মমেকে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা
মমেকে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা অবস্থায় মানুষের ভরসার জায়গা হাসপাতাল। বিশেষ করে দেশের বিশাল নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের কাছে সরকারি হাসপাতাল অবলম্বন। বেসরকারি হাসপাতালের খরচ বহনের সক্ষমতা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নেই। তাই অসুখ-বিসুখে বা জীবন-মরণ সঙ্কটে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়ার প্রত্যাশায় সরকারি হাসপাতালে যান রোগীরা। কিন্তু সেই ভরসার জায়গায় যখন গাফিলতি, দুর্নীতি ও অমানবিকতা থাকে, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ ভেঙে যায়। 

Advertisement

নয়া দিগন্তের খবরে এসেছে, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসাসামগ্রী পাওয়া গেছে শহরের শম্ভুগঞ্জ এলাকার একটি ময়লার স্তূপে। দেখা গেছে, প্যাকেটজাত সিরিঞ্জ, ক্যানুলা ও স্যালাইনের মতো অতি প্রয়োজনী চিকিৎসাসামগ্রীর মেয়াদ ২০২৮ ও ২০৩১ সাল পর্যন্ত আছে। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, হাসপাতালের ময়লার সাথে কিভাবে এসব সামগ্রী বাইরে গেল, কারা নিয়েছে?

মূলত ময়লার ঝুড়িতে করে এসব সামগ্রী হাসপাতাল থেকে বের করা হয়, তারপর পাইকারি বাজারে বিক্রি করে দেয়া হয় বলে তথ্য দিয়েছেন ময়লা বাছাইকারী শ্রমিকরা। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, হাসপাতাল থেকে ময়লা বাইরে নেয়ার সময় কি কোনো তদারকি বা যাচাই-বাছাই করা হয় না? হাসপাতালের সিনিয়র স্টোর অফিসার জানিয়েছেন, এই অনিয়মের সুযোগ নেই। কিন্তু সুযোগ না থাকলে সামগ্রীগুলো বাইরে গেল কিভাবে; তার ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। বিষয়টির সত্যতা খতিয়ে দেখে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে নির্দিষ্ট কিছু মৌলিক ওষুধ রোগীদের বিনামূল্যে দেয়ার কথা। কিন্তু বেশির ভাগ হাসপাতালের চিত্র হলো— অনেক ক্ষেত্রে সেই ওষুধগুলোও বাইরে থেকে কিনে আনতে হয় রোগী অথবা তাদের স্বজনদের। পরে সেগুলো বাইরে বিক্রি করে দেয়া হয়।

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এ অব্যবপস্থাপনা সাধারণ কোনো ভুল নয়। এটি জনমানুষের জীবন নিয়ে খেলা, চরম দায়িত্বহীনতা এবং সরকারি সম্পদ তসরুপ। সেই সাথে জনস্বাস্থ্য নিয়ে নিষ্ঠুর তামাশা। এর পেছনে আছে সঙ্ঘবদ্ধ অসাধু চক্র। তারা হাসপাতালের মজুদ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকর গলিয়ে এবং যথাযথ তদারকির অভাবে এ অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনা প্রমাণ করে, হাসপাতালের ভেতরের সরবরাহ ও তদারকি ব্যবস্থা কত দুর্বল।
যেকোনো দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নাগরিক অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষার মূল মাপকাঠি। সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্বে অবহেলা থাকলে রাষ্ট্রকাঠামোর ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়।
আমরা মনে করি, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এ ঘটনা শুধু দায়সারা গোছের শোকজ বা আনুষ্ঠানিকতায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। চিকিৎসাসেবার মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে এ ধরনের লুটপাট ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না। অবিলম্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে হাসপাতালের ইনভেন্টরি বা মজুদ খাতা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে যারা নিয়ে যায় সেই চক্র এবং এর হোতাদের মুখোশ খুলে দিতে হবে। জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে হাসপাতালের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। এতে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।