ড. আবদুল লতিফ মাসুম
ড. আবদুল লতিফ মাসুম। নয়া দিগন্ত

রাষ্ট্রচিন্তায় রাষ্ট্রের উৎপত্তি নিয়ে মতভেদ যত, তার উদ্দেশ্য নিয়ে মতভেদ তার চেয়ে কম। টমাস হবস ও জন লক সামাজিক চুক্তি (Social Contract) তত্ত্বের দুই ভিন্ন ধারার প্রতিনিধি হলেও একটি জায়গায় তাদের অবস্থান কাছাকাছি : মানুষ নিজের স্বাধীনতার একটি অংশ রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয় প্রাণ ও সম্পদের নিরাপত্তার বিনিময়ে। হবসের বিচারে এই নিরাপত্তা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রথম শর্ত। লকের বিচারে জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করতে পারাই সরকারের বৈধতার ভিত্তি। এই দৃষ্টিতে নাগরিকের প্রাণরক্ষা রাষ্ট্রের অনেক দায়িত্বের একটি নয়; রাষ্ট্র থাকার যুক্তিটাই তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই কোনো সমাজে যখন নিয়মিত ব্যবধানে মানুষ এমন কারণে মারা যায়, যা নিয়ন্ত্রণ করা রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব, তখন প্রশ্নটি আর শুধু পরিবহনের থাকে না; তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের কার্যকারিতার প্রশ্ন।
গত ২০ অক্টোবর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নাটোরের বড়াইগ্রামের বনপাড়ায় নাটোর-পাবনা মহাসড়কে একটি যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দুই ডজনের বেশি মানুষ। নিহতদের মধ্যে একটি শিশু আছে; আছেন ব্যবসার কাজে রাজশাহী যাওয়া শরীয়তপুরের পাঁচজন ব্যবসায়ী। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, বাসটি মহাসড়কে অন্য একটি যানকে বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রাকের মুখে পড়ে। কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় বাসটি চালাচ্ছিলেন প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজার; নিয়মিত চালক ঘুমিয়ে ছিলেন পেছনের আসনে। এসব তথ্য তদন্তে যাচাই হবে। জেলা প্রশাসন সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে। তদন্তের ফল আসার আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সঙ্গত নয়; কিন্তু ঘটনার পটভূমি নিয়ে আলোচনার জন্য সেই ফলের অপেক্ষা জরুরি নয়।
ঘটনা এই একটিই নয়, প্রথমও নয়। ২০১৪ সালে এই বড়াইগ্রামেই আরেকটি দুর্ঘটনায় ত্রিশের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। এক এলাকার, এমনকি এক সড়কের ইতিহাসেই যখন একই ধরনের ঘটনা ফিরে আসে, তখন ব্যাখ্যার স্তরটি বদলাতে হয়। একটি ঘটনার কারণ হিসেবে চালকের অসতর্কতা বা বেপরোয়া গতিকে চিহ্নিত করা যায়; কিন্তু বছরের পর বছর একই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে তাকে আর কেবল ব্যক্তির ভুল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় তখন তা দুর্ঘটনা (accident) থেকে একটি কাঠামোগত ফলাফলের (structural outcome) দিকে সরে যায়, অর্থাৎ ব্যবস্থাটি এমনভাবে সাজানো যে, ঝুঁকি তার ভেতরেই তৈরি হচ্ছে।
এ ধরনের খবর এখন আমাদের কাছে প্রায় নিয়মিত। সংখ্যা বদলায়, স্থান ও তারিখ বদলায়; প্রতিবেদনের কাঠামো ও প্রতিক্রিয়ার ভাষা প্রায় একই থাকে। এই পুনরাবৃত্তির একটি পরোক্ষ ফল আছে। কোনো ক্ষতি যখন বারবার ঘটে এবং সমাজ তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করে নেয়, তখন নীতিনির্ধারকদের ওপর সংস্কারের চাপও কমে আসে। জনমত যখন প্রতিটি ঘটনাকে আলাদা করে দেখে এবং ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতাকে একটি নীতিগত প্রশ্ন হিসেবে তোলে না, তখন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পরিবর্তনের কোনো জরুরি তাড়না থাকে না। এ কারণে ঘটনার সংখ্যাগত হিসাবের পাশাপাশি তার ধরন ও পুনরাবৃত্তির কারণ নিয়ে আলোচনা জরুরি।
স্যামুয়েল হান্টিংটন Political Order in Changing Societies গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন, পরিবর্তনশীল সমাজে সামাজিক সচলতা (social mobilization) যে গতিতে বাড়ে, প্রতিষ্ঠানের বিকাশ (institutionalization) সাধারণত সেই গতিতে ঘটে না; এই ব্যবধান থেকেই অস্থিরতার সূচনা হয়। 
তার বিশ্লেষণের কেন্দ্রে ছিল রাজনৈতিক শৃঙ্খলা, তবে যুক্তির কাঠামোটি সড়কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশে যানবাহনের সংখ্যা, মানুষের যাতায়াতের চাহিদা এবং মহাসড়কের ওপর চাপ দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, যানের ফিটনেস, রুট ব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন মালিকানার জবাবদিহির কাঠামো সেই অনুপাতে বিকশিত হয়েছে কি না, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। মহাসড়কে গতি আছে; কিন্তু সেই গতি নিয়ন্ত্রণ করার প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য সেই তুলনায় পিছিয়ে।
ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা State-Building গ্রন্থে রাষ্ট্রের পরিধি (scope of the state) এবং রাষ্ট্রীয় সামর্থ্যকে (state capacity) আলাদা করে দেখেছেন। রাষ্ট্র কত কিছু করতে চায় এবং যা করতে চায় তা কার্যকরভাবে করতে পারে কি না, এ দু’টি এক বিষয় নয়। আমাদের সড়ক পরিবহন আইন আছে, মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশ আছে, বিআরটিএ আছে। তবু ওভারটেকিং, অতিরিক্ত গতি, অদক্ষ চালক ও ফিটনেসহীন যানের অভিযোগ বারবার ফিরে আসে। এতে বোঝা যায়, ঘাটতি সম্ভবত আইনের অভাবে নয়, আইন প্রয়োগের সামর্থ্য ও ধারাবাহিকতায়। সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে, লক্ষ্য সড়কে মৃত্যুর হার অর্ধেকে নামিয়ে আনা। নতুন আইন বিদ্যমান বিধানগুলোকে একটি কাঠামোয় আনতে পারে, সেটি ইতিবাচক। তবে প্রয়োগের সক্ষমতা না বাড়লে আইনের সংখ্যা বাড়ানো সমস্যার সমাধান হয় না।
সড়কের এই চিত্রে আরেকটি বিষয় লক্ষ করার মতো। সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশে দুর্ঘটনার ৪০ শতাংশের বেশি ঘটছে আঞ্চলিক সড়কে, যেখানে মহাসড়কের মতো টহল ও তদারকি নেই। মহাসড়কে কড়াকড়ির মুখে পড়া ধীরগতির যান আঞ্চলিক সড়কে ঢুকে পড়ছে; ফলে ঝুঁকি কমছে না, স্থান বদলাচ্ছে। এটি রাষ্ট্রীয় মনোযোগ ও সম্পদ বণ্টনের একটি সাধারণ প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করে : যা বেশি দৃশ্যমান, তার ওপর নজর বেশি; যা তুলনামূলক আড়ালে, তা অরক্ষিত। এর সাথে যুক্ত হয় প্রণোদনার (incentive) প্রশ্ন। পরিবহন খাতে চালকের আয় ও মালিকের মুনাফা যেখানে ট্রিপের সংখ্যা ও সময়ের ওপর নির্ভর করে, সেখানে গতি একটি অর্থনৈতিক সুবিধা হয়ে দাঁড়ায়, আর ওভারটেকিং হয়ে ওঠে সেই সুবিধা নেয়ার উপায়। প্রতিবেদনের তথ্য সঠিক হলে, সুপারভাইজারের বাস চালানোর বিষয়টিও প্রতিষ্ঠানের ভেতরের জবাবদিহির দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
জেমস ম্যাডিসন ফেডারেলিস্ট পেপার্সে লিখেছিলেন, মানুষ যদি দেবদূত হতো তবে সরকারের প্রয়োজন হতো না; আবার দেবদূতরা সরকার চালালে বাইরের বা ভেতরের কোনো নিয়ন্ত্রণেরও দরকার পড়ত না। বাস্তবে সরকার চলে সাধারণ মানুষের হাতে, তাই তাকে প্রথমে শাসিতদের নিয়ন্ত্রণ করার সামর্থ্য দিতে হয়, তারপর নিজেকেও নিয়ন্ত্রণে রাখার বাধ্যবাধকতা দিতে হয়। সড়ক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কথাটির অর্থ সরল। চালক ও মালিকের ওপর যেমন নিয়মের প্রয়োগ থাকবে, তেমনি লাইসেন্স, ফিটনেস ও তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের কাজও জবাবদিহির আওতায় থাকবে। একপক্ষের ওপর কড়াকড়ি আর অন্যপক্ষের ওপর শৈথিল্য, এই অসমতা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে।
প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়, এটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, প্রতিবেদনের সুপারিশের পরিণতি কী হয় এবং দায় কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। জবাবদিহি (accountability) যদি কেবল চালককে ঘিরে আবর্তিত হয়, তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা ফলহীন থাকে, কারণ চালক হয় নিজেই নিহত হন, নয়তো পালিয়ে যান। এই ঘটনায় বাসটি যিনি চালাচ্ছিলেন বলে বলা হচ্ছে, তিনি নিজেও নিহতদের একজন। এ অবস্থায় যানের ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিট যারা দেন, পরিবহন প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং মহাসড়ক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ, এদের ভূমিকা আলোচনার বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তদন্তের ফল প্রকাশ করা এবং তার ভিত্তিতে কাঠামোগত পদক্ষেপ নেয়া, জবাবদিহির আসল পরীক্ষা এখানেই।
ইবনে খালদুন মুকাদ্দিমায় রাষ্ট্র ও সভ্যতার (umran) উত্থান-পতনের যে চক্র আলোচনা করেছেন, সেখানে ন্যায় ও শৃঙ্খলা রাষ্ট্রের স্থায়িত্বের প্রধান ভিত্তি। তার পর্যবেক্ষণে শাসন যখন মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, তখন সমাজে আস্থা ও উদ্যম ক্ষয় হয়, আর সেই ক্ষয় ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল করে। তার সময় ও আমাদের সময়ের প্রেক্ষাপট আলাদা; কিন্তু মূল যুক্তিটি আজও অর্থবহ। মানুষ রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা করে, নিয়ম মেনে চললে সে নিরাপদ থাকবে। যে যাত্রী টিকিট কেটে বাসে ওঠে, সে নিয়মের ওপর আস্থা রেখেই ওঠে। সেই আস্থা বারবার আঘাত পেলে ক্ষতি কেবল প্রাণহানির সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে না; রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার অলিখিত চুক্তিতেও ফাটল ধরে।
সংস্কারের প্রশ্নে বিবেচনায় আসতে পারে এমন কয়েকটি দিক আছে। প্রথমত, চালকের প্রশিক্ষণ, কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের নিয়ম এবং দূরপাল্লার বাসে বদলি চালকের ব্যবস্থার কার্যকর তদারকি। দ্বিতীয়ত, যানের ফিটনেস ও রুট পারমিট প্রদানে স্বচ্ছতা। তৃতীয়ত, পরিবহন প্রতিষ্ঠান ও মালিকের আইনি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। চতুর্থত, আঞ্চলিক সড়কে মহাসড়কের সমান মনোযোগ। এগুলো নতুন কথা নয়; নতুন হতে পারে এগুলোর ধারাবাহিক প্রয়োগ। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শুধু নজরদারি বাড়িয়ে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না, চালক, পরিবহন মালিক ও সাধারণ মানুষকেও নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। কথাটি অযৌক্তিক নয়। তবে দায়িত্বের এই ভাগাভাগিতে রাষ্ট্রের অংশটি আগে আসে, কারণ নিয়ম তৈরি ও প্রয়োগের কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের হাতে। সাময়িক অভিযানের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত রুটিন (institutional routine) দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর হয়।
রূপকথায় তেপান্তর এমন এক বিস্তীর্ণ প্রান্তর, যা পেরোতে হলে রাজপুত্রকে সাহস ও ভাগ্যের ওপর ভরসা করতে হতো। সেখানে পথ ছিল অনিশ্চিত, আর নিয়ম বলে কিছু ছিল না। আধুনিক রাষ্ট্রের একটি বড় অর্জন হলো সেই অনিশ্চয়তা কমিয়ে চলাচলকে নিয়মের অধীনে আনা। আমাদের মহাসড়ক সেই অবস্থান থেকে এখনো কিছুটা দূরে; যাত্রীকে এখানে ভাগ্যের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হয়। অথচ ভাগ্য কোনো রাষ্ট্রীয় নীতি হতে পারে না। যে দিন রাষ্ট্র সড়কপথের যাত্রাকে ভাগ্যনির্ভরতা থেকে নিয়মনির্ভরতায় নিয়ে যেতে পারবে, সে দিন তেপান্তরের উপমা আবার গল্পের পাতাতেই ফিরে যাবে। 
লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 
Mal55ju@yahoo.com

Advertisement