
(দ্বিতীয় পর্ব)
ন্যায়পাল : বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে যে, ‘১. সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালের পদ-প্রতিষ্ঠায় বিধান করিতে পারিবেন। ২. সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালকে কোনো মন্ত্রণালয়, সরকারি কর্মচারী বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের যেকোনো কার্য সম্পর্কে তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাসহ যেরূপ ক্ষমতা কিংবা যেরূপ দায়িত্ব প্রদান করিবেন, ন্যায়পাল সেইরূপ ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করিবেন। ৩. ন্যায়পাল তাহার দায়িত্ব পালন সম্পর্কে বাৎসরিক রিপোর্ট প্রণয়ন করিবেন এবং অনুরূপ রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপিত হইবে।’ সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদের সুপারিশের ভিত্তিতে ন্যায়পাল পদে কাউকে নিয়োগ দেবেন।
মওদুদ আহমদ (১৯৮৭) মনে করেন, ‘সংসদীয় প্রাধান্য অব্যাহত রেখে এবং বেসামরিক আমলাতন্ত্রের যেকোনো কার্যপদ্ধতি পর্যালোচনা করার জন্য সংসদীয় আইন দ্বারা ন্যায়পালের পদ সৃষ্টির বিধান করা হয়েছিল। যদিও এ উপমহাদেশের কোনো দেশের সংবিধানে এ ধরনের ন্যায়পালের অস্তিত্ব নেই এবং পৃথিবীর খুব কমসংখ্যক দেশে এর অবস্থিতি পরিদৃষ্ট হয়, তথাপি ব্যতিক্রমধর্মী এই পদ সৃষ্টির উদ্যোগে দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠনসমূহ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় আওয়ামী লীগের সদিচ্ছাই প্রতিফলিত করেছিল।’ উল্লেখ করা যেতে পারে, সুইডেন ১৮০৯, নিউজিল্যান্ড ১৯৬২, ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১৩ সালে ন্যায়পাল পদ সৃষ্টি করে।
মজার বিষয় হলো— শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে দেশের সংবিধান প্রণয়ন ও গণপরিষদে তার অনুমোদন হলেও সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদ কার্যকর করার জন্য তার শাসনামলে কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়নি। এতে ন্যায়পালের পদ সৃষ্টির বিষয়টি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে আওয়ামী লীগ সরকার যে ‘সদিচ্ছার’ পরিচয় দিয়েছিল তার বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের আন্তরিকতার কোনো বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি। অবশ্য যে দলটি গণতন্ত্রকে পদদলিত করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিল, তার কাছে ন্যায়পালের পদ সৃষ্টির আশা করা বাতুলতা মাত্র। শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সাল ও পরবর্তীতে বারবার ক্ষমতায় এসে কখনো ন্যায়পাল নিয়োগের আইন বাস্তবায়নের কথা একবারও উচ্চারণ করেননি। তবে তার নেতৃত্বে সংবিধানের বহু ব্যবচ্ছেদ হলেও ন্যায়পালের পদ বাতিলের কোনো উদ্যোগও নেয়া হয়নি। সেটিই বা কম কিসে?
লক্ষণীয় যে, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একজন সেনানায়ক হওয়া সত্ত্বেও বাকশাল বাতিল করে একদিকে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন; অপরদিকে, ১৯৮০ সালে সংসদে ন্যায়পাল আইন পাস করা হয়। তবে সেটি তখন সরকারি প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হয়নি। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ সালের ৬ জানুয়ারি এক প্রজ্ঞাপন জারি করে আইনটি কার্যকর করা হয়। তবে অজ্ঞাত কারণে চারদলীয় জোট সরকারের আমলেও ন্যায়পাল নিয়োগ করা হয়নি।
অধিকাংশ দেশে ন্যায়পালের পদ না থাকলেও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এরূপ একটি সাংবিধানিক পদের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো যেসব দেশে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ দুর্বল এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়, সেখানে এরূপ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার কাজটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এখন প্রশ্ন হলো— যদি পদটির প্রয়োজনীয়তা থাকে এবং সেটি জবাবদিহির স্বার্থে প্রয়োজন, তা হলে অতীতের সরকারগুলো বিগত ৫৪ বছরে তা বাস্তবায়নে কেন আগ্রহ দেখায়নি? এটি একটি জটিল প্রশ্ন। যারা অতীতে সরকারে ছিলেন তাদের কারো মুখ থেকে এ বিষয়ে এ পর্যন্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাহলে বিষয়টি কি রহস্যজনক মনে হচ্ছে না?
সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে ‘সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালের পদ-প্রতিষ্ঠার জন্য বিধান করিতে পারিবেন’— বলে যে ভাষ্য আছে, তাতে আইন প্রণয়নের কাজটি বাধ্যতামূলক করা হয়নি। তবে ১৯৮০ সালের সংশ্লিষ্ট আইনটিতে ন্যায়পাল নিয়োগকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও ২০০২ সালে আইনটির কার্যকারিতা দেয়া হলেও জোট সরকার তা পরবর্তী তিন বছরেও বাস্তবায়ন করেনি। এরপর ২০২৪ সাল পর্যন্ত তো দেশের শাসনব্যবস্থা এমন ছিল যে, জনগণকে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করতে হয়েছে; ন্যায়পালের পদ নিয়ে ভাবনার অবকাশ তখন কারোর ছিল না।
চব্বিশের বিপ্লবের পরে জনগণের মধ্যে রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কারে প্রত্যাশার যে ঢেউ সৃষ্টি হয় তার পরিপ্রেক্ষিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মেলবন্ধনের উদ্যোগ নেয়। ঐকমত্য কমিশন বিভিন্ন সংস্কারের মধ্যে ন্যায়পাল পদটি নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার সাথে নিয়োগের জন্য প্রস্তাব করে। এতে বলা হয় যে—
‘ক. সংবিধানের বর্তমান অনুচ্ছেদ ৭৭ সংশোধনপূর্বক ৭৭ (ক)-তে যুক্ত করা হবে যে, এই সংবিধানের অধীনে দেশে একজন ন্যায়পাল থাকিবেন।’
খ. সংবিধানের বিধানাবলিসাপেক্ষে— ১. জাতীয় সংসদের স্পিকার (যিনি এই বাছাই কমিটির প্রধান হবেন); ২. ডেপুটি স্পিকার (যিনি বিরোধী দল হইতে নির্বাচিত হবেন); ৩. সংসদ নেতা; ৪. বিরোধী দলের নেতা; ৫. দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি; ৬. রাষ্ট্রপতির একজন প্রতিনিধি (নির্দলীয় ব্যক্তি এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন) এবং ৭. প্রধান বিচারপতির প্রতিনিধি হিসেবে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির সমন্বয়ে একটি বাছাই কমিটি গঠিত হবে। এ কমিটি ন্যায়পাল পদে নিয়োগ লাভের উপযুক্ত (সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইনের দ্বারা যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নির্ধারিত হবে) এবং এ পদে নিয়োগ লাভে আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছ থেকে আইন দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে ‘ইচ্ছাপত্র’ অথবা তথ্য আহ্বান করাসহ উপযুক্ত প্রার্থীর অনুসন্ধানকার্যক্রম পরিচালনা করবে।
গ. অনুসন্ধানে প্রাপ্ত জীবনবৃত্তান্তসমূহ যাচাই-বাছাই করত উক্ত বাছাই কমিটি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বাছাইকৃতদের মধ্য থেকে একজনকে ন্যায়পাল পদে নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত করবে; অতঃপর রাষ্ট্রপতি তাকে কার্যভার গ্রহণের তারিখ থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ দান করবেন।’
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উল্লিখিত প্রস্তাবের প্রতি জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ মোট ২৫টি রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করে। অপরদিকে, বিএনপিসহ (১২ দলীয় জোট, আমজনতার দল, এনডিএম ও জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, এলডিপি) সাতটি দল ভিন্নমত পোষণ করে আইনি প্রক্রিয়ায় ন্যায়পাল নিয়োগের পক্ষে মত দেয়। উল্লেখ্য যে, কোনো দল ন্যায়পাল নিয়োগের বিপক্ষে মত দেয়নি; শুধু নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে ভিন্নমত দিয়েছে। এক্ষেত্রে ঐকমত্য কমিশন এক নোটে বলেছে, ‘অবশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেøখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তাহলে সেমতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।’ অপরদিকে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫-এর পঞ্চম অনুচ্ছেদে গণভোটের ব্যালটে উপস্থাপনীয় প্রশ্ন সম্পর্কে বলা হয়, ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এবং ইহার তফসিল-১-এ বর্ণিত সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’ স্মরণযোগ্য, তফসিল-১-এ অন্যান্যের মধ্যে ন্যায়পাল নিয়োগের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত আছে। তবে গণভোটে প্রশ্নটি একটু ভিন্নভাবে পেশ করা হয় যা ছিল নিম্নরূপ :
‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’ : (ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।’ বলা নিষ্প্রয়োজন, এতে অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কথা বলার মধ্যে ন্যায়পাল পদটিও আছে।
এবারে দেখা যাক, ক্ষমতাসীন বিএনপি নির্বাচনের আগে নির্বাচনী ইশতেহারে কী বলেছিল? তাদের ইশতেহারে সাংবিধানিক সংস্কার অংশের ১ ক্রমিকে বলা হয়েছে— ‘সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিগত ১৭ অক্টোবর ২০২৫ জুলাই জাতীয় সনদে যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সেমতে বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।’ এছাড়া ইশতেহারে সাংবিধানিক সংস্কার অংশের ৩১ ক্রমিকে মাত্র চারটি শব্দ বলা হয়েছে : ‘ন্যায়পাল নিয়োগ করা হবে’। লক্ষণীয় যে, বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সরাসরি অঙ্গীকার না করে ভাষার কৌশল খাটিয়ে বস্তুত বিষয়টি গৌণ করে দিয়েছে। তবে একদিকে গণভোটে জনগণ অন্যান্যের মধ্যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি জুলাই সনদের আলোকে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে এবং অপরদিকে, বিএনপি তাদের ইশতেহারেও ন্যায়পাল নিয়োগের অঙ্গীকার করেছে। সুতরাং যেকোনো পদ্ধতিতে হোক না কেন, ন্যায়পাল নিয়োগের প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। সরকার এ ব্যাপারে কী করে তা দেখতে হয়তো আরো চার বছর অপেক্ষা করা লাগতে পারে।
এদিকে, ন্যায়পাল নিয়োগের বিষয়ে সংবিধানের ভাষ্য এবং ১৯৮০ সালের ন্যায়পাল আইন সরকারকে ন্যায়পাল নিয়োগ বাধ্যতামূলক করলেও কোনো সরকার উদ্যোগ গ্রহণ না করার বিরুদ্ধে অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান কর্তৃক এক রিট পিটিশন দাখিলের পরিপ্রেক্ষিতে ২১ মে ২০২৬ হাইকোর্ট এক রুল জারি করেন। রুলে সরকারের কাছে জানতে চাওয়া হয়, সংবিধাননের ৭৭ অনুচ্ছেদ ও ১৯৮০ সালে আইন থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার কেন ন্যায়পাল পদে নিয়োগ দিচ্ছে না।
সরকারি কর্মকমিশন
সরকারি কর্মকমিশন যা ইংরেজি পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) নামে বেশি পরিচিত, একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এর কাজ হচ্ছে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ দানে উপযুক্ত ব্যক্তিদের মনোনয়নের উদ্দেশ্যে যাচাই ও পরীক্ষা পরিচালনা এবং রাষ্ট্রপতিকে সংবিধানের আলোকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উপদেশ দান করা। উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালের সংবিধানে দু’টি পিএসসি গঠনের বিধান ছিল। একটি ছিল গেজেটেড কর্মকর্তাদের জন্য এবং আরেকটি নন-গেজেটেড কর্মচারীদের জন্য। পরবর্তীতে তা সংশোধন করে একটি পিএসসি করা হয়। বিগত ৫৪ বছরে পিএসসি যেমন নিরপেক্ষতা ও দক্ষতার সাথে বেশ কয়েকটি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবী কর্মকর্তা বাছাইয়ের সুনাম অর্জন করেছে; তেমনি কয়েকটি কমিশন নিরপেক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থও হয়েছে। আবার আওয়ামী লীগ সরকার সরকারি পদগুলো কিছু শ্রেণীর জন্য কোটা হিসেবে সংরক্ষণের মাধ্যমে বিরাট বৈষম্য তৈরি করেছিল, যা চব্বিশের আন্দোলনের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও পদায়নে অতিমাত্রায় দলীয়করণের অভিযোগ কোনো সরকারের পিছু ছাড়ছে না। এরূপ অবস্থায় পিএসসির চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ এবং তাদের স্বাধীন ও নিরপেক্ষতার সাথে কাজ করার জন্য বিদ্যমান সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হয়ে আসার আইনগত সংস্কার ছিল জুলাই বিপ্লবের অন্যতম একটি প্রত্যাশা।
প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অন্যান্যের সাথে যে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে, ওই কমিশন তার প্রতিবেদনে বিসিএস পরীক্ষার পদ্ধতি ও পিএসসি সংস্কারে বেশ কিছু সুপারিশ করে। এর মধ্যে কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো :
ক. বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) আওতায় একীভূত ‘ক্যাডার’ সার্ভিস বাতিল করে তার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট সার্ভিসের কাজের ধরন ও বিশেষায়িত দক্ষতার বিষয়টি সামনে রেখে আলাদা আলাদা নামকরণ করা যেতে পারে। বিদ্যমান বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারকে মাত্র ১২টি প্রধান সার্ভিসে বিভক্ত করা যেতে পারে।
খ. সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রজাতন্ত্রের কর্মে জনবল নিয়োগে তিনটি পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন করার সুপারিশ করা হলো। কমিশনগুলো হবে : ১. পাবলিক সার্ভিস কমিশন (সাধারণ); ২. পাবলিক সার্ভিস কমিশন (শিক্ষা); এবং ৩. পাবলিক সার্ভিস কমিশন (স্বাস্থ্য)।
গ. জনপ্রশাসনে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা/আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগকার্যক্রম সম্পন্ন করতে একটি নির্দিষ্ট সময়রেখা প্রতিষ্ঠা করা উচিত, বিশেষ করে বর্তমান বিসিএস নিয়োগ প্রক্রিয়াটি অত্যধিক দীর্ঘ বিধায় নিয়োগ থেকে যোগদান পর্যন্ত প্রক্রিয়াটিকে সহজতর করা প্রয়োজন। বিসিএস পরীক্ষা এক বছরের মধ্যে শেষ করতে হবে। পরীক্ষার প্রক্রিয়াটি একটি ব্যাপক লিখিত পরীক্ষায় পরিবর্তন করা যেতে পারে। পিএসসির পরীক্ষায় একটি বার্ষিক ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা যেতে পারে।
ঘ. সব সার্ভিস থেকে মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে সচিবালয়ের উপসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত পদগুলো নিয়ে একটি ‘সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিস’ (এসইএস) গঠন করা যেতে পারে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এসব সুপারিশ বিবেচনা বা বাস্তবায়নের কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। তবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিএসসিকে সংস্কারে বিশেষ করে এর চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগপ্রক্রিয়াকে আরো নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ করতে যে সুপারিশ করে তা নিম্নরূপ :
“সংবিধানের ১৩৭ অনুচ্ছেদ সংশোধন/বিলুপ্তিপূর্বক যুক্ত করা হবে যে :
ক. সংবিধানের অধীনে তিনটি সরকারি কর্মকমিশন প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং প্রত্যেক কমিশন একজন চেয়ারম্যান/সভাপতি ও সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত হবে।
খ. ১. জাতীয় সংসদের স্পিকার (যিনি এই বাছাই কমিটির প্রধান হবেন), ২. ডেপুটি স্পিকার (যিনি বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হবেন), ৩. জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ, ৪. বিরোধী দলের প্রধান হুইপ, ৫. দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি, ৬. প্রযোজ্য ক্ষেত্রে, জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়/স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং ৭. জাতীয় সংসদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির সমন্বয়ে গঠিত একটি বাছাই কমিটি সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সদস্যদের নিয়োগ করার উদ্দেশ্যে বিদায়ী সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সদস্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন পূর্বে আইনের দ্বারা নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন আগ্রহী ব্যক্তিবর্গের নিকট হতে আইনের দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে ‘ইচ্ছাপত্র’ ও ‘জীবনবৃত্তান্ত’ আহ্বান করাসহ উপযুক্ত প্রার্থীর অনুসন্ধানকার্যক্রম পরিচালনা করবে।
গ. অনুসন্ধানে প্রাপ্ত ব্যক্তিগণের ‘জীবনবৃত্তান্ত’ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করত উক্ত বাছাই কমিটি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে বাছাই করে তাদের মধ্য হতে একজনকে চেয়ারম্যান এবং অনধিক সাতজনকে সদস্য হিসেবে নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে প্রেরণ করবে এবং রাষ্ট্রপতি তাদের কার্যভার গ্রহণের তারিখ থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ দান করবেন।
ঘ. বিদায়ী সরকারি কর্মকমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবিলম্বে নতুন সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ কার্যভার গ্রহণ করবেন।
ঙ. সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণের যোগ্যতা-অযোগ্যতা, বয়সসীমা, কর্মের শর্তাবলি ও কর্মপরিধি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা, পদত্যাগ ও পুনঃনিয়োগ লাভের সুযোগ/অধিকার ইত্যাদি সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে।
চ. সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হতে পারেন, সেইরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত সরকারি কর্মকমিশনসমূহের কোনো সভাপতি বা অন্য কোনো সদস্য অপসারিত হবেন না।
ছ. ‘সরকারি কর্মকমিশন উহার দায়িত্ব/কর্ম পালনের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন করিতে পারিবে’ বাক্যসমূহ, শব্দসমূহ ও চিহ্নসমূহ প্রতিস্থাপিত হবে’।
উল্লেখ্য, গণভোটের প্রশ্নে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পাবলিক সার্ভিস কমিশন সংস্কারের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। অপরদিকে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে এ বিষয়ে বলা হয়, পিএসসি গঠনে আইন প্রণয়ন করা হবে এবং পিএসসিকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য সাধারণ সেক্টরে নিয়োগের জন্য যথোপযুক্ত শক্তিশালী কাঠামোতে রূপান্তর করা হবে। ন্যায়পাল নিয়োগের বিষয়ে বিএনপি তাদের মেনিফেস্টোতে যে অস্পষ্টতার কৌশল নিয়েছে, পিএসসি সংস্কারের বিষয়েও একই অস্পষ্টতার কৌশল নিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। বস্তুত জনপ্রশাসন ও পাবলিক সার্ভিস কমিশন সংস্কারে বর্তমান সরকার কী উদ্যোগ নিচ্ছেন তা এখনো পরিষ্কার নয়।
লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব
ayubmiah@gmail.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








