
রাত গভীর হলেও শহর জেগে থাকে। জ্বলজ্বল করে। বাইরে উজ্জ্বল; কিন্তু ভেতরটা আলো-আঁধারেতে মোড়ানো। অন্ধকারের ভেতর জেগে উঠে ‘অভিজাতপাড়া’। আলোর ঝলকানিতে চাপা পড়ে অভিজাতদের নৈতিকতা। খসে পড়তে থাকে মুখোশ। দিনের আলোয় অভিজাতদের একেকজন প্রগতির ধারক-বাহক। তারা নারী স্বাধীনতার কথা বলেন। রাতের অভিজাত পাড়া নিয়ে গুঞ্জন আছে। মাঝে মধ্যে সেসব গুঞ্জন জনসমক্ষে সামনে চলে আসে। সম্প্রতি রাজধানীর ভাটারায় ঘটেছে এমনই ঘটনা। সেখানে পুলিশের এক অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়িতে অভিযান চালায় গোয়েন্দা পুলিশ। অভিযানে আটক করা হয় মোট ৮৫ জনকে। তাদের মধ্যে ৫৯ পুরুষ এবং ২৬ জন নারী। তারা কী উদ্দেশে গিয়েছিলেন ভাটারার ওই বাড়িতে?
ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন ছাপে সহযোগী একটি দৈনিক। ওই ঘটনায় সাজাপ্রাপ্তদের তালিকা ঘেঁটে দেখা গেছে, অনেকে নিজেদের নাম ঠিকঠাক দিয়েছেন। কিন্তু পেশা ও ঠিকানার পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেননি। এতে আটক অনেকের পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। কেউ ব্যবহার করেছেন ছদ্মনাম। সহযোগী দৈনিকের ওই প্রতিবেদন বলছে, রহস্যময় ওই মাদক আড্ডায় বেসরকারি কয়েকটি করপোরেট কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন। আড্ডায় ছিলেন একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করা অন্তত ২০ কর্মকর্তা। শীর্ষ মোবাইল অপারেটরসহ ডাকসাইটে বিভিন্ন কোম্পানির পদস্থ কর্মকর্তাও।
মোবাইল কোর্টে সাজা পাওয়া নারীদের প্রায় সবাই উচ্চবিত্ত পরিবারের। তাদের মধ্যে এক পুলিশ কর্মকর্তার দুই কন্যা ছিলেন। ছিলেন একটি বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থার ট্রেইনি ক্যাপ্টেনও। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের বিস্তারিত পরিচয়, পেশা, সেখানে জড়ো হওয়ার উদ্দেশ্য, বাড়িটিতে রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কাজ চলছিল কি না তা খতিয়ে দেখছে। দেখা হচ্ছে তাদের সাথে সাবেক সেনাকর্মকর্তা কাজী গুলশান আরা ও দেবাশীষ নারায়ণ পালের যোগসাজশ ছিল কি না। গত ১২ অক্টোবর রাজধানীর পল্লবী ও বনানী থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। তারা অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাথে যোগাযোগ রাখছিলেন বলে অভিযোগ ডিবির। বাড়িটি সত্যিই রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের আখড়া ছিল কি না, জানা যাবে তদন্তে। কিন্তু ওই আড্ডা মাদকে ভরপুর ছিল, এটি সত্যি। আসলে অপরাধ আর ষড়যন্ত্রের ‘উর্বরতা’ বাড়ায় মাদক। মাদক মানুষের বিবেচনা বিনাশ করে।
কথিত অভিজাতরা দিনের আলোয় প্রগতির পতাকা তুলে ধরেন, রাতে সেই তারাই কেন অন্ধকারে ডুবে থাকেন? আসলে এদের মনস্তত্ত্বে আছে দ্বিমুখী জীবনযাপন। একমুখে তারা অভিনয় করেন, ইঁদুরদৌড়ে তাল মেলান। নিজেদের সুশীল, ভদ্র হিসেবে উপস্থাপন করেন। কারণ এই ‘ভদ্র’ ভাবমর্যাদা টিকিয়ে রাখার ওপর নির্ভর করে তাদের ক্ষমতা, পদমর্যাদা এবং সামাজিক প্রভাব। কিন্তু মুখোশ বেশি সময় পরে থাকা যায় না। অস্বস্তি হয়। তাই রাতের অন্ধকারে মুখোশ খুলে শ্বাস নিতে চান তারা। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বাড়ি যদি অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে ওঠে, তাহলে এর চাইতে ‘নিরাপদ’ আর কী হতে পারে?
আমাদের এই অভিজাতরা হরহামেশা নারী স্বাধীনতার কথা বলেন। তারা নারীর ক্ষমতা চান। কথা বলেন মুক্তচিন্তার পক্ষে। কিন্তু গোপন বিনোদনের বেলায় নারীদের পণ্য বানিয়ে তোলেন, তাদের সম্মান ও মর্যাদার কথা ভাবেন না। ‘নারী’কে মনোরঞ্জনের উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিল্পের মোড়ক দেয়ারও চেষ্টা করে। খোলা-নাঙ্গা অনেক কিছু শিল্প হিসেবে দাঁড় করাতে চান তারা। তারা বলেন, শিল্পের কোনো সীমানা নেই। যুগের পর যুগ ধরে তথাকথিত প্রগতিশীলতার মোড়কে এমনই দ্বিচারিতা চলে আসছে।
তাহলে শিল্প কি শালীনতার সীমানা লঙ্ঘন? নিশ্চয়ই না। শিল্প মানুষের সুকুমারবৃত্তির প্রকাশ। শিল্প মানুষকে সুন্দর হতে শেখায়, হৃদয় পরিশুদ্ধ করে। যে সৃজনশীলতা মানুষের অবক্ষয় ঘটায়, পশুবৃত্তি উসকে দেয়, সমাজকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়, তাকে কি শিল্প বলা যায়?
নিজেদের অনৈতিক কাজের বৈধতা দিতে আর সমাজের চোখে ধুলো দিতে তারা শিল্পের চাদর জড়িয়ে নেন। সমাজ ও সংস্কৃতির সব নৈতিক সীমা মুছে ফেলতে চান । এ জন্য কাজ করে তাদের কিছু মুখপত্র। এসব মুখপাত্র এই অন্ধকারকে আধুনিক জীবনযাত্রা হিসেবে প্রচার করে। একে প্রগতির পথ হিসেবে উপস্থাপন করে। তাদের বৃত্তের ভেতর বড় ধরনের কেলেঙ্কারি ও অনৈতিকতা সামনে এলে ধামাচাপা দিতে মাঠে নামে। লঘু মন্তব্য করে প্রকৃত সত্য আড়ালের চেষ্টা করে। সমাজের অভিজাত প্রতিনিধিরা নিজেদের চতুর বাজিকর হিসেবে হাজির করে। যেকোনো পরিস্থিতিকে নিজেদের অনুকূলে ঘুরিয়ে নিতে চায় তারা।
অভিজাত এই দুর্বৃত্তদের কাজের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তরুণদের ওপর। তারা তরুণদের সামনে ভুল শিক্ষা হাজির করে। রাতারাতি ধনী হওয়ার কৌশল শেখায়। শর্টকাট উপায়ে কিভাবে টাকা উপার্জন করা যায়, এমন কাল্পনিক সফলতার গল্প মাথায় ঢুকিয়ে দেয়। এতে তরুণরা বিভ্রান্ত হয়। তাদের নৈতিক-অনৈতিক সীমারেখা মুছে যায়। ভাটারার ওই বাড়িতে যে তরুণ-তরুণীরা জড়ো হয়েছিলেন, তাদের প্রায় সবাই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাদের এই পরিণতি একদিনে হয়নি। দীর্ঘদিনের অবক্ষয়ী চর্চা তাদের ভেতর থেকে শূন্য করে দিয়েছে। আর সেই শূন্য অবস্থাই আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে গোয়েন্দা পুলিশ।
বাড়ির মালিক পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তারপরও সেখানে পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করেনি গোয়েন্দারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে। ক্ষমতা যাদের হাতে, তারা যখন নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে চান, তখন এমন পদক্ষেপে কিছুটা হলেও ভরসা পাওয়া যায়।
এ ঘটনার আরেকটি দিক হচ্ছে অপব্যবহার। এখানে ‘এয়ারবিএনবি’র অপব্যবহার করা হয়েছে। যারা ভ্রমণ করেন, তাদের কম খরচে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে পর্যটকদের প্রিয় হয়ে উঠেছে এ সেবা। এর মূল ধারণা হলো— যার বাড়িতে থাকার জায়গা আছে, তিনি চাইলে সেই জায়গাটা পর্যটকদের কাছে স্বল্পমেয়াদে ভাড়া দিতে পারেন। এতে পর্যটকরা স্থানীয় সংস্কৃতি ও আতিথেয়তা পান। কম খরচে থাকার ব্যবস্থা হয় তাদের। আমাদের দেশে এয়ারবিএনবি আছে। বিদেশ থেকে পর্যটকরাও আসছেন। কিন্তু এ সেবার আইনি কোনো রূপরেখা নেই।
চোখ বন্ধ করে রাখলে কি প্রলয় আটকে রাখা যায়? যারা ব্যাকপ্যাকার, তারা দেশ থেকে দেশে ঘুরেন। সংস্কৃতিবিনিময় করেন, তাদের পক্ষে তো পাঁচতারা হোটেলের খরচ বহন করা সহজ না। তারা বাংলাদেশে এলে এয়ারবিএনবি খোঁজ করেন, যেখানে কম খরচে থাকার সুযোগ আছে, সেখানে যান। কিন্তু এখানে আইনি কোনো নীতিমালা না থাকায় মাঝে মধ্যে হয়রানির শিকার হতে হয় তাদের। এমনকি তাদের হোস্ট যারা থাকেন, তাদের কাছে হোটেল চালানোর লাইসেন্স আছে কি না, জানতে চায় পুলিশ। অথচ এয়ারবিএনবির মূল ধারণা এর বিপরীত। একে যদি একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক হোটেলের মতো লাইসেন্সের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে ধারণার মূল উদ্দেশ্য থাকে না। অনেক দেশে এর জন্য সহজ ব্যবস্থা আছে। ওই দেশগুলোতে হোমস্টে ট্রেড লাইসেন্স বা হোটেল ব্যবসার অনুমোদন নিতে হয় না। সিটির ডেডিকেটেড অনলাইন পোর্টাল থেকে রেজিস্ট্রেশন নম্বর নিয়ে এয়ারবিএনবি চালানো যায়। আমাদের এখানে আইনি রূপরেখা না থাকায় সুযোগ নিচ্ছে অসাধু চক্র-ভাটারার ওই বাড়িতে যা ঘটেছে। এখানেও যদি পুলিশের অ্যাপ বা ডিজিটাল কোনো পোর্টালে অতিথিদের জাতীয় পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোডের বাধ্যতা থাকত, তাহলে এতসব বেআইনি কাজের সুযোগ থাকত না।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
smmoshahid@gmail.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








