কুয়াকাটা, পর্যটন
ভাঙন ও অপরিকল্পিত উন্নয়নে হুমকিতে কুয়াকাটা পর্যটনশিল্প। নয়া দিগন্ত

 
সাগরকন্যা কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন পর্যটকরা। একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার বিরল সুযোগ, দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। পদ্মা সেতু চালুর পর বেড়েছে পর্যটকের আনাগোনা। তবে পর্যটনের এমন বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিত অবকাঠামো ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অভাবে নানা সমস্যায় জর্জরিত এ পর্যটনকেন্দ্র। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সমুদ্রের অব্যাহত ভাঙন। হুমকিতে পড়েছে মেরিন ড্রাইভ, বেড়িবাঁধ, পর্যটন স্থাপনা ও উপকূলীয় জনবসতি।
কুয়াকাটা জিরো পয়েন্টের পশ্চিম প্রান্তে মেরিন ড্রাইভের বেড়িবাঁধে সম্প্রতি ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। বালি সরে গিয়ে দেবে যাচ্ছে বাঁধ রক্ষায় বসানো ব্লক। তাৎক্ষণিকভাবে বালুভর্তি বস্তা ফেলা হলেও ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না। এতে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা সাগরে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই। হুমকিতে রয়েছে কুয়াকাটা পৌরসভাসহ উপকূলের দুই ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত ৬০ বছর ধরে ভাঙনের কারণে সমুদ্র ক্রমেই জনবসতির দিকে এগিয়ে আসছে। গত ৩০ বছরে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। বর্ষা মৌসুমে সাগরের ঢেউয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে সৈকতসংলগ্ন এলাকা। ইতোমধ্যে এলজিইডি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দু’টি গেস্ট হাউজসহ শত শত স্থাপনা সাগরে হারিয়ে গেছে। এবার মেরিন ড্রাইভের বাঁধ ভাঙলে হোটেল, মোটেল, রিসোর্টসহ পর্যটনকেন্দ্রের বিপুল বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সম্প্রতি সৈকতে থাকা ট্যুরিস্ট পুলিশের সার্ভিস বক্সও ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। 
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৫৫ বছরে ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। পাউবোর পক্ষ থেকে আগের সরকারের সময়ে জমা দেয়া চারটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশন ফেরত পাঠায়। বর্তমানে নতুন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির প্রস্তুতি চলছে বলে জানা যায়।
সমুদ্রভাঙনের পাশাপাশি অপরিকল্পিত স্থাপনা, জলাবদ্ধতা, যানজট, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত ঝুঁকি কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, কুয়াকাটাকে পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে এক যুগেরও বেশি আগে মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছিল। ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর এর গেজেট প্রকাশিত হলেও পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি।
এদিকে পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান ও পরিবহন ব্যবসার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তবে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে এসব স্থাপনা বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠেছে। জমির মালিকানা, কাগজপত্র, ভবন নির্মাণের অনুমোদন ও জমির ব্যবহারসংক্রান্ত জটিলতায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
পর্যটকদের অভিযোগ, জিরো পয়েন্টসংলগ্ন সৈকতে কংক্রিটের টুকরা, ইট, পাথর, ছেঁড়া জাল ও কাচের অংশ পড়ে রয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে ব্যবহৃত জিও ব্যাগ ও জিও টিউবও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এতে জোয়ারের সময় গোসল করতে গিয়ে পর্যটকদের আহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিশুদের জন্য পরিস্থিতি আরো ঝুঁকিপূর্ণ। 
পরিবেশ উন্নয়নকর্মী মেজবা উদ্দিন মান্নু বলেন, কুয়াকাটার উন্নয়ন মানে শুধু বড় হোটেল বা রাস্তা নির্মাণ নয়। পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, ম্যানগ্রোভ বন, রাখাইন সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও স্থানীয় ঐতিহ্যকে উন্নয়ন পরিকল্পনায় যুক্ত করতে হবে। জমি ও পরিবেশ আইন ও পর্যটন নীতির মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন রয়েছে।
সৈকত এলাকার বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, ‘বর্তমানে পর্যটকরা সৈকতের যে পর্যন্ত যেতে পারেন, সমুদ্র ছিল সেখান থেকে আরো অন্তত দেড় কিলোমিটার সামনে। ওই এলাকায় ফয়েজ মিয়ার নারিকেল বাগানসহ অসংখ্য স্থাপনা ছিল। সবই এখন সমুদ্রের নিচে।’
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ বলেন, কুয়াকাটায় চার শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু সাগরভাঙনে পর্যটনশিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পর্যটনশিল্প বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।
পাউবোর কলাপাড়া নির্বাহী প্রকৌশলী মো: শাহ আলম জানান, সৈকতের ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একটি প্রকল্প প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হলে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।