মতামত
মেজর (অব:) মো: আখতারুজ্জামান। নয়া দিগন্ত

একজন চিকিৎসক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা বা প্রকৌশলী মানুষের উপকার করতে পারেন; একই পেশায় থেকেও কেউ দায়িত্বে অবহেলা করতে পারেন। তাই আমার পরিকল্পনার কেন্দ্রে পেশা নয়, মানুষ গড়ার কাজ। আমি চাই, তারা আল্লাহর প্রতি অনুগত, রাসূলুল্লাহ সা:-এর শিক্ষা অনুসরণে আন্তরিক, বাংলাদেশের প্রতি দায়িত্বশীল এবং নিজের কাজে দক্ষ হোক। মুসলিম উম্মাহর সেবার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য শুরু নিজের দেশে সৎ মানুষ ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।
এ কাজের প্রথম শর্ত চরিত্র। সূরা আন-নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতে আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচারের নির্দেশ রয়েছে। আমার পরবর্তী প্রজন্মকে শেখাতে চাই, সত্য বলা, প্রতিশ্রুতি রাখা, অন্যের প্রাপ্য পরিশোধ করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার না করা আল্লাহর প্রতি আনুগত্যেরই অংশ। তারা ইবাদতে যত্নবান হবে; একই সাথে পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে মানুষের অধিকার রক্ষা করবে। তবে তাদের কাছে যে আচরণ প্রত্যাশা করি, তা নিজের জীবনেও দেখাতে হবে। বড়দের অসততা দেখে কোনো শিশু সততার মূল্য শেখে না।
বাংলাদেশ তাদের জন্মভূমি এবং দায়িত্ব পালনের প্রথম ক্ষেত্র। দেশের প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগে নয়, কাজের মানে প্রকাশ পায়। একজন শিক্ষক নিষ্ঠার সাথে পড়ালে, চিকিৎসক রোগীকে যথাযথ সেবা দিলে, উদ্যোক্তা শ্রমিকের প্রাপ্য পরিশোধ করলে কিংবা সরকারি কর্মকর্তা ঘুষ প্রত্যাখ্যান করলে দেশ উপকৃত হয়। আমি চাই, তারা বাংলাদেশের সব নাগরিকের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকারকে সম্মান করুক। নিজের দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাই তাদের বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহর জন্য কাজ করার যোগ্য করে তুলবে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের— যাকে অনেকে ‘৩৬ জুলাই’ বলেন, আত্মত্যাগ তাদের কাছে কেবল ইতিহাসের পাঠ হবে না। তারা দুই সময়ের নিজস্ব প্রেক্ষাপট জানবে এবং স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব বুঝবে। এ শিক্ষা পরের প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে দেবে। ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা যেন অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না থাকে; তা প্রকাশ পাক জনসম্পদ রক্ষা, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে।
দুর্নীতিমুক্ত জীবন শুরু হয় ছোট সিদ্ধান্ত থেকে। পরীক্ষায় নকল, পরিচয়ের জোরে অযোগ্য সুবিধা নেয়া, কাজ না করে পারিশ্রমিক নেয়া কিংবা সরকারি সম্পদ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার— এসবকে তারা চালাকি বলে গ্রহণ করবে না। পরিবারে শুধু কে কত আয় করল বা কোন পদ পেল, তা নিয়ে আলোচনা করব না; জানতে চাইব, কাজটি কিভাবে হলো এবং কারো অধিকার ক্ষুণ্ন হলো কি না। ভুল স্বীকার ও সংশোধনের সাহসও গড়ে তুলব। সততা ব্যক্তিগত গুণ হওয়ার পাশাপাশি সমাজে আস্থা সৃষ্টি এবং প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর রাখার শর্ত।
আমার শিক্ষা পরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকবে বাংলা, আরবি ও ইংরেজি। বাংলা দিয়ে তারা নিজের দেশের মানুষের কথা বুঝবে, স্পষ্টভাবে মত প্রকাশ করবে এবং বাংলাদেশের জ্ঞান ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখবে। আরবি তাদের কুরআন ও ইসলামের মূল উৎস বুঝতে এবং মুসলিম বিশ্বের বহু মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে সহায়তা করবে। মুসলিম উম্মাহ বহু ভাষার মানুষের সমষ্টি; আরবি সেই যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু। ইংরেজি তাদের বৈশ্বিক গবেষণা, প্রযুক্তি ও সহযোগিতার সাথে যুক্ত করবে। তিন ভাষাতেই মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে পড়া, লেখা, শোনা ও অর্থপূর্ণ কথোপকথনের দক্ষতা চাই।
ভাষার পাশাপাশি গণিত ও ব্যবহারিক কম্পিউটার দক্ষতা গড়তে হবে। গণিত যুক্তি, হিসাব ও তথ্য যাচাই করতে শেখায়। তারা কম্পিউটারে কাজ করা, ইন্টারনেটে নির্ভরযোগ্য তথ্য খোঁজা, ভুল তথ্য শনাক্ত করা এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা শিখবে। আগ্রহ অনুযায়ী প্রোগ্রামিং ভাষার ভিত্তিও অর্জন করবে। আমার লক্ষ্য এমন তরুণ তৈরি করা, যারা প্রযুক্তি দিয়ে বাস্তব সমস্যা সমাধান করতে পারে। পরিবারের ছেলে ও মেয়ে উভয়েই শিক্ষা ও দক্ষতা বিকাশের সুযোগ পাবে।
আত্মনির্ভর দেশ গড়ার ভিত্তি আত্মনির্ভর মানুষ ও দায়িত্বশীল পরিবার। নিজের কাজ নিজে করা, সৎ উপায়ে জীবিকার প্রস্তুতি নেয়া এবং পরিবারের দায়িত্ব ভাগ করে নেয়া তাদের শিখতে হবে। তবে আত্মনির্ভরতা স্বার্থপরতা নয়। অসুস্থ বা প্রবীণ সদস্যের পাশে দাঁড়ানো এবং মতভেদ সম্মানের সাথে মেটানোও সমান জরুরি। সূরা আন-নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতে ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনের প্রতি দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। আমি চাই, সেই শিক্ষা ঘরের আচরণে দৃশ্যমান হোক। ঐক্যবদ্ধ পরিবার মানে সবার একই মত নয়; ভিন্নমতের মধ্যেও সম্পর্ক ও দায়িত্ব বজায় রাখা।
পরিবারের বাইরেও এই দায়িত্ব বিস্তৃত। পাশের বাড়ির মানুষটির ধর্ম কী, তা তার বিপদে পাশে দাঁড়ানোর শর্ত হতে পারে না। তার নিরাপত্তা, সম্মান ও উপাসনার অধিকারকে শ্রদ্ধা করতে হবে। সূরা আল-মুমতাহিনার ৮ নম্বর আয়াতে যারা ধর্মের কারণে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না বা ঘর থেকে উৎখাত করে না, তাদের প্রতি সদয় ও ন্যায়সঙ্গত আচরণের কথা রয়েছে। আমি চাই, আমার পরবর্তী প্রজন্ম নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় থাকবে, আবার ভিন্ন ধর্মের প্রতিবেশীর সাথেও আস্থার সম্পর্ক গড়বে। মতভেদ হলে শুনবে, তথ্য যাচাই করবে এবং সম্মানজনক ভাষায় কথা বলবে।
কেউ আমাদের বা আমাদের সাথে থাকা মানুষের প্রতি অন্যায় করলে ঘৃণাকে পরবর্তী প্রজন্মের উত্তরাধিকার বানাতে চাই না। সূরা আলে-ইমরানের ১৩৪ নম্বর আয়াত ক্রোধ সংবরণ ও ক্ষমার প্রশংসা করে। সূরা আশ-শুরার ৪০ থেকে ৪৩ নম্বর আয়াত অন্যায়ের শিকার মানুষের প্রতিকার চাওয়ার অধিকার স্বীকার করার পাশাপাশি ক্ষমা ও সংশোধনের মর্যাদাও তুলে ধরে। তাই ব্যক্তিগত আঘাত ক্ষমা করার চেষ্টা করব; কিন্তু নিপীড়িত মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের দাবি ছাড়ব না। প্রতিশোধের নামে সীমা অতিক্রম না করে সত্য, ক্ষতির প্রতিকার এবং সম্ভব হলে সম্পর্ক সংশোধনের পথ খুঁজব। ক্ষমা হবে শান্তির শক্তি; জুলুমের অনুমতি নয়।
বাংলাদেশকে আত্মনির্ভর করতে খাদ্য, জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তিতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে সঙ্কটে দেশ নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আত্মনির্ভরতা বিশ্বের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার নাম নয়; স্থানীয় গবেষণা ও উৎপাদন শক্তিশালী করে সম্মানজনক সহযোগিতা গড়ার পথ। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে স্বার্থের মিল যেমন থাকবে, বিরোধও থাকবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ন্যায্য স্বার্থ রক্ষা করে সংলাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজতে হবে। সূরা আল-হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রকে পরস্পরকে জানার সুযোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এটি রাষ্ট্রনীতির নির্দেশনা নয়; মানুষের সাথে সম্মানজনক সম্পর্ক গড়ার প্রেরণা।
বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহর জন্য তাদের অবদানকে আমি বাস্তব কাজে দেখতে চাই। বাংলাদেশে শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য বা প্রযুক্তিতে কার্যকর কোনো সমাধান তৈরি হলে তা অন্যদের সাথে ভাগ করবে; অন্য দেশের সফল অভিজ্ঞতাও দেশে কাজে লাগাবে। দুর্যোগ বা বাস্তুচ্যুতির সময় বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াবে। এমন বিদ্যালয়, উদ্যোগ, গবেষণা দল বা সেবামূলক সংগঠন গড়বে, যা একজন ব্যক্তির উদ্যোগের পরও টিকে থাকতে পারে। বাংলা, আরবি ও ইংরেজির দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের প্রয়োজন এবং মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান ও সহযোগিতার মধ্যে সেতু তৈরি করবে। এসব কাজের ভিত্তি হবে বাংলাদেশে নিজেদের দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করা।
তাদের কেউ নেতৃত্বের সুযোগ পেলে ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সুবিধা নয়, সেবার দায়িত্ব হিসেবে দেখুক।
সূরা আল-হাজ্জের ৪১ নম্বর আয়াতে ক্ষমতা পেলে সালাত কায়েম, জাকাত প্রদান, সৎ কাজে উৎসাহ এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখার কথা রয়েছে। নেতৃত্বে তারা অন্যের কথা শুনবে, ন্যায্য সিদ্ধান্ত নেবে, দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষা করবে এবং ভুল করলে স্বীকার করবে। সৎ কাজের আহ্বান জানাবে নিজের আচরণ দিয়ে, অপমান বা জবরদস্তি দিয়ে নয়। শান্তির জন্য কাজ করবে, শান্তিপূর্ণ পথ বেছে নেবে এবং নিজের আচরণেও শান্তি বজায় রাখবে।
এই পরিকল্পনাকে কাগজে রেখে দিতে চাই না। প্রথম বছরেই পরিবারে নিয়মিত পাঠ ও আলোচনার একটি সময় নির্ধারণ করব। সেখানে তিন ভাষা শেখার অগ্রগতি, কুরআনের নির্বাচিত আয়াতের শিক্ষা, দেশের কোনো বাস্তব সমস্যা এবং পরিবারের সেবামূলক কাজ নিয়ে কথা হবে। প্রত্যেকে বয়স ও সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট একটি দায়িত্ব নেবে। আশপাশের আগ্রহী কোনো শিক্ষার্থীর বই বা দক্ষতা শেখার প্রয়োজন থাকলে সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা করব। বছর শেষে দেখব, কী শিখেছি, কাকে সাহায্য করতে পেরেছি এবং কোথায় পদ্ধতি বদলানো দরকার। আমার পরিকল্পনা ২০ বছরের। এই পরিকল্পনার প্রথম পরীক্ষা এভাবেই শুরু হবে।
প্রথম পাঁচ বছর প্রত্যেকের বয়স ও সক্ষমতা বুঝে চরিত্র, ইবাদত, পাঠাভ্যাস, পারিবারিক দায়িত্ব এবং ভাষা ও গণিতের প্রয়োজনীয় ভিত্তি গড়ায় মন দেবো। পরের পাঁচ বছরে তিন ভাষায় যোগাযোগ, কম্পিউটারে বাস্তব কাজ, নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার, উচ্চশিক্ষা বা কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং স্বেচ্ছাসেবার সুযোগ বাড়াব। শেষ ১০ বছরে তারা নিজ নিজ পেশায় সৎভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি অন্তত একটি স্থায়ী সামাজিক অবদান রাখার চেষ্টা করবে। সময়সূচি তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার জন্য নয়; বয়স ও প্রস্তুতি অনুযায়ী কাজ বদলাবে। অগ্রগতি শুধু আয় বা পদ দিয়ে নয়, কথা রাখা, ভুল সংশোধন, দক্ষতা কাজে লাগানো এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা দিয়েও বিচার করব।
তাদের জীবনপথ নির্ধারণ করে দেয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার দায়িত্ব এমন ভিত্তি তৈরি করা, যার ওপর দাঁড়িয়ে তারা স্বাধীনভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তারা আত্মনির্ভর হবে, কিন্তু বিচ্ছিন্ন হবে না; পরিবারকে ঐক্যবদ্ধ রাখবে, কিন্তু অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবে না; ক্ষমা করবে, কিন্তু নিপীড়িতকে ভুলবে না; দেশের স্বার্থ রক্ষা করবে, কিন্তু প্রতিবেশীর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে না। তাদের হাতে দায়িত্ব দিলে মানুষ যেন আস্থা পায়। বাংলাদেশে মানুষের জীবন উন্নত করে, অর্জিত জ্ঞান মুসলিম উম্মাহর সাথে ভাগ করে এবং এই দায়িত্ববোধ পরের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েই তারা আমার পরিকল্পনাকে সার্থক করবে।  
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য 
rtlbddhaka@yahoo.com  

Advertisement