জ্বালানি, বিদ্যুৎ, আইইএ
সংযোগ আছে, নিরাপত্তা নেই নয়া দিগন্ত

 

 

* আমদানি-নির্ভর জ্বালানি থেকে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ- বাংলাদেশকে বদলাতে হবে পুরো কৌশল

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল ঘরে ঘরে সংযোগ পৌঁছে দেয়া। কিন্তু ‘বিদ্যুৎ সংযোগ’ আর ‘নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ’ এক বিষয় নয়। দেশের বিদ্যুৎ খাত আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে- কী জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে, সেই বিদ্যুৎ কতটা নির্ভরযোগ্য হবে এবং গ্রাহক পর্যায়ে এর দাম কত পড়বে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএ’র নতুন ‘স্পেশাল রিপোর্ট অন ইলেকট্রিফিকেশন’ বলছে, বিশ্ব দ্রুত ‘বিদ্যুতের যুগে’ প্রবেশ করছে। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বে বিদ্যুতের চাহিদা বছরে গড়ে তিন শতাংশের বেশি হারে বেড়েছে, যা সামগ্রিক জ্বালানি চাহিদা বৃদ্ধির গতির প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক চূড়ান্ত জ্বালানি ব্যবহারের ২৩ শতাংশ বিদ্যুৎ থেকে এলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিদ্যুতের গুরুত্ব তার চেয়ে অনেক বেশি। বর্তমানে বিশ্বের জিডিপির ৪৫ শতাংশের বেশি উৎপাদনকারী কর্মকাণ্ডের প্রধান জ্বালানিই হলো বিদ্যুৎ।
বাংলাদেশের জন্যও এই পরিবর্তনের তাৎপর্য অপরিসীম। কারণ, দেশের অর্থনীতি একই সাথে শিল্পায়ন, নগরায়ন, ডিজিটাল সম্প্রসারণ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন ও উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে এগোচ্ছে। অর্থাৎ, আগামী দিনে বিদ্যুতের প্রয়োজন শুধু বাড়বেই না বরং অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাত বিদ্যুতের ওপর আরো বেশি মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।
কিন্তু এখানেই লুকিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
বিদ্যুৎ আছে, নির্ভরযোগ্যতা নেই
আইইএ’র প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নামটি একটি বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গে উঠে এসেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, সর্বজনীন বিদ্যুৎপ্রবেশাধিকার রয়েছে এমন দেশেও বিদ্যুৎ সরবরাহ অনির্ভরযোগ্য হতে পারে। বাংলাদেশ, মিসর ও ইরাকের মতো দেশগুলোতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সুস্পষ্ট উদাহরণ রয়েছে। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সঙ্কটকে আর কেবল ‘সংযোগের সমস্যা’ হিসেবে দেখলে চলবে না। এই সঙ্কট এখন মূলত চার স্তরের :
১. বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক জ্বালানি।
২. উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর গ্রিড বা সঞ্চালন ব্যবস্থা।
৩. বিদ্যুতের দাম ও আর্থিক সক্ষমতা।
৪. জ্বালানি সরবরাহ ও ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তা।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এই চারটি সঙ্কটকে একই সাথে সামনে নিয়ে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত ও এলএনজি সরবরাহে বিঘেœর কারণে এ বছর দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎসঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে। সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি এখন আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্য প্রতি এমএমবিটিইউ ৩০ ডলারের কাছাকাছি উঠে যাওয়ায় বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে।
এর অর্থ দাঁড়ায়- বাংলাদেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা এখন আর কেবল জাতীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে হরমুজ প্রণালী, এলএনজি বহনকারী জাহাজ, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা : ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন’ নয়, দরকার ‘বিদ্যুৎ ব্যবস্থা’
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের নীতির মূল বৈশিষ্ট্য ছিল কেবল উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো। কিন্তু আইইএ’র নতুন বিশ্লেষণ বলছে, বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে কেবল নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র বসালেই চলবে না বরং প্রয়োজন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। যার মধ্যে থাকতে হবে :
* উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন
* গ্রিড সক্ষমতা ও ব্যাটারি স্টোরেজ বৃদ্ধি
* চাহিদা ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ
* সাইবার নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ
আইইএ’র প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে উচ্চ বিদ্যুতায়ন পরিস্থিতিতে বিশ্বের গ্রিডকে গত দশকের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ দ্রুত সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে ব্যাটারি স্টোরেজ।
বাংলাদেশের জন্য এই বার্তাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে যদি সঞ্চালন ও বিতরণ গ্রিড দুর্বল রাখা হয়, তবে অতিরিক্ত বিদ্যুৎও অর্থনীতিকে কাক্সিক্ষত সুফল দিতে পারবে না।
গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ : সস্তা পথ থেকে কৌশলগত ঝুঁকি
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস দীর্ঘদিন ধরে প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর মূল যুক্তি ছিল- দেশীয় গ্যাস তুলনামূলক সস্তা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে অধিক কার্যকর।
কিন্তু দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন হ্রাসের ফলে আমদানির ওপর নির্ভরতা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ এখন আর পুরোপুরি ‘দেশীয় জ্বালানি’র পর্যায়ে নেই। বরং এর একটি দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি হয়েছে : ডলার®আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজার® জাহাজ® টার্মিনাল® গ্যাস গ্রিড® বিদ্যুৎকেন্দ্র®  বিদ্যুৎ গ্রিড।
এই দীর্ঘ শৃঙ্খলের যেকোনো একটি বিন্দুতে বিঘœ ঘটলে পুরো অর্থনীতিতে ধস নামতে পারে। গত জুলাই মাসে একটি এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডের পর এলএনজি আমদানি ব্যাহত হওয়া এবং এর ফলে দেশজুড়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে তীব্র চাপ তৈরি হওয়ার ঘটনাটি এই কাঠামোগত দুর্বলতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
পোশাক শিল্পের জন্য বিদ্যুৎ এখন নিছক ‘ইনপুট’ নয়, প্রতিযোগিতার অস্ত্র
বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত পোশাক শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা সরাসরি বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে দেশের নিট পোশাক কারখানাগুলোর একটি বড় অংশ আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। একই সময়ে কিছু প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ ও নিজস্ব জেনারেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে তুলনামূলক স্থিতিশীল উৎপাদন বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এখান থেকেই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় শিক্ষা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। শিল্পের জন্য শুধু ‘বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া’ যথেষ্ট নয়, বরং প্রয়োজন ২৪ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন ও পূর্বানুমানযোগ্য বিদ্যুৎ। একটি পোশাক কারখানা যদি দিনে কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকে, তবে তাকে বাধ্য হয়ে ডিজেল চালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়। এতে একদিকে যেমন জ্বালানি ব্যয় বাড়ে, তেমনি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতার নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য সরবরাহ করা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
ফলে বিদ্যুতের উচ্চ দাম একটি সমস্যা হলেও, অনির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ তার চেয়েও অনেক বড় সঙ্কট।
আইইএ’র হিসাব বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আইইএ জানিয়েছে, বিশ্বে বিদ্যুৎ বর্তমানে মোট চূড়ান্ত জ্বালানি ব্যবহারের ২৩ শতাংশ হলেও এটি প্রায় ৪০ শতাংশ ‘কার্যকরী শক্তি’  সরবরাহ করে। কারণ, ঐতিহ্যগত জ্বালানি পোড়ানোর তুলনায় আধুনিক বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি অনেক বেশি দক্ষ।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী : বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রচলিত ইঞ্জিনের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি দক্ষ; বৈশ্বিকভাবে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার তেল চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ২.৩ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত কমিয়েছে; ২০৩৫ সালের মধ্যে উচ্চ বিদ্যুতায়ন পরিস্থিতি অর্জিত হলে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর বার্ষিক আমদানি বিল প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কমতে পারে।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই পরিসংখ্যানগুলো অত্যন্ত অর্থবহ। এর অর্থ হলো-বিদ্যুতায়ন কেবল পরিবেশবান্ধব হওয়ার বিষয় নয়; বরং এটি হতে পারে ডলার সাশ্রয়, আমদানি ঝুঁকি হ্রাস, শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি।
বাংলাদেশের সামনে সৌরবিদ্যুতের অপার সম্ভাবনা
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের এবং ২০৪০ সালের মধ্যে তা ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ২০৩০ সালের পরিকল্পনা অনুযায়ী ৫,৫০০ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার (ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ) এবং ৪,৫০০ মেগাওয়াট গ্রাউন্ড-মাউন্টেড সোলারের লক্ষ্য রয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি লক্ষ্য নির্ধারণের নয়, বরং তার দ্রুত বাস্তবায়ন। বাংলাদেশে রুফটপ সোলারের সম্ভাবনা নিয়ে সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এই খাত ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হলে ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকেই ২১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব। এর অর্থ হলো, সরকারকে নতুন করে বিশাল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করতে হবে না বরং শিল্পকারখানা, গুদাম, শপিং মল, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবনের ছাদকেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্ভরযোগ্য অবকাঠামোতে রূপান্তর করা যায়।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, কেবল সৌরবিদ্যুৎ একা এই সঙ্কটের সমাধান করতে পারে না।
সৌরবিদ্যুতের চ্যালেঞ্জ ও সমাধান : ‘সোলার প্লাস ব্যাটারি’
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের মূল সীমাবদ্ধতা সূর্য না থাকা নয় বরং সূর্য না থাকার সময়টায় (সন্ধ্যা ও রাতে) চাহিদা মেটানো। দিনে সৌরবিদ্যুৎ বেশি উৎপাদিত হলেও সন্ধ্যার পিক-আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। এ কারণে প্রয়োজন :
সোলার + ব্যাটারি স্টোরেজ + গ্রিড + চাহিদা ব্যবস্থাপনা
আইইএ’র প্রতিবেদনেও স্পষ্ট বলা হয়েছে, দ্রুত বিদ্যুতায়নের ক্ষেত্রে স্টোরেজ ব্যবস্থা, চাহিদা ব্যবস্থাপনা ও স্মার্ট গ্রিড একসাথে গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত- শুধু কত মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হলো তা দেখা নয় বরং কত মেগাওয়াট নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও ২৪ ঘণ্টা ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা যাচ্ছে তা হিসাব করা।
লোডশেডিংয়ের অদৃশ্য অর্থনৈতিক ক্ষতি
আইইএ উল্লেখ করেছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষতি কেবল বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রের হিসাব দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়া, যন্ত্রপাতির অপচয়, বিকল্প জেনারেটর চালাতে গিয়ে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়- সব মিলিয়ে এর সার্বিক আর্থিক ক্ষতি অনেক বেশি।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে আনা প্রয়োজন : এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে দেশের অর্থনীতিতে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ কত?
এই হিসাব নিয়মিত জাতীয় পর্যায়ে প্রকাশিত হলে বিদ্যুৎ খাতের নীতি প্রণয়ন ও মূল্যায়ন আরো বাস্তবসম্মত হবে। কারণ, এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ এবং এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ না পাওয়ার কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ কখনোই এক হতে পারে না। যখন একটি কারখানায় বিদ্যুৎ থাকে না, তখন শ্রমিকরা বসে থাকেন, উৎপাদন বন্ধ থাকে, নির্ধারিত চালানি বা অর্ডার বিলম্বিত হয় এবং পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নষ্ট হয়। সুতরাং বিদ্যুৎ নিরাপত্তা মূলত শিল্পনীতি ও রফতানি নীতিরই একটি অংশ।
‘বিদ্যুৎ উৎপাদন’ থেকে ‘বিদ্যুৎ অর্থনীতি’
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের নীতিতে এখন একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন জরুরি। এতদিন আমাদের মূল প্রশ্ন ছিল- “দেশে মোট উৎপাদন ক্ষমতা কত মেগাওয়াট?”
ভবিষ্যতের প্রশ্ন হওয়া উচিত- “কত ইউনিট বিদ্যুৎ, কত খরচে, কোন জ্বালানি থেকে, কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে এবং কোন গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে?” এই রূপান্তর ছাড়া বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল কিংবা নতুন সঞ্চালন লাইন- কোনোটিই একা একা পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।
বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত ‘ইলেকট্রিফিকেশন রোডম্যাপ’
আইইএ’র সুপারিশমালার আলোাকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য আটটি অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে :
জাতীয় ইলেকট্রিফিকেশন স্ট্র্যাটেজি : বিদ্যুৎ, গ্যাস, এলএনজি, পরিবহন, শিল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে খণ্ডিতভাবে না দেখে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করা।
এলএনজি নির্ভরতা হ্রাস : একাধিক উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নবায়ন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা এবং নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সাথে এর সুষম সমন্বয় করা।
রুফটপ সোলারকে শিল্পনীতির অংশ করা : কারখানা ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে সহজ শর্তে ঋণ, করসুবিধা, নেট মিটারিং ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজতর করা।
ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থার প্রসার : সৌরবিদ্যুতের রাতের ঘাটতি মেটাতে বড় ও মাঝারি আকারের স্টোরেজ বাজার গড়ে তোলা।
গ্রিড আধুনিকায়ন : কেবল উৎপাদন সক্ষমতা নয়, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বহুগুণ বাড়ানো।
শিল্পাঞ্চলে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ : প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে ডেডিকেটেড গ্রিড, সোলার, স্টোরেজ ও ব্যাকআপ জেনারেশনের সমন্বিত ব্যবস্থা করা।
বিদ্যুৎ ও পরিবহনের সমন্বয় : ইলেকট্রিক বাস, থ্রি-হুইলার, রেল ও অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহন ধীরে ধীরে বিদ্যুতায়িত করার মাধ্যমে আমদানি করা তেলনির্ভরতা কমানো।
জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ করা : আইইএ’র সতর্কবার্তা অনুযায়ী, বর্ধিত বিদ্যুতায়নের সাথে নতুন সরবরাহ শৃঙ্খল ও সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি যুক্ত হয়। তাই বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কেবল ‘উৎপাদন বাড়ানোর’ পর্যায় শেষ
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এখন কেবল ‘উৎপাদন বাড়ানোর’ পর্যায় পেরিয়ে এসেছে। দেশে সংযোগ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে; এখনকার চ্যালেঞ্জ হলো একটি নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও জ্বালানি-নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
আইইএ’র বিশ্লেষণের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- বিদ্যুতায়ন নিজে কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। এর পূর্ণ সুফল পেতে হলে গ্রিড, উৎপাদন, স্টোরেজ, দক্ষতা, বিনিয়োগ ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে এক সুতায় বাঁধতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই দায়িত্ব আরো বেশি কঠিন ও জরুরি, কারণ একই সাথে দেশকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে এলএনজি সঙ্কট, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, শিল্পের উৎপাদন বিঘœ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি।
আগামী দিনের প্রশ্ন তাই আর এটি হওয়া উচিত নয় যে- “আর কতটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাব?”
বরং সঠিক প্রশ্নটি হওয়া দরকার হলো- “কিভাবে এমন একটি সুদৃঢ় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তুলব, যেখানে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ, এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সঙ্কট কিংবা একটি জাহাজের সরবরাহ ব্যাহত হলেও বাংলাদেশের শিল্প, হাসপাতাল, কৃষি, পরিবহন ও সাধারণ মানুষের জীবনপ্রবাহ এক মুহূর্তের জন্যও থমকে যাবে না?”
এই একটিমাত্র প্রশ্নের সঠিক উত্তরই হতে পারে বাংলাদেশের নতুন জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশলের ভিত্তি। সরকার ইতোমধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এখন মূল পরীক্ষা এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের গতি, স্বচ্ছতা এবং এর অর্থনৈতিক কার্যকারিতা প্রমাণ করার।