
চিকিৎসার প্রয়োজন হলে আমাদের অনেকেরই প্রথম চিন্তা হয়—বিদেশে গেলে হয়তো আরো ভালো চিকিৎসা পাওয়া যাবে। আত্মীয়স্বজনের পরামর্শ, পরিচিত কারো অভিজ্ঞতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা কোনো গল্পও অনেক সময় এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শুধু অন্যের অভিজ্ঞতা বা প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভর করে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়।
প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমার যে চিকিৎসা প্রয়োজন, সেটি কি বাংলাদেশে যথাযথভাবে করা সম্ভব?
গত কয়েক বছরে দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন বিশেষায়িত চিকিৎসা, উন্নত রোগ নির্ণয়, আধুনিক অস্ত্রোপচার, ক্যানসার চিকিৎসা, হৃদরোগের চিকিৎসা, কিডনি চিকিৎসা, স্নায়ুরোগের চিকিৎসা, শিশুদের জটিল চিকিৎসা এবং নিবিড় পরিচর্যার মতো অনেক ক্ষেত্রেই দেশে সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। একইসাথে বিভিন্ন হাসপাতাল আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক এবং একাধিক বিশেষজ্ঞের সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তুলছে।
এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে সব ধরনের চিকিৎসা বাংলাদেশেই পাওয়া যায়। কিছু অত্যন্ত বিরল রোগ, বিশেষায়িত প্রযুক্তি বা নির্দিষ্ট চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি যেন প্রয়োজনের ভিত্তিতে হয়, শুধু এই ধারণা থেকে নয় যে বিদেশে চিকিৎসা মানেই ভালো চিকিৎসা।
আমার অভিজ্ঞতায়, একজন রোগীর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন অনেক সময় চিকিৎসার জায়গা নির্বাচন নয়; বরং সঠিক রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসা পরিকল্পনা নিশ্চিত করা। একটি রোগের জন্য কোথায় চিকিৎসা হবে, তার আগে জানতে হবে রোগটি আসলে কী, চিকিৎসার উদ্দেশ্য কী এবং কী ধরনের বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন।
এখানে দ্বিতীয় মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে বড় অস্ত্রোপচার, জটিল রোগ, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা কিংবা ব্যয়বহুল চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আরেকজন যোগ্য বিশেষজ্ঞের মতামত নেয়া রোগী ও পরিবারের জন্য সিদ্ধান্তটি আরো পরিষ্কার করতে পারে।
বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। যাওয়ার আগে জানতে হবে—রোগের সঠিক নির্ণয় হয়েছে কি না, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেশে পাওয়া যায় কি না, কী ধরনের প্রযুক্তি প্রয়োজন, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা কেমন এবং চিকিৎসার পর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ কিভাবে পাওয়া যাবে।
কারণ, চিকিৎসা শুধু হাসপাতালের একটি কক্ষে সম্পন্ন হওয়া কোনো ঘটনা নয়। অনেক চিকিৎসার সাথে দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ, পরীক্ষা, পুনর্বাসন এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ জড়িত থাকে। বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার পর দেশে ফিরে এলে এই ধারাবাহিকতা কিভাবে বজায় থাকবে, সেটিও সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
খরচের বিষয়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিদেশে চিকিৎসার ক্ষেত্রে শুধু হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয় নয়, যাতায়াত, থাকা, খাবার, ভিসা, স্থানীয় পরিবহন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচও যুক্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত বাংলাদেশের স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত একটি পর্যবেক্ষণ গবেষণায় বিদেশে চিকিৎসা নিতে একজন রোগীর গড় নিজস্ব ব্যয় ছিল ২ লাখ ২০ হাজার ৫৯৩ টাকা। এর ৬৮ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল চিকিৎসা-সংক্রান্ত ব্যয় এবং ৩০ দশমিক ১ শতাংশ ছিল অন্যান্য ব্যয়। তবে এটি ২০২২–২৩ সময়ের তথ্য; একে ২০২৬ সালের বর্তমান গড় ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
তাই বিদেশে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে শুধু হাসপাতালের বিল নয়, পুরো চিকিৎসা-যাত্রার সম্ভাব্য ব্যয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। একইসাথে দেশে একই চিকিৎসার সুযোগ, চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি এবং সম্ভাব্য ব্যয়ও তুলনা করা উচিত।
আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—তথ্যের উৎস। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিকিৎসা নিয়ে অসংখ্য তথ্য পাওয়া যায়। কোনো রোগীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, একটি ভিডিও কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রচারণা দেখে নিজের চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। একজনের জন্য কার্যকর চিকিৎসা অন্যজনের জন্য একইভাবে কার্যকর নাও হতে পারে।
আমার কাছে স্বাস্থ্যসচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—রোগী যেন প্রশ্ন করতে শেখেন। ‘আমার রোগটি কী?’, ‘কেন এই চিকিৎসা প্রয়োজন?’, ‘অন্য কোনো চিকিৎসার সুযোগ আছে কি?’, ‘এই চিকিৎসা বাংলাদেশে করা সম্ভব কি?’, ‘চিকিৎসার ঝুঁকি কী?’, ‘চিকিৎসার পর কতদিন পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে?’—এসব প্রশ্ন করা রোগীর অধিকার।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থারও এখানে বড় দায়িত্ব রয়েছে। রোগীকে শুধু চিকিৎসা দেয়া যথেষ্ট নয়; কোন চিকিৎসা কোথায় পাওয়া যায়, কোন ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন, কখন দ্বিতীয় মতামত নেয়া উচিত এবং কোন পরিস্থিতিতে বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে—এসব বিষয়ে সহজ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য দেয়া প্রয়োজন।
কারণ তথ্যের ঘাটতি অনেক সময় মানুষকে অপ্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
আমাদের চিকিৎসা নিয়ে ভাবনার জায়গাটিও তাই আরো বাস্তবসম্মত হওয়া দরকার। বিদেশে চিকিৎসা নেয়া কখনো প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত যেন হয় সঠিক রোগ নির্ণয়, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে। একইভাবে দেশে চিকিৎসা নেয়ার সিদ্ধান্তও যেন শুধু খরচ কম হওয়ার কারণে না হয়; প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সুবিধা, চিকিৎসকের দক্ষতা, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সেবার সুযোগ বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।
আমার বিশ্বাস, একজন রোগীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—‘বাংলাদেশে চিকিৎসা নেব, নাকি বিদেশে যাব?’
প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘আমার প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য কোথায় উপযুক্ত চিকিৎসা, সঠিক বিশেষজ্ঞ এবং ধারাবাহিক সেবা পাওয়া সম্ভব?’
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিয়েই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।
কারণ চিকিৎসার ক্ষেত্রে দেশ নয়, সঠিক সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর
এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








