
এ দেশে চাঁদাবাজি এখন সম্ভবত আর অপরাধ নয়। এটি এখন ব্যবসাবাণিজ্য, পরিবহন, বাজারব্যবস্থা ও নাগরিক জীবনের প্রায় সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানীর পাইকারি বাজার থেকে ফুটপাথ, গণপরিবহন থেকে পণ্য পরিবহন, এমনকি আবাসিক এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও চাঁদাবাজি থেকে মুক্ত নয়। কোথাও প্রকাশ্যে, কোথাও পরোক্ষভাবে, আবার কোথাও ভয়ভীতি দেখিয়ে চলছে অর্থ আদায়। অনেক ক্ষেত্রে এটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
চাঁদা না দিলে হামলা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা প্রাণনাশের হুমকির ঘটনা ঘটছে। প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রের আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে থেকেও কিভাবে অপরাধীরা দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারে?
২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর গাজীপুরের হাজী আবদুর রহিম পাইকারি কাপড়ের মার্কেটের সাংগঠনিক সম্পাদকের কাছে মোবাইল ফোনে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে। টাকা না দিলে পুরো মার্কেটে আগুন লাগিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
চাঁদা দাবির সময় ২০২২ সালের ২৫ ডিসেম্বরের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের প্রসঙ্গ তোলা হয়। ওই ঘটনায় বাজারের বিপুল পরিমাণ মালামাল পুড়ে যাওয়ার স্মৃতি ব্যবসায়ীদের মনে এখনো আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। সেই আতঙ্ককে পুঁজি করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হলে তা নিছক চাঁদাবাজি নয়; এটি মানুষের জীবন, সম্পদ ও জীবিকার ওপর সরাসরি হুমকি।
এ ধরনের অভিযোগের দ্রুত তদন্ত এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ অপরাধীরা যখন ভয়কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তখন নীরবতা তাদের আরো বেপরোয়া হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
চাঁদাবাজির অভিযোগ শুধু ফুটপাথ বা গণপরিবহনে সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকা গুলশানে গৃহস্থালি বর্জ্য অপসারণের কাজ পরিচালনাকারী গুলশান সোসাইটির কর্মকর্তাদের সাথে দুর্ব্যবহার, মাসে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং তা না দিলে প্রাণনাশের হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত ৬ অক্টোবর ‘মাহবুব ও রবিন গ্রুপ’ এবং ‘রবি এন্টারপ্রাইজ’-এর পরিচয় ব্যবহার করে কয়েকজন ব্যক্তি এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আবাসিক এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নাগরিক সেবামূলক কাজেও যদি অবৈধ অর্থ আদায়ের চাপ তৈরি হয়, তাহলে নগর ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অন্য দিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক ও পিকআপে শাকসবজি, মাছ, মসলা এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য রাজধানীর কাওরান বাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি আড়তে আসে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পণ্য পরিবহন, প্রবেশ, খালাস ও বেচাকেনার বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়।
এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত কার কাঁধে পড়ে? ব্যবসায়ী তা পণ্যের দামের সাথে যুক্ত করলে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ ক্রেতা। অর্থাৎ, চাঁদাবাজির প্রভাব শুধু অর্থ প্রদানকারী ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে।
রাজধানীর ফুটপাথ ও অস্থায়ী বাজারে চাঁদাবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের তথ্যের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, ঢাকার ফুটপাথগুলো থেকে বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। রাজধানীর ২৭৯টি স্থানে ফুটপাথ ও অস্থায়ী বাজারকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে।
এসব অভিযোগ সত্য হলে তা নগর অর্থনীতির একটি বড় দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। ফুটপাথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুঁজি সীমিত। পণ্যের ক্রয়মূল্য, পরিবহন খরচ ও দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর পর তাদের আয় খুব বেশি থাকে না। এর ওপর নিয়মিত চাঁদা দিতে হলে সঙ্কট আরো বাড়ে।
চাঁদাবাজি তাই শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অস্তিত্বের সঙ্কট। ফুটপাথ দখল, চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হলে কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা বলে কিছু থাকে না।
চাঁদাবাজির সবচেয়ে বিস্তৃত ক্ষেত্রগুলোর একটি পরিবহন খাত। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দেশের প্রায় তিন হাজার স্থানে প্রতিদিন যানবাহন থেকে চাঁদা আদায় করা হয়। দৈনিক আদায়ের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সে হিসাবে মাসে প্রায় তিন হাজার কোটি এবং বছরে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকার হিসাব দাঁড়ায়।
রাজধানীর প্রায় আট হাজার সিটি বাস থেকে প্রতিদিন গড়ে ৮০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, রিকশা, অটোরিকশা, লেগুনা ও অন্যান্য যানবাহন থেকেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যায়। অভিযোগোর ব্যাপকতা গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করে।
পরিবহন খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় হলে তার প্রভাব পরিবহনমালিক ও শ্রমিকদের আয়, যাত্রীভাড়া এবং পণ্য পরিবহন ব্যয়ে পড়তে পারে। ব্যবসায়ীরা বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সাথে যুক্ত করলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ ভোক্তারা।
অর্থাৎ, চাঁদাবাজি একটি অদৃশ্য করের মতো কাজ করে, যার কোনো বৈধ রসিদ নেই, অথচ ব্যয় বহন করতে হয় সমাজের মানুষকে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে তিন হাজার ৮৪৯ জন চাঁদাবাজের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর এলাকায় রয়েছেন এক হাজার ২৫৪ জন। পুলিশের দাবি, তালিকাভুক্তদের প্রায় ৯০ শতাংশ রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত।
এই তথ্যের যথার্থতা যাচাই করা জরুরি। তালিকা যদি নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হলো, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? কারা তদন্তের আওতায় এসেছেন? কতটি অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে? আর কারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন?
অপরাধ দমনে তালিকা তৈরি একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র। এর সাফল্য নির্ভর করে তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ, বিচার এবং অপরাধের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়ার ওপর।
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পথে বড় বাধা হলো ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তাহীনতা। অভিযোগকারীর পরিচয় প্রকাশ হয়ে গেলে তার ওপর নেমে আসতে পারে চাঁদাবাজ চক্রের হুমকি ও প্রতিশোধের থাবা। তাই ভয়ে অনেকে নীরব থাকতে বাধ্য হন। এই নীরবতাকে অপরাধীরা নিজেদের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে।
পরিস্থিতি বদলাতে হলে অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ গ্রহণের সহজ ও গোপনীয় ব্যবস্থা, দ্রুত তদন্ত, সাক্ষী সুরক্ষা এবং অভিযোগের অগ্রগতি সম্পর্কে যথাযথ তথ্য দেয়ার ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সাথে বিচারপ্রক্রিয়ায় অযৌক্তিক বিলম্ব কমাতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের বিষয়ে আস্থা ফিরে পান।
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযানে মাঠপর্যায়ের কিছু অর্থ সংগ্রহকারীকে গ্রেফতার করা সহজ; কিন্তু তাদের পেছনে যারা রয়েছে, অর্থের ভাগ যারা পাচ্ছে এবং যে প্রভাবশালী মহল চাঁদাবাজদের সুরক্ষা দিচ্ছে তাদের আইনের আওতায় আনাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অপরাধবিজ্ঞানীর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো কোনো ব্যক্তি জনসেবার উদ্দেশ্যে রাজনীতিতে এসেও পরে স্বার্থের গন্ধ পেয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সাথে যোগসাজশের মাধ্যমে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চাঁদাবাজির মতো অপরাধ বন্ধ না হওয়ার অন্যতম কারণ, অর্থ আদায়ের নির্দেশদাতা ও মূল পৃষ্ঠপোষকদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়া।
এ কারণেই চাঁদাবাজি দমনে শুধু গ্রেফতারের সংখ্যা দিয়ে সাফল্য পরিমাপ করা যাবে না। দেখতে হবে, অপরাধের নেপথ্যের নেটওয়ার্ক কতটা ভেঙে দেয়া গেছে, অবৈধ অর্থের প্রবাহ কতটা বন্ধ হয়েছে এবং ভুক্তভোগীরা কতটা নিরাপদ বোধ করছেন।
চাঁদাবাজি বন্ধে নিয়মিত অভিযান ও গ্রেফতারের পাশাপাশি অবৈধ অর্থ আদায়ের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়া জরুরি। পরিবহন, টার্মিনাল, বাজার, ফুটপাথ ও পণ্য খালাসকেন্দ্রে কোথায়, কারা এবং কিভাবে অর্থ আদায় করছে, তা শনাক্ত করতে সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন।
বৈধ ফি ও চার্জের তালিকা প্রকাশ, রসিদভিত্তিক অর্থ আদায় এবং ডিজিটাল লেনদেন চালুর মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের সুযোগ কমানো যেতে পারে। একই সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। চাঁদাবাজ যে দলেরই হোক, যে পরিচয়ই ব্যবহার করুক কিংবা যত প্রভাবশালীই হোক, অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্বাচিত বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দায়মুক্তি দিয়ে কেবল মাঠপর্যায়ের লোকজনকে গ্রেফতার করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
চাঁদাবাজি দমন শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নয়; এটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং অর্থনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠারও প্রশ্ন। ফুটপাথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক থেকে পণ্য সরবরাহকারী, কেউই যদি অবৈধ অর্থ আদায়ের চাপ থেকে নিরাপদ না থাকেন, তাহলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাভাবিক পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হবেই।
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন শুধু অর্থ সংগ্রহকারীরা নয়, তাদের নেপথ্যের হোতা ও পৃষ্ঠপোষকরাও আইনের আওতায় আসবেন। অন্যথায় অভিযান চলবে, গ্রেফতার হবে; কিন্তু চাঁদাবাজির চক্র ভাঙবে না। সেই ব্যর্থতার মূল্য দিতে হবে পুরো সমাজকে।
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








