
পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে ‘জনগণের পুলিশ’ গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির ঐতিহাসিক প্যারেড গ্রাউন্ডে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ও ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (২০০৬ ব্যাচ)-এর ছয় মাস মেয়াদি মৌলিক প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহবান জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘পুলিশের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। সেবাপ্রত্যাশী সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সেবা দিতে পুলিশকে আরো আন্তরিক হতে হবে। সব ধরনের ভয়ভীতি ও পক্ষপাতিত্ব উপেক্ষা করে জনগণকে আইনি সেবা ও সুরক্ষা দিতে হবে। মানুষের পাশে থেকে, সেবা দিয়ে এবং জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থেই ‘জনগণের পুলিশ’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মানুষের জন্য কাজ করেই তাদের হৃদয় জয় করতে হবে।’
বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, ‘অতীতের ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভঙ্গুর পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠন করে দক্ষ, আধুনিক, মানবিক ও সেবামুখী বাহিনীতে রূপান্তর করতে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন, লোকবল বৃদ্ধি, যানবাহন কেনা, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো নির্মাণ ও লজিস্টিক সরবরাহের কাজ চলছে।’
নবীন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের প্রতীক্ষা, আইনি প্রক্রিয়া ও নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এ ব্যাচের সদস্যরা দেশসেবার মহান পেশায় যোগ দিয়েছেন। নিজেদের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে কোনো ধরনের বৈষম্য ও অন্যায়ের চর্চা না করার নির্দেশ দেন তিনি। পুলিশের পোশাক ও অর্পিত দায়িত্বকে সাধারণ চাকরির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে জনগণের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মহান অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণের আহবান জানান।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রচলিত অপরাধের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, অনলাইন জালিয়াতি, আর্থিক প্রতারণা, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, মানব পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলা পুলিশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব জটিল অপরাধ দমনে প্রচলিত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক তদন্ত, তথ্য বিশ্লেষণ ও ডিজিটাল ফরেনসিকের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।’
তিনি আরো বলেন, ‘আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্ব্যবহার, পক্ষপাতিত্ব ও পেশিশক্তির পরিবর্তে পেশাদারিত্ব, দক্ষতা এবং মানবিক পুলিশিং চর্চা করতে হবে। সংবিধান ও প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া এবং নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষার আহবান জানান তিনি।’
নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষা মিশনসহ পুলিশের বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিটে কাজের অবারিত সুযোগ রয়েছে। তবে কর্তব্যে অবহেলা, নৈতিকতাবিরোধী কাজ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধানও বলবৎ থাকবে।’
পরিশেষে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে নবীন কর্মকর্তাদের সফল পেশাগত জীবন এবং দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একযোগে কাজ করার আহবান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো: আলী হোসেন ফকির, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল মো: মাইনুল হাসান বিপিএম, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো: রেজাউল আলম সরকার এবং রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো: আশিক সাঈদ।
এছাড়া সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আমন্ত্রিত অতিথি, শিক্ষানবিশ প্রশিক্ষণার্থীদের অভিভাবক এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যারেড পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করেন। পরে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট এবং ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (২০০৬ ব্যাচ) থেকে বিভিন্ন বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। এএসপি প্রবেশনার মো: মাহবুব হোসেন প্যারেড কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন।
উল্লেখ্য, এবারের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ব্যাচ থেকে বেস্ট সার্জেন্ট হিসেবে মোহাম্মদ ওমর ফারুক, বেস্ট একাডেমিক হিসেবে মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ হিসেবে সাইফুল ইসলাম এবং বেস্ট শ্যুটার হিসেবে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান পুরস্কার অর্জন করেন।
অন্যদিকে, ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (২০০৬ ব্যাচ) থেকে বেস্ট ক্যাডেট হিসেবে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, বেস্ট একাডেমিক হিসেবে মো: বোরহানুল ইসলাম, বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ হিসেবে দেওয়ান গোলাম রসুল এবং বেস্ট শ্যুটার হিসেবে মো: কামাল গনি পুরস্কার পান।
২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ব্যাচের ৮৪ জন এবং ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (২০০৬ ব্যাচ) ব্যাচের ১৬২ জনসহ মোট ২৪৬ জন প্রশিক্ষণার্থী এ প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে বাস্তব কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








