
চীন নিয়ে অনেক পড়েছি, ইউটিউব কিংবা টেলিভিশনেও দেখেছি কম নয়। কিন্তু নিজের চোখে দেখা আর অন্যের বর্ণনা পড়ে জানার মধ্যে যে কত তফাত, এবারের সফরে তা টের পেলাম। চলতি মাসেই বেইজিং, শিয়ান ও সাংহাই ঘুরে এলাম। সফর দীর্ঘ ছিল না; কিন্তু তা মনে অনেক প্রশ্ন জাগিয়েছে। একসময় দারিদ্র্য, যুদ্ধ ও অস্থিরতায় বিপর্যস্ত চীন কয়েক দশকে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি হলো কিভাবে? আর আমরা কেন স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও একটি সুষ্ঠু রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়তে পারলাম না? প্রশ্নটি আজ আরো জরুরি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষ রাষ্ট্রব্যবস্থায় যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছে, তা পূরণের দায় এখন ক্ষমতাসীন সরকারেরও। পুরনো ব্যবস্থার কতটা পরিবর্তন তারা করতে পারবে সে প্রশ্ন আছে।
ইতিহাস বাঁচিয়ে আধুনিকতার পথে
বেইজিংয়ে নেমেই চোখে পড়ল প্রশস্ত সড়ক, পরিকল্পিত নগর আর পরিচ্ছন্নতা। কিন্তু সবচেয়ে বেশি টেনেছে ইতিহাসের প্রতি যত্ন। ফরবিডেন সিটি, সামার প্যালেস, টেম্পল অব হেভেন, শত শত বছরের স্থাপনা আজও সযত্নে সংরক্ষিত। একটি জাতি তার অতীতকে কতটা মর্যাদা দেয়, এখানে এলে বোঝা যায়।
মহাপ্রাচীরে ওঠা সহজ ছিল না। ক্যাবল কারের পরও খাড়া সিঁড়ি ভাঙতে হয়েছে। তবু পাহাড়ের পর পাহাড় পেরিয়ে যাওয়া প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে বিস্মিত হয়েছি। মানুষের শ্রম ও পরিকল্পনা কত বড় কীর্তি গড়তে পারে! অবশ্য এর পেছনে অসংখ্য শ্রমিকের কষ্টের ইতিহাসও ভুলে যাওয়ার নয়।
সাড়ে চার ঘণ্টায় এক হাজার ২০০ কিলোমিটার
বেইজিং থেকে প্রায় এক হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরের শিয়ান গেলাম বুলেট ট্রেনে। সময় লাগল সাড়ে চার ঘণ্টা। অথচ ঢাকা থেকে সিলেট কিংবা চট্টগ্রামের তুলনামূলক ছোট পথেই আমাদের পাঁচ থেকে আট ঘণ্টা লেগে যায়। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বা সিলেট দুই ঘণ্টায় পৌঁছানো গেলে ব্যবসা, পর্যটন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগ তৈরি হতো। মানুষকে সব কাজে ঢাকায় ছুটতে হতো না; আঞ্চলিক শহরগুলো অর্থনৈতিক কেন্দ্র হতে পারত, রাজধানীর ওপর চাপও কমত।
পদ্মা সেতুর অভিজ্ঞতাও মনে রাখা দরকার। দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে বিশ্বব্যাংক ২০১২ সালে অর্থায়ন বাতিল করেছিল। পরে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মিত হলেও ব্যয় বৃদ্ধি ও জবাবদিহির প্রশ্ন থেকে যায়। তাই পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারলে দ্রুতগতির রেলব্যবস্থার কথাও আমরা ভাবতে পারি। তবে আগে অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা, যাত্রী চাহিদা, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। উন্নয়নের সাফল্য শুধু কতটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হবে, প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে ও যৌক্তিক ব্যয়ে শেষ হয়েছে কি না, মানুষের কতটা সময় বাঁচিয়েছে, জীবন কতটা সহজ করেছে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে কতটা সুফল বয়ে এনেছে।
শিয়ান : মাটির নিচে দুই হাজার বছর
শিয়ানে দেখলাম টেরাকোটা সেনাবাহিনী। ১৯৭৪ সালে কয়েকজন কৃষক জমিতে সেচের জন্য কুয়া খুঁড়তে গিয়ে মাটির নিচে পোড়ামাটির সৈনিকের মূর্তির ভগ্নাংশ খুঁজে পান। সেই আকস্মিক আবিষ্কারই উন্মোচন করে দুই হাজার বছরের বেশি পুরনো বিস্ময়কর টেরাকোটা সেনাবাহিনীর ইতিহাস। গাইড জানালেন, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণ ও জাদুঘর এলাকা সম্প্রসারণের জন্য আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের অন্যত্র পুনর্বাসন করা হয়েছে, অনেকে ব্যবসার সুযোগও পেয়েছেন। তথ্যটি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারিনি; কিন্তু কথাটি ভাবিয়েছে। ঐতিহ্য রক্ষার জন্য মানুষকে সরাতে হলে তার জীবিকা ও ভবিষ্যতের দায়ও রাষ্ট্রকে নিতে হয়।
চীনের হুই ও উইঘুর মুসলমান
শিয়ানের ঐতিহাসিক গ্রেট মসজিদে নামাজ পড়েছি। পাশের মুসলিম কোয়ার্টারে চীনা স্থাপত্যের সাথে ইসলামী সংস্কৃতির অপূর্ব মেলবন্ধন দেখেছি। হুই মুসলমানরা শত শত বছর ধরে তাদের ধর্মীয় পরিচয় ধরে রেখেছেন। তবে একটি মসজিদে নামাজ পড়ার অভিজ্ঞতা দিয়ে পুরো চীনের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিচার করা যায় না। সিনজিয়াং অঞ্চলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। সেখানকার উইঘুর মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে উদ্বেগ রয়েছে; সেটিও উপেক্ষার সুযোগ নেই।
সাংহাই : নদীর দুই তীরে দুই যুগ
হুয়াংহু নদীর এক তীরে দ্য বান্ডের শতবর্ষী ইউরোপীয় স্থাপত্য, অন্য তীরে পুডংয়ের আকাশচুম্বী ভবন। রাতের ক্রুজে আলোকিত সাংহাই দেখে মুগ্ধ হয়েছি। কিন্তু প্রশ্নও জেগেছে, একটি দেশ এত দ্রুত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে কিভাবে, আর আমাদের অনেক ছোট প্রকল্পও বছরের পর বছর ঝুলে থাকে কেন? সাংহাই ও শিয়ানে সড়ক, উদ্যান ও দর্শনীয় স্থানে কর্মীদের নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করতে দেখেছি। উন্নয়ন শুধু নতুন কিছু নির্মাণ নয়; যা নির্মিত হয়েছে, তা সচল ও ব্যবহারযোগ্য রাখাও উন্নয়ন।
চীনের অগ্রগতির ভিত্তি
১৯৭৮ সালে দেং শিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু হয়। কৃষি সংস্কার, বিদেশী বিনিয়োগ, রফতানিমুখী শিল্প, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ চীনকে বদলে দিয়েছে। করোনা মহামারীর সময় অল্প দিনে জরুরি হাসপাতাল নির্মাণ দেখিয়েছিল সমন্বয়, জনবল ও দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা।
কেন্দ্রীভূত ক্ষমতায় দ্রুত সিদ্ধান্ত হতে পারে; কিন্তু ভিন্নমত ও প্রশ্নের সুযোগ সঙ্কুচিত হলে ভুল সংশোধনও কঠিন হয়। দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানে কর্তৃত্ববাদী আমলে শিল্পায়নের ভিত তৈরি হয়েছিল; গণতন্ত্রে উত্তরণের পরও অগ্রগতি থামেনি। অর্থাৎ দক্ষ প্রশাসন ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহি পাশাপাশি চলতে পারে। চীনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন থেকে শিখব, তার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অনুসরণ করব না। উন্নয়নের সাথে স্বাধীনতা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারও চাই।
আমরা কোথায় আটকে আছি
চীন সফর শেষে মনে হয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্কট শুধু অর্থের নয়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির দুর্বলতা। সৎ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব দরকার। কিন্তু ভালো নেতা কবে পাওয়া যাবে সেই অপেক্ষায় রাষ্ট্র চলতে পারে না। প্রতিষ্ঠান এমন হতে হবে যেন নেতা বদলালেও রাষ্ট্র নিজের নিয়মে চলে।
ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আড়ালে পড়ে যায়। বড় দলগুলোর ভেতরে পরিবারতন্ত্র, ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, তোষামোদ ও মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ যোগ্য নেতৃত্বের বিকাশে বাধা দেয়। অনেকের কাছে রাজনীতি জনসেবা নয়, হয়ে উঠেছে বাণিজ্য। প্রশাসনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি এবং জবাবদিহির অভাবে সরকার বদলালেও অবস্থার উন্নতি হয় না।
দরকার রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংস্কার
জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের নতুন সুযোগ এসেছে। কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে মতবিরোধ মনে করিয়ে দেয়, সনদে স্বাক্ষর আর তা মেনে চলা এক নয়।
প্রথমত, বিরোধী দলকে শত্রু নয়, সংসদীয় ব্যবস্থার অংশ ভাবতে হবে। দ্বিতীয়ত, রেল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনের মতো অগ্রাধিকারে দলমত নির্বিশেষে ন্যূনতম ঐকমত্য দরকার। তৃতীয়ত, দলীয় নেতৃত্ব ও মনোনয়নে যোগ্যতা, জনসমর্থন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, ইশতেহার ও সংস্কারের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। পঞ্চমত, পুলিশ, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থাকে দলীয় হাতিয়ার বানানো চলবে না।
পরিবর্তন শুরু হবে কোথা থেকে
শুরুটা হতে হবে শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে। জানতে হবে, কোথায় কাজ আটকে থাকে, কেন দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। পাসপোর্ট বা ভূমি অফিসে প্রতিটি সেবার নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দেয়া, কাজ আটকে গেলে ডিজিটাল রেকর্ড এবং মাসিক প্রকাশ্য মূল্যায়ন চালু করা যায়। ব্যবস্থা এমন হতে হবে, যেখানে উপরমহলের হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিয়মমাফিক কাজ সম্পন্ন হবে।
জাতির অগ্রগতি শুধু সম্পদে নয়, পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা ও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতায়। বাংলাদেশের মানুষের মেধা ও পরিশ্রমের অভাব নেই। অভাব এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতির, যেখানে যোগ্যতা মূল্য পায় এবং প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির ঊর্ধ্বে থাকে। আমরা ক্ষমতা নিয়ে যতটা ব্যস্ত থাকি, রাষ্ট্র কিভাবে চলবে, তা নিয়ে ততটা ভাবি না। অথচ কে দেশ চালাবেন, তা দিয়ে ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে না। হবে রাষ্ট্রব্যবস্থা আমরা কতটা বদলাতে পারলাম তা দিয়ে।
লেখক : রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








