভাবে মূল তথ্য এড়িয়ে যাওয়ার ধরণ প্রতিফলিত করে। এর ফলে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা বস্তুনিষ্ঠ সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। ফলস্বরূপ, জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সঙ্কট নিয়ে সংসদে কথা বলতে গিয়ে বিরোধী দল নিজেদের প্রতিনিয়ত কোণঠাসা অবস্থায় আবিষ্কার করে।
‘ছায়া সরকার’ ধারণা থেকে কতটা দূরে?
যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য পরিপক্ব সংসদীয় কাঠামোয় ‘অফিসিয়াল অপজিশন’ বা ছায়া সরকার সরকারি প্রতিটি মন্ত্রীর বিপরীতে একজন ছায়া মন্ত্রী নিয়োগ করে বিকল্প বাজেট, আইন ও নীতি জনগণের সামনে তুলে ধরে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সনদে বিরোধী দলকে সেই প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদায় উন্নীত করার কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলকে গঠনমূলক ছায়া সরকার হিসেবে বিকশিত হওয়ার মতো পরিবেশ বা সুযোগ তৈরি করা হয়নি। অন্য দিকে বিরোধী দলও তাদের সংসদীয় অধিকারগুলো আদায়ে কার্যকর ও কৌশলগত উদ্যোগ নিতে পারেনি। ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কথা শোনা গেলেও তা ছায়ার মতোই অস্পষ্ট হয়ে রয়েছে জাতির কাছে। এর ফলে সংসদ একটি একপাক্ষিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে, যেখানে আইন পাস হয় দ্রুত গতিতে- কিন্তু প্রয়োজনীয় বিতর্ক ও চুলচেরা বিশ্লেষণ ছাড়াই।
ভারসাম্যহীন সংসদের পরিণাম
সংসদে বিরোধী দলকে উপযুক্ত সুযোগ না দেয়া বা কোণঠাসা করার প্রভাব কেবল বিরোধী দলের ওপর পড়ে না, বরং পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর পড়ে।  
জবাবদিহিতাহীন প্রশাসন : সংসদে বস্তুনিষ্ঠ প্রশ্ন ও নজরদারির অভাব দেখা দিলে আমলাতন্ত্র ও নির্বাহী বিভাগ একচ্ছত্র ক্ষমতার সুযোগ পায়। সংসদীয় ব্যবস্থার ওপর আস্থা হ্রাস : সংসদে কথা বলার পথ সঙ্কুচিত হলে রাজপথের সঙ্ঘাতময় রাজনীতি প্রাধান্য পায়, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
আইনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা : বিরোধী দলের পর্যালোচনার সুযোগ না দিয়ে তাড়াহুড়ো করে পাস করা আইনে নীতিগত অস্পষ্টতা থেকে যায়, যা পরবর্তীকালে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি করে।
বিরোধী দলীয় নেতার প্রতিক্রিয়া
গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মগবাজারের আলফালাহ মিলনায়তনে জামায়াত বিট সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধী দল সংসদে আলোচনা করতে চাইলেও সবসময় সেই সুযোগ পাওয়া যায় না। সীমান্ত সমস্যা নিয়ে দেয়া একটি নোটিশের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট জায়গা থেকে বিষয়টি ‘সেনসিটিভ’ উল্লেখ করে নোটিশ প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা নোটিশ প্রত্যাহার করেননি। তিনি বলেন, সেনসিটিভ ব্যাপার বলে এটা আলোচনা হওয়া দরকার। আমরা এটা প্রত্যাহার করব না। ডা. শফিকুর রহমান আরো বলেন, বিরোধী দল সংসদে তাদের বক্তব্য তুলে ধরতে চাইলেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। 
অন্য দিকে সরকারি দলের সদস্যদের বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ রয়েছে বলে তিনি দাবি করে বলেন, জাতীয় সমস্যায় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে। ঢাকা শহরের যানজট ও অন্যান্য সমস্যা সমাধানে তাদের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিমের সহযোগিতা নেয়ার প্রস্তাব দেয়া হলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। আমরা অতীতের মতো সংসদে ফাইল ছোড়াছুড়ির সংস্কৃতি এবং চেয়ার ছুড়ে স্পিকার হত্যার মতো জঘন্য ইতিহাস সৃষ্টি করতে চাই না। তাই জনগণের দাবি আদায়ে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছি।
পরিবর্তন কোন পথে?
রাজনৈতিক সনদ বা চুক্তির মূল গুরুত্ব নির্ভর করে তা বাস্তবায়নের সদিচ্ছার ওপর। ‘কার্যকর ছায়া সরকার ও ভারসাম্যপূর্ণ সংসদ’ প্রতিষ্ঠার লিখিত প্রতিশ্রুতি যদি বাস্তব রাজনীতিতে প্রতিফলিত না হয়, তবে সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ৫০টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে মাত্র একটির চেয়ার পাওয়া কিংবা প্রশ্ন ও নোটিশ পর্বে নিরন্তর কোণঠাসা থাকার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা সংস্কারের প্রতিশ্রুতির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করেন, একটি কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ সংসদ গঠন করতে হলে অবিলম্বে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিত্বে বিরোধী দলের আনুপাতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, কার্যপ্রণালী বিধি ব্যবহারে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে এবং বিরোধী দলকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ না ভেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে মেনে নিতে হবে। তা না হলে, সনদের বৈপ্লবিক প্রতিশ্রুতিগুলো শুধুই একটি কাগজ-কলমের ‘শূন্য প্রাপ্তির খাতা’ হিসেবে রয়ে যাবে।