
আজ ২৬ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর শুরু হচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতির প্রচণ্ড টালমাটাল পরিবেশ পরিস্থিতিতে এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির দড়ি টানাটানির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও জাপান উভয়ই নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সেখানে দু’টি বন্ধুপ্রতিম দেশের সরকার ও জনগণের মধ্যে পাশাপাশি অবস্থানের অনিবার্যতার প্রেক্ষাপট নির্মিত হবে। সে নিরিখে এই সফরে দু’দেশেরই কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্যবহ হয়ে উঠবে।
অর্থনৈতিক অবস্থানের দিক দিয়ে ব্যাপক ব্যবধান সত্ত্বেও এশিয়ার এ দু’টি দেশের সরকার ও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্ক সুদৃঢ়করণ ও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা সম্প্রসারণের ঐকান্তিক ইচ্ছা এই সফরে প্রতিফলিত হবে, এটিই প্রত্যাশা। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও দ্বিপক্ষীয় ব্যবসায় বাণিজ্য বিনিয়োগ স্বার্থ দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের আধুনিক পর্যায়ে প্রাধান্য পেলেও বর্তমান সম্পর্কের ভিত্তি সুদীর্ঘ সময়ের গভীরে প্রোথিত। ওইসিডি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে জাপানই সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।
১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার সময় জাপান মার্কিন প্রভাব বলয়েরই দেশ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা চুক্তির বদৌলতে জাপান ওকিনাওয়া দ্বীপের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় সে বছর। ১৯৭২ সালেই জাপানের সাথে চীনের দীর্ঘদিনের বিরোধ প্রশমিত হয়ে সিনো-জাপান কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপরীত অবস্থান নেয়। চীনও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে পাকিস্তানের মিত্র দেশ হিসেবে বিপরীত অবস্থানে ছিল। ঠিক এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জাপানের সরকার ও জনগণের সমর্থন এবং বিজয়ের অব্যবহিত পরে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের সিদ্ধান্ত নিয়ে জাপান নিঃসন্দেহে তাৎপর্যবাহী ও সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়। এই মুহূর্তে বাংলাদেশকে নিয়ে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির যে দড়ি টানাটানি চলছে সেখানে জাপানের সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সুসংহত করা অত্যাবশ্যক।
জাপানিদের ভৌগোলিক অভিজ্ঞানে বর্তমান বাংলাদেশ হচ্ছে তাদের নিজেদের নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অর্থনীতির বলয়ভুক্ত দেশমণ্ডলীর সীমান্ত। তাদের বিবেচনায় বার্মা বা অধুনার মিয়ানমারই হচ্ছে এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পশ্চিম প্রান্ত। হিমালয় আসাম লালমাই পাহাড় পেরিয়ে সমতল ভূমিতে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসা আরব বণিকদের প্রবেশ এবং মধ্য এশিয়া থেকে আসা মোগল ও ইউরোপ থেকে আসা ইংরেজ শাসনাধীনে দীর্ঘদিন থাকার কারণে বাংলাদেশকে মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপীয় ভাবধারায় গড়ে ওঠা দেশমণ্ডলীর সদস্য ভাবা হয় জাপানে। এশীয় ঐকতান সৃষ্টিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রয়াস, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী এবং এর ভৌগোলিক-রাজনৈতিক অবস্থানকে বিশেষ তাৎপর্যবহ বলে জাপান মনে করে।
আধুনিক জাপানের সাথে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পথিকৃৎ তিনজনই বাঙালি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু এবং বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল। জাপানিদের কাছে ‘চান্দ্র বাসো’ নামে খ্যাত নেতাজী সুভাষ বসু আজও জাপানে বিশেষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তার দেহভস্ম টোকিওর একটি মন্দিরে সংরক্ষিত আছে। বিচারপতি ড. রাধাবিনোদ পাল জাপানিদের কাছে বাংলাদেশ-জাপান মৈত্রী ও বন্ধুত্বের সেতু হিসেবে বিবেচিত ও স্মরণীয়। কুষ্টিয়ার সলীমপুরে ড. রাধাবিনোদের জন্ম। তিনি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক (১৯৪১-৪৩) এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (১৯৪৩-৪৪) ছিলেন। তিনি ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফার ইস্ট (আইএমটিএফই), যা টোকিও ট্রায়াল নামে খ্যাত, ব্রিটিশ সরকার মনোনীত সদস্য বিচারক হয়েও জাপানিদের পক্ষে বিভক্ত রায় দেন। ১২৩৫ পৃষ্ঠা টাইপ করা তার রায়ে পরাজিত জাপানিদের স্বস্তি, সাহস, আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে।
জাপানিদের মধ্যে তাকেশি হায়াকাওয়া (১৯১৭-৮২) জাপান বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদারে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন। তিনি টানা ৪০ বছর জাপানের জাতীয় সংসদ ‘ডায়েট’ এ নির্বাচিত সদস্য ছিলেন এবং ‘ফাদার অব দ্য ডায়েট’ উপাধিতে ভূষিত হন। জাপানের ডায়েটে প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে হায়াকাওয়া বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি জাপানি জনগণ ও সরকারের সমর্থন সম্প্রসারণের নেপথ্যে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। স্বীকৃতিদানের এক মাসের মধ্যে ঢাকায় জাপানি দূতাবাসের কার্যক্রম শুরু হয় এবং ১৩-১৪ মার্চ হায়াকাওয়ার নেতৃত্বে তিন সদস্যের জাপানি সংসদীয় প্রতিনিধি দল প্রথম বাংলাদেশ সফরে আসেন। দেশে ফিরে ২৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী সাতোর কাছে পেশ করা রিপোর্টে তিনি (ক) বাংলাদেশকে ১০ মিলিয়ন ডলারের জরুরি অনুদান অবিলম্বে প্রদান এবং (খ) পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের হিস্যা আদায়ে জাপানের মধ্যস্থতার প্রস্তাব রাখেন। তার সুপারিশ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী সাতোর নির্দেশে ২৮ মার্চ ১৯৭২ জাপান বাংলাদেশে প্রথম অর্থনৈতিক সার্ভে মিশন পাঠায়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত জাপান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে চলেছে।
জাপান ও বাংলাদেশের সম্পর্ক সুদৃঢ়করণে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল সুদূরপ্রসারী। তাকাশি হায়াকাওয়া বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ‘Banguradesu to no Deai-Minzoku to Kokkyo wo Koette’ ‘Encounter with Bangladesh-Transcending Racial and Territorial Boundaries’ (টোকিও, ১৯৮২) রচনা করেন। সেই গ্রন্থেই অনুপুঙ্খভাবে হায়াকাওয়া তুলে ধরেছেন জাপান বাংলাদেশের সম্পর্কের সমৃদ্ধি সাধনে শহীদ জিয়ার অনবদ্য ভূমিকার কথা।
১৯৭৬ সালের ১৬ মার্চ বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে আট সদস্যের জাপানি প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরে নেতৃত্ব দেন হায়াকাওয়া। মূলত সে সফর থেকে দু’দেশের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ ও আর্থসামাজিক সহযোগিতার সূত্রপাত ঘটে। ১৯৭৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জাপান এয়ারলাইন্সের বিমান হাইজ্যাক ঘটনার সফল নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের সার্বিক সহযোগিতার প্রতি জাপানের সরকার ও জনগণের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে ২৭ অক্টোবর জাপান সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে হায়াকাওয়া চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশ সফর করেন, সে উপলক্ষে সে বছর ১৬ ডিসেম্বর জাপান বাংলাদেশকে একটি বোয়িং ৭৭৭ উপহার দেয়। উপহার হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকার বিমানটির নামকরণ করে ‘সিটি অব টোকিও’।
১৯৭৭ সালে সফরের সময় রাষ্ট্রপতি জিয়া গত এক বছরের বাংলাদেশের কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে হায়াকাওয়াকে কিছু ব্যাখ্যা দেন। তখন মি. হায়াকাওয়া একটি প্রবাদ উদ্ধৃত করে বলেন, ‘তুষারের আঘাত সহ্য করেই মেপল পাতার সৌন্দর্য বিকশিত হয়।’ অর্থাৎ, প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করেই প্রকৃত জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব। আমি আন্তরিকভাবে নবীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও উন্নতি কামনা করি। ‘দৃঢ় সঙ্কল্প নিয়ে আসুন আমরা হাত ধরাধরি করে এগিয়ে যাই।’ হায়াকাওয়া তার আত্মজীবনীতে আরো লিখেছেন, ‘অন্য কোনো দেশের সাথে আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ধরনের নজির আগে কখনো সৃষ্টি হয়নি। এটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার জাপানের প্রতি কত গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ অনুভূতি পোষণ করত।’
১৯৮১ সালের ৩০ মে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক ও অকাল মৃত্যুর সংবাদ জানার পর ১৯৮১ সালের জুন মাসের প্রথম দিকে জাপান-বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন এবং জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি লিগের সভাপতি হিসেবে তাকাশি হায়াকাওয়া টোকিওতে অনুষ্ঠিত এক সভায় শোকবার্তা দেন। তার স্মৃতিগাথায় সেটি সঙ্কলিত হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক ও অকাল মৃত্যুর সংবাদ আমাকে গভীর শোকে আচ্ছন্ন করেছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মনে হয়েছিল যেন আমি আমার পরিবারের অত্যন্ত প্রিয় একজন সদস্যকে হারিয়েছি। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ছিলেন জাপানের এক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রনায়ক। তিনি ছিলেন সততা ও আন্তরিকতার উজ্জ্বল প্রতীক। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি, জনগণের কল্যাণ এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। জেনারেল জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের এক বীর নায়ক। মাত্র ৪০ বছর বয়সে তিনি চট্টগ্রাম অঞ্চলের সামরিক কমান্ডার হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তার চোখ ছিল তীক্ষ্ণ ও গভীর দৃষ্টিসম্পন্ন, আর শরীর ক্ষীণকায় হলেও অত্যন্ত দৃঢ় ও বলিষ্ঠ।
১৯৮০ সালে জাপানের বুদোকান হলে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী Masayoshi Ohira-এর স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। অত্যন্ত ব্যস্ত সময়সূচি থাকার পরও রাষ্ট্রপতি জিয়া ব্যক্তিগতভাবে সেই অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এই ঘটনা জাপানি জনগণকে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করে। কারণ, ওই স্মরণসভায় অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন মাত্র দু’জন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি। অনুষ্ঠানে বিদেশী প্রতিনিধিদের মধ্যে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এসব ঘটনা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, জাপানের প্রতি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি কতখানি আন্তরিক ও নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন।
১৯৭৮ সালে তার রাষ্ট্রীয় জাপান সফরের সময় তিনি সৌজন্যবশত আমার নিজ প্রিফেকচার ওয়াকায়ামা সফরের জন্যও সময় বের করেছিলেন। সেখানে তার সহজ-সরল ও অকপট ব্যক্তিত্ব স্থানীয় জনগণের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।
১৯৮৫ সালের ১০ নভেম্বর ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁ হোটেলে হায়াকাওয়ার আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত হয়। সেই আবক্ষ মূর্তিতে উৎকলিত হয়েছে তার স্মৃতিকথার শেষ দু’টি বাক্যে উচ্চারিত তার জীবনদর্শনের মর্মবাণী— ‘বর্তমান সময়ে ...মানবজাতিকে টিকে থাকতে হলে একটি পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে। আমার বাংলাদেশ প্রীতি এবং ভাবাবেগ এই আদর্শের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ ও পরীক্ষা।’
প্রত্যাশা এই যে, এবারের শীর্ষ সফরের সময় জাপান-বাংলাদেশ আর্থিক সহযোগিতা দিগন্ত উন্মোচিত হবে। বাংলাদেশ জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি বড় অনুষঙ্গ হলো বিগত ৫৫ বছরে ক্রমবর্র্ধমান অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের প্রসার। এটি প্রণিধানযোগ্য যে, দু’দেশের সম্পর্কের গভীরতা এবং গতি প্রকৃতিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্যের উত্থান-পতন বিশেষ নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে।
জাপানই হচ্ছে এশিয়ায় বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের অন্যতম গন্তব্য। আবার জাপানি পণ্য বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্যের বেশির ভাগ দখল করে আছে। আশির দশকে জাপান কমোডিটি এইড হিসেবে বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে (বিশেষ করে ১৯৯০ সালের জুন মাসে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের এনার্জি সেক্টর ক্রেডিট) আমদানি সহায়তা দিয়েছে, এছাড়া জাপান প্রদত্ত অতি স্বল্প সুদেও প্রকল্প ঋণের পরিশোধিত অর্থ ডেট রিলিফ গ্র্যান্ট আকারে বাংলাদেশকে ফেরতও দিয়েছে। বাংলাদেশ বড় দু-তিনটি মেগা প্রকল্পে জাপানের বিনিয়োগ সহায়তার শর্ত শিথিল, অবকাঠামো খাতে উদার বিনিয়োগের আহ্বান, সঙ্কট মোকাবেলায় মহানুভব বাজেট সাপোর্ট প্রত্যাশা করতে পারে।
সর্বোপরি বহু প্রতীক্ষার পর স্বাক্ষরিত জাপান বাংলাদেশ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (ইপিএ) (যেটি বিদেশের সাথে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইপিএ এবং এলডিসি কান্ট্রিগুলোর সাথে জাপানের একমাত্র ইপিএ) কার্যকর করা। ২০২৪ সাল থেকে শুরু হয়ে কয়েক রাউন্ড নেগোসিয়েশনের পর গত ৬ ফেব্রুয়ারি (২০২৬) টোকিওতে ইপিএ স্বাক্ষরকারী ছিলেন বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন এবং জাপানের পররাষ্ট্রবিষয়ক রাষ্ট্রমন্ত্রী হোরি ইওয়াও। চুক্তিটি জাপানের পার্লামেন্টে রেটিফাই হওয়ার অপেক্ষায় ।
এই চুক্তির অধীনে টোকিও সাত হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশী পণ্যে (তৈরী পোশাকসহ বাংলাদেশের মোট রফতানির প্রায় ৯৭ শতাংশ) শতভাগ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। এতে পোশাক রফতানি সহজ করতে ‘সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন’ নিয়ম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর বিপরীতে জাপানের জন্য বাংলাদেশ এক হাজার ৩৯টি জাপানি পণ্যে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা দেবে, যার ফলে বাংলাদেশের বার্ষিক আমদানি শুল্ক ক্ষতি ২০ কোটি টাকার কম হবে বলে অনুমান করা হয়েছে। সেবা ও শ্রম গতিশীলতা দানকল্পে বাংলাদেশী পেশাজীবীদের (আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা, কেয়ারগিভিং এবং নার্সিংসহ) জন্য জাপানে ১২০টি সেবা উপখাত এবং জাপানি সেবা প্রদানকারীদের জন্য বাংলাদেশে ৯৮টি উপখাত উন্মুক্ত করা হয়েছে। বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি ম্যানুফ্যাকচারিং, অবকাঠামো, জ্বালানি ও লজিস্টিকস খাতে জাপানি প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে (SMEs) উৎসাহিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
লেখক : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান, জাপানে বাংলাদেশের সাবেক বাণিজ্যদূত
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








