
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও সরকার ৩৫ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের আইন পেশায় প্রবেশ বন্ধ করতে আইন সংশোধনের বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনায় নিয়েছে। এ উদ্যোগের ঘোষিত লক্ষ্য, আইন পেশায় যারা নতুন ঢুকবেন তারা যাতে মানসম্মত আইনজীবী হন তা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রস্তাবিত বিধিনিষেধের সাথে শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার কোনো সম্পর্ক নেই; এর একমাত্র ভিত্তি বয়স। অর্থাৎ, এটি বয়সের কারণে বৈষম্য সৃষ্টির একটি প্রয়াস। আইন পেশায় গত কয়েক বছরে নতুন আইনজীবীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে পেশাগত মানের অবনতিও ঘটেছে, এ কথা অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। কিন্তু বয়স দিয়ে তো আর নির্ধারণ করা যায় না, কে ভালো আইনজীবী হবেন আর কে হবেন না। এই বিধিনিষেধে পেশাটিতে নতুন প্রবেশকারীর সংখ্যা কমতে পারে; কিন্তু তাতে আইন পেশার সামগ্রিক মান বাড়বে— এমন প্রত্যাশার বাস্তব ভিত্তি নেই।
২০০২ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে একটি বিষয় আমার নজরে এসেছিল। বাংলাদেশে আইনজীবী হিসেবে যোগ্যতা অর্জনে একজন প্রার্থীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হতো। শর্তটি আমার কাছে বেশ অদ্ভুত মনে হয়েছিল। কারণ নাগরিকত্বের সাথে একজনের শিক্ষাগত যোগ্যতা, আইনি জ্ঞান কিংবা পেশাগত দক্ষতার কোনো সম্পর্ক নেই। পরে আমার বাবা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক জানান, বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এ এ শর্ত যুক্ত করার পেছনের কারণ তাকে একবার ব্যাখ্যা করেছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। তখন আশঙ্কা করা হয়েছিল, এমন বিধিনিষেধ না থাকলে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের আইন পেশা ভারতীয় আইনজীবীদের দখলে চলে যেতে পারত। ব্যাখ্যাটি সঠিক হলে আর যা হোক, অন্তত এটা বলা যায়, এ বিধানের লক্ষ্য পেশাগত যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে আইন পেশায় প্রবেশের সুযোগ সীমিত করা হয়েছিল। অন্যভাবে বলা যায়, এ পেশায় প্রবেশের পথে কৃত্রিম বাধা তৈরি করে দেশীয় আইন পেশাকে সুরক্ষা দেয়াই ছিল উদ্দেশ্য। এর ফল হয়েছে সুদূরপ্রসারী, প্রয়োজনীয় আইনি দক্ষতা ও উচ্চতর যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেউ কেবল বাংলাদেশের নাগরিক নন বলে এ দেশে আইন পেশায় যুক্ত হতে পারেন না। যুক্তরাজ্যে ব্যারিস্টার হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেছেন এবং এখন বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন— এমন বহু বাংলাদেশী আইনজীবীর বিদেশী জীবনসঙ্গীও এই বিধিনিষেধের শিকার। তাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা আইন পেশায় মূল্যবান হতে পারে; তারপরও শুধু বাংলাদেশের নাগরিকত্ব না থাকায় তারা আইনজীবী হিসেবে কাজ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থেকে যান। এভাবে পেশার মানোন্নয়ন হয় না; বরং পেশাটি আরো আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। একই সাথে গড়পড়তা মানের চর্চাকে উৎসাহিত করা হয়।
জাতীয়তার ভিত্তিতে আরোপিত বিধিনিষেধের মতো ঠিক একই সমস্যা আছে পেশাটিতে প্রবেশের বয়সসীমা নির্ধারণের নতুন প্রস্তাবটির মধ্যেও। এটিও একধরনের কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা। পেশাগত মান উন্নয়নের বদলে এটি আইন পেশার বুদ্ধিবৃত্তিক মানের অবনতি ত্বরান্বিত করবে। অনেকে জীবনের অপেক্ষাকৃত পরিণত পর্যায়ে আইন পেশায় প্রবেশ করেন, যারা এর আগে অন্য পেশায় কাজ করে মূল্যবান জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা আইন পেশাকে সমৃদ্ধ করতে পারে। যুক্তরাজ্যে বার পরীক্ষায় পড়াশোনা করার সময় অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন ইংরেজ পুলিশ কর্মকর্তাকে আমার সাথে ব্যারিস্টার হওয়ার প্রস্তুতি নিতে দেখেছিলাম। অপরাধ তদন্ত ও ফরেনসিক কাজে বহু বছরের অভিজ্ঞতাকে তারা আইন পেশায় কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। ইংল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী প্রতিষ্ঠানগুলোও পুলিশি কার্যক্রম ও অপরাধ তদন্তে অর্জিত অভিজ্ঞতার গুরুত্বকে আমলে নিয়ে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়েছে— এমন উদাহরণ আমার জানা আছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট হরিশ সালভের দৃষ্টান্তও প্রাসঙ্গিক। ১৯৯৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের সলিসিটর জেনারেল ছিলেন। ২০১৩ সালে, প্রায় ৬০ বছর বয়সে, তিনি ইংল্যান্ডের বারে আইন পেশায় কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করেন। ২০২০ সালে তিনি কিংস কাউন্সেল নিযুক্ত হন। বর্তমানে তিনি ইংল্যান্ডের অন্যতম প্রধান আইনজীবী চেম্বার ব্ল্যাকস্টোন চেম্বার্সের সদস্য। এসব উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে, বয়স বাড়লে আইন পেশায় অবদান রাখার সামর্থ্য কমে যায় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে বয়সের সাথে অর্জিত অভিজ্ঞতা একজন আইনজীবীকে এমন স্বতন্ত্র অবদান রাখার সুযোগ করে দেয়, যা কম বয়সে অর্জন করা সম্ভব নাও হতে পারে।
বাংলাদেশেও এমন অনেক বিশিষ্ট জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আছেন, যারা জীবনের অপেক্ষাকৃত পরিণত বয়সে আইন পেশায় এসেছেন। আমার বাবা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক তাদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডনে আইন পেশায় কাজ করেছেন। এরপর ৩৫ বছর বয়সে বাংলাদেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। বাংলাদেশ বারে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল তুলনামূলকভাবে দেরিতে; কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের ইসলামী আইন, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইন ও সাংবিধানিক আইনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। আইন পেশায় প্রবেশের বয়সসীমা নির্ধারণ করা হলে অন্যদের জন্য তার দেখানো পথ অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। ইংল্যান্ড কিংবা অন্য কোনো দেশে দীর্ঘদিন আইন পেশায় কাজ করার পর অনেক ব্যারিস্টার ও আইনজীবী বাংলাদেশে ফিরে আসতে চাইতে পারেন। তাদের সাথে আসতে পারে বিদেশে অর্জিত মূল্যবান জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতা। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বাংলাদেশে অবসরের বয়স তুলনামূলকভাবে কম। ফলে অধস্তন আদালতের বিচারক, সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তা এবং অন্য অনেক পেশার মানুষের সামনে অবসরের পরও কর্মক্ষম ও সৃজনশীল জীবন যাপনের যথেষ্ট সময় থাকতে পারে। তাদের অভিজ্ঞতা আইন পেশায় তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বাস্তবে অনেকে ইতোমধ্যে তা করেও দেখিয়েছেন। মোদ্দাকথা, আইন পেশায় প্রবেশের বয়স বেঁধে দিয়ে ক্ষেত্রটিতে পেশাগত মান উন্নত করা যায় না; বরং এর ফলে বিভিন্ন পেশা, জ্ঞানশাখা ও বিচারব্যবস্থায় অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বিশেষ দক্ষতা থেকে আইন পেশাকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ সঙ্কুচিত হয়।
এ বিধিনিষেধের চূড়ান্ত পরিণতি হবে আইনজীবী সমাজে গড়পড়তা মানের বিস্তার। এর ফলে অন্য পেশায় সাফল্য অর্জন করা ব্যক্তিরা আইন পেশায় আসার সুযোগ হারাবেন। এমন যুক্তিকে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হবে না যে, পেশাগত উৎকর্ষতা নিশ্চিত করা নয়; বরং আইনজীবীদের মধ্যকার প্রতিযোগিতা কমানো এ বিধিনিষেধের প্রকৃত উদ্দেশ্য। অথচ নতুনদের প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত আইনজীবীদের সুরক্ষা দেয়া এ পেশাকে শক্তিশালী করার যৌক্তিক পন্থা নয়; বাস্তবে এর ফল হয় ঠিক উল্টো। প্রতিযোগিতা যত কম হবে, মানোন্নয়নের তাগিদও তত কমে যাবে।
কিন্তু বয়সসীমা ৩৫ বছর কেন? ৩০ বা ৪০ বছর নয় কেন? সরকার কিংবা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কোন যুক্তিতে এ নির্দিষ্ট বয়স বেছে নিয়েছে? ৩৫ বছর বয়সের সাথে একজনের আইনি দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা কিংবা আইনজীবী সমাজে অবদান রাখার সামর্থ্যরে কোনো স্পষ্ট সম্পর্ক নেই। এ বয়সসীমা নির্ধারণের পেছনে সুনির্দিষ্ট যুক্তি না থাকলে একে খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কী বলা যায়? উদ্বেগ আরো বাড়ে এ কারণে যে, এমন একসময়ে এ বয়সসীমা আরোপের প্রস্তাব এসেছে যখন বাংলাদেশ বার কাউন্সিল নিজেই নির্বাচিত নয়। কারা আইন পেশায় প্রবেশ করতে পারবেন, তা নির্ধারণকারী এমন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের আগে গভীর পর্যালোচনা এবং আইন পেশার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে যথাযথ আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। বার কাউন্সিলের সদস্যরা যদি নির্বাচিত হতেন এবং যাদের তারা প্রতিনিধিত্ব করছেন সেই আইনজীবীদের কাছে সরাসরি জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকতেন, তবে আশা করা যেত যে এ ধরনের বিধিনিষেধ আরোপের আগে আরো গভীর চিন্তাভাবনা ও বিস্তৃত আলোচনা হতো।
সরকার ও বার কাউন্সিল যদি সত্যি আইন পেশায় প্রবেশের সুযোগ সীমিত করতে চায়, তাহলে তার আরো যুক্তিসঙ্গত পথ আছে। পরীক্ষার মান কঠোর করা যেতে পারে, যাতে কেবল নিষ্ঠাবান ও যথেষ্ট যোগ্য প্রার্থীরা উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ পান। বিকল্প হিসেবে প্রতি বছর পেশায় প্রবেশের সুযোগের সংখ্যাও নির্দিষ্ট করে দেয়া যেতে পারে। যেমন, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মধ্য থেকে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত প্রথম এক হাজার প্রার্থীকে আইন পেশায় প্রবেশের অনুমতি দেয়া যেতে পারে। পদ্ধতি যা-ই হোক, আইন পেশায় প্রবেশের অধিকার নির্ধারণ করতে হবে শিক্ষাগত যোগ্যতা, আইনি জ্ঞান এবং পেশাগত পরীক্ষার কৃতিত্বের ভিত্তিতে। কারো বয়স বা জাতীয়তার মতো খামখেয়ালিপূর্ণ বিবেচনা এর নির্ধারক হতে পারে না। যোগ্যতার সাথে সম্পর্কহীন শর্ত আরোপ করে আইন পেশার মান উন্নত করা যায় না। যোগ্যতাকে পাশ কাটিয়ে আরোপিত বিধিনিষেধ পেশার মান বাড়ায় না; বরং উৎকর্ষতার পথ রুদ্ধ করে গড়পড়তা মানকে টিকিয়ে রাখে।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং দ্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








