
সারাদেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে নতুন সার ডিলার নিয়োগে ওঠা অনিয়ম, অস্বচ্ছতা ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আমলে নিয়েছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। যেসব এলাকায় ডিলারশিপ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, সেখানে ডিলারশিপ নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার কঠোর সুপারিশ করা হয়েছে। একই সাথে যেসব ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে এবং মাঠপর্যায়ে সার্বিক সার ব্যবস্থাপনা পরিদর্শনে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ আসে। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি মো: শাহাদাত হোসেন সেলিম।
বৈঠকে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদসহ কমিটির সদস্য ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
বৈঠক সূত্র ও ব্রিফিংয়ে জানা যায়, প্রান্তিক কৃষকের দোরগোড়ায় সহজে সার পৌঁছে দিতে সারাদেশে সাড়ে চার হাজারেরও বেশি নতুন ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নেয় সরকার। তবে মাঠপর্যায়ে উপজেলা ও জেলা বাছাই কমিটির মাধ্যমে পাঠানো তালিকার ভিত্তিতে নিয়োগ চূড়ান্ত করতে গিয়ে বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করা এবং অযোগ্য ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেয়ার অভিযোগ নিয়ে খোদ সরকারি দল ও কমিটির ভেতরে অসন্তোষ দেখা দেয়।
বিশেষ করে লালমনিরহাট, বরগুনা, সাতক্ষীরা, ফরিদপুর, নওগাঁ ও যশোর—এই ছয় জেলায় ডিলার নিয়োগ সংক্রান্ত অসঙ্গতির বিষয়টি বৈঠকে জোরালোভাবে আলোচিত হয়। সংসদীয় কমিটি সুপারিশ করেছে, যেসব এলাকায় অভিযোগ উঠেছে অথচ এখনো চুক্তি হয়নি, সেখানে অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত চুক্তি সম্পাদন স্থগিত থাকবে। আর যেখানে চুক্তি হয়ে গেছে, সেখানে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি মো: শাহাদাত হোসেন জানান, ডিলার নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে অভিযোগ আসায় বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সারের ডিলারশিপ সম্পূর্ণ অস্থায়ী। নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি ২ থেকে ৫ শতাংশও অনিয়ম বা বিচ্যুতি ঘটে থাকে, তবে তা বরদাশত করা হবে না। ডিলার নিয়োগ নীতিমালায় ৯০ দিনের মধ্যে যে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে তা বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রাপ্ত সব অভিযোগ যাচাই করে প্রকৃত সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘প্রতিটি ইউনিয়নে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং কৃত্রিম সঙ্কট ঠেকাতে অতিরিক্ত ডিলার নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতার স্বার্থে উপজেলা প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ব্লক সুপারভাইজার এবং জেলা প্রশাসকের (ডিসি) নেতৃত্বাধীন সমন্বিত কমিটি পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই ও স্বাক্ষরের পর তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। মন্ত্রণালয় সেই তালিকা অনুযায়ী অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ফলাফল ঘোষণা করেছে।
মন্ত্রী স্পষ্ট করেন, ‘সারের ডিলারশিপ চূড়ান্ত কোনো দলিল নয়। ৯০ দিনের পর্যবেক্ষণের মধ্যে যদি কোনো ব্যক্তির তথ্যে জালিয়াতি, অযোগ্যতা বা অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তবে তার ডিলারশিপ তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল ও পরিবর্তন করা হবে।’
এদিকে, মাঠপর্যায়ে সার বিতরণ, মজুত ব্যবস্থাপনা তদারকি এবং অবৈধ মজুতদারি ও বিপণনের অনিয়ম চিহ্নিত করতে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত সাব-কমিটি গঠন করেছে স্থায়ী কমিটি। কমিটির সদস্য মো: মোস্তাফিজুর রহমান এমপিকে এর আহ্বায়ক করা হয়েছে।
সাব-কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন মো: রোকন উদ্দীন বাবুল এমপি এবং মোছা: সাবিরা সুলতানা এমপি। এই কমিটি সরেজমিনে বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শন করে সঙ্কট নিরসনে সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা মূল কমিটির কাছে জমা দেবে।
সার্বিক সার পরিস্থিতির বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও কৃষিমন্ত্রী উভয়ই জানান, দেশে বর্তমানে সারের কোনো সঙ্কট নেই। অতীতের সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির অপচেষ্টা শক্ত হাতে প্রতিহত করা হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, গত বছরের তুলনায় বর্তমানে দেশে সারের মজুত প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি। বর্তমানে সরকারের গুদামে ১৩ লাখ ৫০০ টনের বেশি সার মজুত রয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সারবাহী জাহাজ পাইপলাইনে (আমদানির পথে) রয়েছে। সার কারখানাগুলো নির্বিঘ্নে উৎপাদন চালিয়ে গেলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যতে উদ্বৃত্ত সার বিদেশে রফতানির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
বৈঠকে সংসদীয় কমিটির সদস্য মো: শহিদুল ইসলাম এমপি, মো: মুজিবুর রহমান চৌধুরী এমপি, মো: গোলাম রছুল এমপিসহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব, অধীনস্থ বিভিন্ন দফতরের মহাপরিচালক ও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








