টিফ, কানাডা
দশ দিনের উৎসবের সমাপনী ‘নিজেকে প্রকাশের’ গল্পে টরন্টোর দর্শক জয় ‘লা বোলা নেগ্রা’র নয়া দিগন্ত


কিছু গল্প পর্দায় শেষ হয়, কিছু গল্প পর্দা পেরিয়ে মানুষের মনে থেকে যায়। টরন্টোর ৫১তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের শেষ প্রহরে এসে তেমনই একটি গল্পের নাম হয়ে উঠেছে ‘লা বোলা নেগ্রা’। তিন প্রজন্মের মানুষের ভালোবাসা, বেদনা, আকাক্সক্ষা, পরিচয় আর নিজেকে প্রকাশের দীর্ঘ যাত্রার গল্পটি শেষ পর্যন্ত জয় করে নিয়েছে টরন্টোর দর্শকের হৃদয়। দর্শকের ভোটে জিতেছে উৎসবের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত পুরস্কার পিপলস চয়েস অ্যাওয়ার্ড।
টরেন্টোর স্থানীয় সময় রোববার উৎসবের পর্দা নামার সাথে সাথে টরন্টোর ব্যস্ত সড়কগুলো থেকে ধীরে ধীরে সরে গেছে লালগালিচা, গুটিয়ে গেছে উৎসবের ব্যানার, কমে এসেছে তারকা আর চলচ্চিত্রকর্মীদের আনাগোনা। কিন্তু ১০ দিনের বেশি সময় ধরে শহরজুড়ে যে চলচ্চিত্র-উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছিল, তার রেশ থেকে গেছে মানুষের কথায়, আলোচনায় এবং অসংখ্য চলচ্চিত্রের স্মৃতিতে।
এবারের টিফ তাই শুধু নতুন নতুন চলচ্চিত্র দেখার আয়োজন ছিল না। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্যিক ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন, চলচ্চিত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ, তারকা ও দর্শকের বদলে যাওয়া সম্পর্ক এবং চলচ্চিত্রের ব্যবসায় নতুন বাজার তৈরির উদ্যোগ; সব মিলিয়ে এবারের উৎসব যেন বদলে যাওয়া সময়েরও একটি প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল।
জাভিয়ের কালভো ও জাভিয়ের আমব্রোসি পরিচালিত স্প্যানিশ ভাষার ‘লা বোলা নেগ্রা’ প্রায় ১৬০ মিনিটের চলচ্চিত্র। এতে অভিনয় করেছেন গিতারিকাদেলাফুয়েন্তে, পেনেলোপে ক্রুজ ও গ্লেন ক্লোজ। মে মাসে কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসা পাওয়ার পর টরন্টোতেও ছবিটি দর্শকের বিশেষ মনোযোগ কাড়ে।
টরন্টোতে প্রদর্শনী শেষে প্রায় দুই মিনিট দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান দর্শকরা। পরে সেই ভালোবাসাই যেন পৌঁছে যায় ভোটের বাক্সে। দর্শকের ভোটে শেষ পর্যন্ত পিপলস চয়েস পুরস্কার জিতে নেয় ছবিটি। টিফের ইতিহাসে এটি প্রথম নেটফ্লিক্স চলচ্চিত্র, যা এই পুরস্কার পেল।
‘লা বোলা নেগ্রা’র গল্প তিন প্রজন্মের পুরুষকে ঘিরে। তাদের জীবনে ভালোবাসা, আকাক্সক্ষা, যন্ত্রণা, পরিচয় এবং নিজের সত্যকে প্রকাশ করার আকুলতা এক সুতায় গাঁথা। নির্মাতারা বলেছেন, ছবিটি তাদের কাছে গভীরভাবে ব্যক্তিগত। নিজের পরিচয় ও অনুভূতিকে প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে এতে। আর দর্শক সেই অনুভূতির সাথে নিজেদের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন- এটাই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
পেনেলোপে ক্রুজও জানিয়েছেন, কোনো চরিত্রকে তিনি শুধু পর্দায় কতটা সময় পেয়েছে তা দিয়ে বিচার করেন না; গল্পের ভেতরে চরিত্রটি কী প্রতিনিধিত্ব করছে, সেটিই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। চিত্রনাট্য ও চরিত্র তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ছবিটির মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেক হয়েছে গিতারিকাদেলাফুয়েন্তের। তার ভাষায়, এটি ছিল জীবনের অন্যতম আবেগময় অভিজ্ঞতা। তাকে বলা হয়েছিল, এই কাজ তার জীবন বদলে দেবে। শেষ পর্যন্ত সেটিই ঘটেছে। ছবির জন্য তিনি ‘লা নিএভে’ গানটিও লিখেছেন ও গেয়েছেন, যা সামনে পুরস্কারের মৌসুমে আলোচনায় আসতে পারে।
এবারের পুরস্কার ঘোষণার অনুষ্ঠানে একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। পুরস্কার পাওয়া বেশ কয়েকটি ছবির পরিচালক ও শিল্পী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। বিষয়টি নিয়ে উৎসবের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দর্শকের ভোট শেষ রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। ফলে পুরস্কার ঘোষণার আগে উৎসব কর্তৃপক্ষও নিশ্চিতভাবে জানতে পারে না কোন ছবি বিজয়ী হচ্ছে।
এই কারণেই অনেক নির্মাতা বা শিল্পী আগে থেকে টরন্টোতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। বিজয়ীর নাম ঘোষণার মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।
টরন্টো থেকে সরেজমিনে দেখা গেল, পুরস্কার ঘোষণার অনুষ্ঠানে তাই নির্মাতা-শিল্পীদের পাশাপাশি সাংবাদিক ও জুরি সদস্যদের উপস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। অন্য অনেক চলচ্চিত্র উৎসবের মতো এখানে সম্ভাব্য বিজয়ীর জন্য আগে থেকে মঞ্চ প্রস্তুত রাখার সুযোগ নেই। দর্শকের রায়ই শেষ কথা।
এই অনিশ্চয়তাই পিপলস চয়েস পুরস্কারকে আলাদা মাত্রা দেয়- কারণ এখানে পুরস্কারটি কোনো পূর্বানুমান নয়, শেষ মুহূর্তে দর্শকের সম্মিলিত রায়ের প্রকাশ।
‘লা বোলা নেগ্রা’র সাথে পিপলস চয়েসের লড়াইয়ে ছিল বেশ কয়েকটি আলোচিত চলচ্চিত্র। জেস আইজেনবার্গের ‘দ্য ডেবিউ’ দর্শকদের আবেগাপ্লুত করেছে। মাত্র দু’টি সাধারণ প্রদর্শনীতেই নির্মাতা নিজে প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনা করে দর্শকদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ সৃষ্টি করেন। পিটার ফারেলির ‘আই প্লে রকি’ও ছিল উৎসবের অন্যতম আলোচিত ছবি। ভালোবাসা পাওয়া একটি বক্সিং চলচ্চিত্র নির্মাণের গল্পকে কেন্দ্র করে তৈরি ছবিটির প্রিমিয়ার দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
প্রথমবার চলচ্চিত্র নির্মাণ করা জর্দান ফার্স্টম্যানের বাবা হওয়ার গল্প নিয়ে নির্মিত আবেগঘন কমেডি ড্রামা ‘ক্লাব কিড’ও দর্শকের মন জয় করে। অন্য দিকে অস্কারজয়ী নির্মাতা মার্টিন ম্যাকডোনাগের ‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’ নিয়ে সমালোচকদের প্রশংসা ছিল চোখে পড়ার মতো। পিপলস চয়েসের প্রথম রানারআপ হয়েছে পিটার ফারেলির ‘আই প্লে রকি’ এবং দ্বিতীয় রানারআপ সিয়ান হেডারের ‘বিইং হিউম্যান’।
টিফের পিপলস চয়েস পুরস্কারের সাথে অস্কারের সম্পর্ক নিয়েও প্রতি বছর আলোচনা থাকে। অতীতে ‘নোম্যাডল্যান্ড’, ‘গ্রিন বুক’, ‘টুয়েলভ ইয়ার্স আ স্লেভ’, ‘দ্য কিংস স্পিচ’, ‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’ ও ‘আমেরিকান বিউটি’র মতো ছবিগুলো টিফে দর্শকের মন জয় করার পর অস্কারে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে টিফের পিপলস চয়েস পুরস্কার অস্কারের মনোনয়ন বা জয়ের নিশ্চয়তা দেয় না। ২০২০ সালের ‘নোম্যাডল্যান্ড’ সর্বশেষ ছবি, যা টিফের এই পুরস্কারের পর অস্কারের সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কারও জিতেছিল।
লালগালিচার ঝলক এবারো ছিল। তবে উৎসবের সবচেয়ে প্রাণবন্ত দৃশ্যগুলো অনেক সময় লালগালিচার বাইরে তৈরি হয়েছে। হাডসন উইলিয়ামস ছিলেন এবারের সবচেয়ে আলোড়ন তোলা তারকাদের একজন। ‘হিটেড রাইভালরি’ দিয়ে পরিচিত হয়ে ওঠা এই অভিনেতাকে ঘিরে কিং স্ট্রিটে ভক্তদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। তার প্রশ্নোত্তর পর্বের টিকিট শেষ হয়ে যায়। নতুন টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ইয়াগা’র প্রিমিয়ারের আগেও তাকে দেখতে জড়ো হন অসংখ্য ভক্ত।
তিনি যখন ফায়ারসাইড আলোচনায় বসছিলেন, তখন তার লাল তলার জুতার এক ঝলক দেখেও দর্শকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। খ্যাতি আর চরিত্রের মধ্যে নিজেকে কিভাবে সামলান- এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তরেও দর্শকের উচ্ছ্বাস ছিল লক্ষণীয়।
টিফের নিয়মিত দর্শকদের নিজস্ব কিছু উৎসব-ঐতিহ্যও আছে। সিনেমা শুরুর আগে বিজ্ঞাপন চলার সময় চিৎকার, হাততালি কিংবা সম্মিলিত উচ্ছ্বাস যেন এখন উৎসবের অনানুষ্ঠানিক অংশ। এবারের বার্ষিক জলদস্যুতা-বিরোধী সতর্কবার্তায় দর্শকদের সম্মিলিত ‘চিৎকার’ ধ্বনি ছিল বিশেষভাবে জোরালো। প্রজেকশন প্রতিষ্ঠানের লোগো পর্দায় উঠলেও শোনা গেছে ‘উই লাভ ইউ, ক্রিস্টি’ ধ্বনি। স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে নির্মিত একটি বিজ্ঞাপনও পেয়েছে বিপুল করতালি।
এসব ছোট ছোট মুহূর্তই টিফকে শুধু একটি চলচ্চিত্র উৎসব নয়, দর্শকেরও উৎসব করে তোলে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাড়তে থাকা বাণিজ্যিক উত্তেজনার সময়ে এবারের টিফে কানাডীয় জাতীয়তাবোধও বেশ দৃশ্যমান ছিল। টিফ ট্রিবিউট পুরস্কার অনুষ্ঠানের আগে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যখন ফেয়ারমন্ট রয়্যাল ইয়র্ক হোটেলের লালগালিচায় হাঁটেন, বাইরে অপেক্ষমাণ মানুষের কাছ থেকে তিনি পান ব্যাপক উচ্ছ্বাস। কানাডার জনপ্রিয় অভিনেতা ও কৌতুকশিল্পী সেথ রোগেনকে ঘিরে থাকা উচ্ছ্বাসের সাথেও তুলনা চলে সেই প্রতিক্রিয়ার।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোও উৎসবকে বেছে নেন তার নতুন বিনোদন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘হোপ অ্যান্ড হার্ড ওয়ার্ক’-এর যাত্রা শুরুর জন্য। দীর্ঘদিনের চিফ অব স্টাফ কেটি টেলফোর্ডকে সাথে নিয়ে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি নতুন প্রকল্পের ঘোষণাও আসে। এর মধ্যে রাজনীতি ও গণমাধ্যমের ঝুঁকিপূর্ণ জগতের পটভূমিতে তৈরি একটি রোমান্টিক কমেডিও রয়েছে।
অর্থাৎ এবারের টিফে সিনেমার সাথে কানাডার বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সম্পর্কও ছিল বেশ দৃশ্যমান।
উৎসবের সাফল্যের পাশাপাশি কিছু অস্বস্তিও ছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিল টিকিটের দাম। উৎসব শুরুর আগেই সদস্য বিক্রয়ের সময় দর্শকেরা অভিযোগ করেন, প্রিমিয়াম প্রদর্শনীর টিকিটের দাম অনেক ক্ষেত্রে ১২৮ কানাডীয় ডলারের বেশি। এসব প্রদর্শনীতে প্রায়ই নির্মাতা বা অভিনয়শিল্পীদের উপস্থিতি ও প্রশ্নোত্তর পর্ব থাকে।
পুনর্বিক্রয় ওয়েবসাইটে কিছু টিকিটের দাম মূল মূল্যের কয়েক গুণ পর্যন্ত উঠে যায়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে- উৎসব যত বড় হচ্ছে, সাধারণ দর্শকের জন্য সেটি কি ততটাই সহজলভ্য থাকছে?
টরন্টোর যানজট স্থানীয়দের কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবার তারকারাও এর স্বাদ পেয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ফেয়ারমন্ট রয়্যাল ইয়র্ক হোটেলের সামনে সেথ রোগেন নিরাপত্তাকর্মীদের জিজ্ঞেস করছেন, গাড়ি ঘুরিয়ে দরজায় পৌঁছতে ২৫ মিনিট অপেক্ষা করার বদলে ব্যারিকেড সরিয়ে সরাসরি ভেতরে ঢোকার সুযোগ আছে কি না।
অন্য দিকে ‘ভিন্টেজ ভায়োলেন্স’-এর প্রচারে আসা কোল স্প্রাউস জানিয়েছেন, টরন্টোতে থাকার সময় তিনি গণপরিবহন ব্যবহার করেছেন।
এবারের উৎসবে চলচ্চিত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে বিতর্কটি ছিল সম্ভবত সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক সঙ্ঘাতগুলোর একটি।
ড্যানি বয়েলের ‘ইঙ্ক’ ছবিতে পুরনো কিছু ছবি অ্যানিমেট করা এবং একটি দৃশ্যে ইঁদুর যুক্ত করার কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়েছে। প্রদর্শনীর পর প্রশ্নোত্তর পর্বে বয়েল যখন বলেন, প্রযুক্তিটি দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন, তখন দর্শকদের একটি অংশ তাকে ধিক্কার দেয়।
শুধু প্রেক্ষাগৃহেই নয়, ছবিটির প্রচারণার একটি বিলবোর্ডেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিরোধী ‘এআই স্লপ’ লেখা স্টিকার দেখা যায়।
ঘটনাটি হয়তো একটি ছবিকে ঘিরে। কিন্তু এর তাৎপর্য অনেক বড়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন চলচ্চিত্র নির্মাণের খরচ, সময় ও সৃজনশীলতার নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে; একই সাথে শিল্পী, অভিনেতা, নির্মাতা ও দর্শকের মধ্যে সৃষ্টি করছে নতুন অনিশ্চয়তা। টরন্টোর মতো চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক শহরে সেই বিতর্ক এবার প্রকাশ্যেই শোনা গেল।
চলচ্চিত্র উৎসবের সৌন্দর্য যতটা পর্দায়, ততটাই দর্শকের আচরণে। আর এখানেও ছিল কিছু অস্বস্তি। সিনেমা চলার সময় মোবাইল ফোন ও স্মার্টঘড়ি দেখা, চিপসের প্যাকেটের খসখস শব্দ, অনবরত কথা বলা, পর্দার দৃশ্য নিয়ে মন্তব্য করা, এমনকি সামনের আসনে লাথি মারার অভিযোগও করেছেন দর্শকেরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রেক্ষাগৃহের লাইনে- দর্শকেরা নিজেদের পাশের আসনের এমন অভিজ্ঞতা একে অন্যের সাথে ভাগ করেছেন।
এবারের টিফে সংবাদমাধ্যম ও ভক্তদের জন্য বড় তারকাদের কাছ থেকে সরাসরি কথা শোনার সুযোগও কিছুটা কমেছে। আলাদা চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক প্রেস সম্মেলনের আয়োজন ছিল না। অনেক স্টুডিও তাদের সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকারও কমিয়ে দিয়েছে।
অবশ্য অ্যানা কেনড্রিক, রুনি মারা, কেট মারা ও নাওমি ওয়াটসের মতো কয়েকজন তারকা সাংবাদিকদের যথেষ্ট সময় দিয়েছেন। ‘দ্য অনলি লিভিং পিকপকেট ইন নিউ ইয়র্ক’-এর জন টারটুরো লালগালিচায় সাংবাদিকদের সাথে মজা করতে গিয়ে নিজের চরিত্রের মতো করে তাদের ফোন চুরি করার অভিনয়ও করেছেন।
আবার জেস আইজেনবার্গের ঘটনাটি ছিল আরো স্বতঃস্ফূর্ত। তার ছবির দ্বিতীয় প্রদর্শনীতে টিফের সঞ্চালক দেরিতে পৌঁছলে তিনি নিজেই নিজের প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনা করেন।
অন্য দিকে রেবেল উইলসন, অরল্যান্ডো ব্লুম ও লুক ইভান্সের মতো কয়েকজন তারকা সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে দ্রুত চলে যান।
টিফের বাইরে সিনেমাপ্রেমীদের আরেকটি বড় আকর্ষণ ছিল ‘সিনেমা সেলার’। ক্রাইটেরিয়নের সাথে যৌথভাবে পরিচালিত এই দোকানে প্রতিদিন পুরো ব্লকে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।
ক্লাসিক ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের বিশাল সংগ্রহের জন্য সিনেমাপ্রেমীদের কাছে ক্রাইটেরিয়ন বিশেষভাবে জনপ্রিয়। গত বছর উৎসব চলাকালে একটি ট্রাক থেকে পরিচালিত ‘ক্রাইটেরিয়ন ক্লোসেট’-এর পর এবারো চলচ্চিত্র সংগ্রহের প্রতি দর্শকের আগ্রহ স্পষ্ট হয়েছে।
স্ট্রিমিংয়ের যুগেও সিনেমার শারীরিক সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং নিজের করে রাখার আকাক্সক্ষা যে শেষ হয়ে যায়নি, এই ভিড় তারই প্রমাণ।
তবে এবারের টিফের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জায়গা হতে পারে নতুন চলচ্চিত্র বাজার।
উৎসবের প্রথম আনুষ্ঠানিক চলচ্চিত্র বাজার নির্মাতা ও প্রযোজকদের নতুন প্রকল্পের জন্য অর্থায়ন, পরিবেশক ও ক্রেতা খুঁজে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এতদিন উৎসবের আড়ালে অনানুষ্ঠানিকভাবে যে কাজগুলো হতো, এবার সেগুলোকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেয়া হলো।
এই বাজার কতটা সফল হয়েছে, তার চূড়ান্ত হিসাব অবশ্য এখনই করা কঠিন। চলচ্চিত্র বিক্রি ও অর্থায়নের চুক্তি অনেক সময় উৎসব শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে চলে। টিফের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, এই বাজার থেকে কত অর্থের চুক্তি হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো তাদের হাতে নেই। তবে প্রাথমিক পরিসংখ্যান বলছে, উদ্যোগটির প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ ছিল যথেষ্ট।
চলচ্চিত্র বাজারে অংশ নিয়েছেন ৭ হাজার ১০ জনের বেশি প্রতিনিধি। উৎসবে সাধারণত অংশ নেয়া প্রায় পাঁচ হাজার পেশাদার প্রতিনিধির তুলনায় এটি প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। উপস্থিত ছিলেন প্রায় এক হাজার ৪৭৩ জন ক্রেতা- যা গত বছরের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি।
এই ক্রেতাদের প্রায় ৪০ শতাংশ এসেছেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এরপর কানাডা, জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ছিল শীর্ষ অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে।
বাজারের মাধ্যমে ২৮টি নতুন চলচ্চিত্রের ঘোষণাও এসেছে। এর মধ্যে হ্যালি বেরি, জো ক্রাভিটজ ও কলিন ফার্থ অভিনীত একটি রোমান্টিক কমেডি, মাইলস টেলার ও জেসন মোমোয়া অভিনীত একটি অপরাধ-রোমাঞ্চধর্মী চলচ্চিত্র এবং টম হ্যাঙ্কসের কণ্ঠে আব্রাহাম লিংকনের চরিত্রকে কেন্দ্র করে অ্যানিমেশন ও সরাসরি অভিনয়ের সমন্বয়ে তৈরি একটি চলচ্চিত্র রয়েছে।
এই পরিসংখ্যানই হয়তো এবারের টিফের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। উৎসবটি এখন শুধু সিনেমা দেখাতে চায় না; সিনেমা তৈরির পরবর্তী পথটিও তৈরি করতে চায়।
টরন্টোর রাত যত গভীর হয়েছে, উৎসবের আলো তত ধীরে ধীরে নিভেছে। লালগালিচা গুটিয়েছে, ব্যস্ত প্রেক্ষাগৃহগুলো আবার স্বাভাবিক হয়েছে, তারকারা ফিরেছেন নিজ নিজ শহরে। কিন্তু এবারের টিফ রেখে গেছে কিছু প্রশ্ন, কিছু বিতর্ক এবং অনেক গল্প।
‘লা বোলা নেগ্রা’র জয় সেই গল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল। কারণ শেষ পর্যন্ত দর্শক এমন একটি গল্পকে বেছে নিয়েছেন, যেখানে মানুষ নিজের পরিচয় লুকিয়ে না রেখে নিজেকে প্রকাশ করতে চায়, ভালোবাসাকে স্বীকার করতে চায় এবং সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে অন্য মানুষের সাথে নিজের যোগসূত্র খুঁজে পেতে চায়।
অন্য দিকে নতুন চলচ্চিত্র বাজার দেখিয়েছে, টিফ নিজেকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ব্যবসার আরো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে নিয়ে যেতে চাইছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে দর্শকের প্রতিবাদ বলেছে, প্রযুক্তির যুগেও মানবিক সৃষ্টিশীলতার প্রশ্নটি অমীমাংসিত। টিকিটের মূল্য নিয়ে ক্ষোভ মনে করিয়ে দিয়েছে, বড় হয়ে ওঠার সাথে উৎসবকে দর্শকের নাগালের মধ্যেও রাখতে হবে। আর তারকা, সাংবাদিক ও দর্শকের মধ্যকার দূরত্ব বলছে, চলচ্চিত্র উৎসবের প্রাণ শুধু পর্দায় নয়- মানুষের মুখোমুখি কথোপকথনেও।
তাই ৫১তম টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের শেষ দৃশ্যটি কেবল একটি পুরস্কার ঘোষণার দৃশ্য নয়। এটি যেন একই সাথে পুরনো সিনেমার প্রতি ভালোবাসা, নতুন প্রযুক্তির প্রতি কৌতূহল ও সংশয়, চলচ্চিত্র ব্যবসার নতুন সম্ভাবনা এবং মানুষের গল্প বলার চিরন্তন আকাক্সক্ষার এক মিলনমঞ্চ।
পর্দা নেমেছে। কিন্তু গল্প শেষ হয়নি। ‘লা বোলা নেগ্রা’র মতোই হয়তো টরন্টোর এই উৎসবও নিজের নতুন পরিচয় প্রকাশের পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল।