
বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে নজিরবিহীন প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে চলা তীব্র মতবিরোধ ও অনিয়মের তথ্য ফাঁস হওয়ার পর ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এ ঘটনা ভারতের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে।
গত বছরের জুন মাস থেকে নির্বাচন কমিশন ভারতজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং হালনাগাদের জন্য ‘স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন’ নামে এক বিশেষ প্রক্রিয়ার অধীনে এ পর্যন্ত এক কোটি ৩০ লাখেরও বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ভোটারদের জন্মসনদ, জমির দলিল এবং শিক্ষা প্রশংসাপত্রের মতো পুরনো কাগজপত্র দিয়ে নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হচ্ছে। এর ফলে দরিদ্র, অভিবাসী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মারাত্মক বিপাকে পড়েছে। সামান্য বানান ভুল বা অমিলের কারণেও ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে দেয়া হচ্ছে।
অতীতে যেখানে ভারতের নির্বাচন কমিশন স্বয়ং ভোটার নিবন্ধনের দায়িত্ব নিত, সেখানে এ নতুন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটারকেই তার ভোটাধিকার প্রমাণের কঠিন দায়িত্বে ফেলা হয়েছে। তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের একচ্ছত্র ও একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন অপর দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী। গত ১০ মাসে সান্ধু ও জোশী কমিশনের জারি করা বিভিন্ন নির্দেশকে কমপক্ষে ১৪ বার লিখিতভাবে ‘অননুমোদিত ও অবৈধ’ বলে অভিহিত করেছেন।
ইসিআইনেটের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভোটার তালিকা ব্যবস্থাপনাকে অতিরিক্ত মাত্রায় নয়াদিল্লিকেন্দ্রিক করে তোলার ফলে স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতামতকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতে শাসক ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছে। বিরোধী দলের নেতা রাহুল গান্ধী বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিরোধীদের দাবি, ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সুবিধা দিতেই সুপরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে। বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের দাবি, ভুয়া বা অবৈধ ভোটারদের বাদ দেয়ার জন্যই এ প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। কমিশনারদের অভ্যন্তরীণ দ্বিমতকে তারা ‘সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ’ বলে মন্তব্য করেছে।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের ফেলো মিলন বৈষ্ণব এবং ভারতের সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এস. ওয়াই. কুরেশিসহ বিশিষ্ট বিশ্লেষকরা এ পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। অতীতে ভারতের নির্বাচন কমিশন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে এ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে এসে ঠেকেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ সঙ্কট ভারতের গণতান্ত্রিক গার্ডরেল এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতাকে এক বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
ভারতের ১৪০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার জন্য ভোটাধিকার কেবল ব্যালট পেপার বা ভোট দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সরকারি বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধাও এ ভোটাধিকারের সাথে যুক্ত। গত ১০ মাসে কমিশনকে পাশ কাটিয়ে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অন্তত ১৪ বার আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি ওঠে। এ আপত্তিগুলো ছিল নতুন ভোটার নিবন্ধনের নিয়ম, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেয়া ও পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা, নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে নাগরিকদের আপিল এবং তালিকার নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, কমিশন যেসব কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল, তার সবকিছুর সাথেই এ আপত্তিগুলো জড়িত ছিল।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেয়া বা নতুন নাম যুক্ত করার এ প্রক্রিয়াটি আসলে ভোটারদের একটি অংশকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার কৌশল, যার উদ্দেশ্য হলো মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সুবিধা নিশ্চিত করা। কিছু কিছু এলাকায় এ প্রক্রিয়ার ফলে মুসলিমসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাধিকার ক্ষুণœ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে-এপ্রিল ও মে মাসে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে-ভোটার তালিকা থেকে ৯০ লাখ বাসিন্দার নাম বাদ দেয়া হয়েছিল বলে আলজাজিরা আগেই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী বলেন, আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাটিই মূলত ভেঙে পড়েছে। নির্বাচনের প্রতি মানুষের যে ‘পবিত্র আস্থা’ ছিল, তা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রবীণ সাংবাদিক রশিদ কিদওয়াই বলেন, ভারতে আমরা কঠিন সময় দেখেছি, এমনকি জরুরি অবস্থাও দেখেছি; কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কখনোই এতটা প্রশ্নবিদ্ধ বা আপসের মুখে পড়েনি।








