
২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যায় ‘জিপিওতে এক দিন’ শিরোনামে একটি প্রকাশিত হয়। নূরুর রহমানের লেখা প্রতিবেদনটিতে উঠে আসে—ঢাকা জিপিওতে কর্মীদের অসহযোগিতা, দীর্ঘ লাইন ও অব্যবস্থাপনার কারণে সেবাগ্রহীতাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়, যার সুযোগ নিয়ে দালাল চক্র অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে ভেতরের কর্মচারীদের মাধ্যমে দ্রুত কাজ উদ্ধার করে দিচ্ছে। সরকারি এই সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে সঠিক নজরদারির অভাবে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হলেও ঘুষ ও অনিয়মই যেন এখন সেখানকার স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে।
আজ নয়া দিগন্তের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রতিবেদনটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—
জিপিওতে এক দিন
নূরুর রহমান
নূরজাহান বেগম। ৫৩ বছর বয়সী এই মহিলা এসেছেন সকাল ৯টায়। এখন বাজে সাড়ে ১১টা। এক কাউন্টার থেকে আরেক কাউন্টারে ছুটছেন ব্যাডমিন্টনের কর্কের মতো। কাজ হচ্ছে না। পৌনে ১২টা নাগাদ উপায় হলো। ৩০ টাকা সেলামির বিনিময়ে কাজ উদ্ধার করতে পারলেন। রেহাই পেলেন ভোগান্তি আর দুর্ভোগ থেকে।
নিজামউদ্দিন বাকেরগঞ্জে বাড়িতে টাকা পাঠাবেন। এসেছেন সকাল সাড়ে ৯টায়। দেড় ঘণ্টা ধরে ঘুরেছেন তিনটি কাউন্টারে। ১০টা টাকা দিয়ে সহজেই আরো আগে কাজ শেষ করে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু বয়সে যুবক নিজাম নিয়মের বাইরে একটা পয়সা দিতেও রাজি নন। তাই এখনো লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন।
মালিবাগ পাবনা কলোনির আবদুস সামাদ এসেছেন নতুন কেনা গাড়ির কাগজপত্রের জন্য টাকা জমা দিতে। তিনি এসেছেন ১১টায়। আধা ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে বেছে নিলেন বিকল্প পথ। ১৫-১৬ বছর বয়সী একটি বালকের হাতে ফিসহ অতিরিক্ত ২০ টাকা দিয়ে ২০ মিনিটে কাজ শেষ করে চলে গেলেন।**
একদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৬ ঘণ্টায় এমন আরো বিরক্তিকর দুর্ভোগ-ভোগান্তি-দুর্ব্যবহারের ঘটনা দেখা গেছে এখানে। এটা ঢাকা জেনারেল পোস্ট অফিস। সংক্ষেপে নাম তার জিপিও। এখানে কাউন্টারে বসে থাকা সারি সারি কর্মীর হাবভাব, আচার-আচরণে সুস্পষ্ট বিতৃষ্ণার ভাব। কাউকে হাসিমুখে কথা বলতে দেখা গেল না। অজ্ঞাত কারণে তারা প্রচণ্ড বিরক্ত। যেন চটে আছেন সবার ওপর। এমনকি মহিলা কর্মীদেরও একই হাল। দেখে মনে হয়, তারা কাজ করছেন একান্ত অনিচ্ছায়। গ্রাহকরা যে তাদের সেবা পাওয়ার দাবিদার, এ কথাটি এখানে একদম বেমানান।
নূরজাহান বেগম এসেছিলেন সিঙ্গাপুরে পড়ুয়া তার সেজো ছেলের কাছে কিছু ওষুধ পাঠাতে। ঐ দেশে ওষুধের দাম বেশি। তাই দেশ থেকে পাঠাচ্ছেন। তিনি বললেন, পার্সেলটি তিনি বাসা থেকে ভালোভাবে প্যাক করে, কাপড় মুড়ে, সিলগালা করে এনেছেন। তিনি জিপিওতে এসে প্রথমে দাঁড়ালেন যে কাউন্টারে পার্সেল গ্রহণ করা হয় সেই কাউন্টারের লাইনে। কাউন্টারের সামনে যাওয়ার পর জানতে পারলেন অন্য কাউন্টার থেকে ডাক টিকিট লাগিয়ে আনতে হবে। গেলেন যেখানে টিকিট বিক্রি হয় সেই কাউন্টারের লাইনে। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর তার পালা যখন এল তখন কাউন্টারে কর্মরত ব্যক্তি জানালেন অন্য কাউন্টার থেকে ওজন করে আনুন।
ইতিমধ্যে নূরজাহান বেগম বিরক্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে কর্মরত ব্যক্তিকে বললেন, এত না ঘুরিয়ে একবারে বলে দিলেই হতো কোন কাউন্টার থেকে কী করতে হবে। কর্মকর্তা উত্তর, 'পোস্ট অফিসে এসেছেন, নিয়ম-কানুন জানেন না কেন?' নূরজাহান বেগম বললেন, বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসে তো এত ঝামেলা নেই। উত্তর, সেখানেই যান। নূরজাহান বেগম সেখানেই যেতেন। কিন্তু পোস্ট অফিসের মাধ্যমে তার পার্সেলটি পাঠাতে লাগবে ২৩৫ টাকা। বেসরকারি কুরিয়ার সেখানে চেয়েছে ১ হাজার ২০০ টাকা।
ওজন, টিকিট—এই সব কাউন্টার শেষ করে তিনি ফিরে এলেন পার্সেল কাউন্টারে। এখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল শেষ বিড়ম্বনা। বলা হলো, পার্সেলের কাপড় সেলাই করা হতে হবে। না হলে পার্সেল গ্রহণ করা হবে না। এখন এখানে কোথায় পাবেন সুই-সুতো? উচ্চার্যের পথ বাতলে দিলেন কাউন্টারের ব্যক্তিটি। বললেন, বাইরে মজনু নামে এক লোক আছে, তার কাছে নিয়ে যান। জিপিও ভবনের বাইরে, গেটের ভেতরে মজনুকে পাওয়া গেল। মজনু সেলাই করার জন্য চাইল ৫০ টাকা। শেষ পর্যন্ত ২০ টাকায় রফা হলো।
মজনু জানালেন, এত কষ্ট করার কোনো দরকার ছিল না। তাকে ৫০ টাকা দিলে কাপড় দিয়ে প্যাকেট করে টিকিট লাগিয়ে পার্সেলের স্লিপ পর্যন্ত সংগ্রহ করে দিতেন। যারা প্রায়ই পার্সেল করে তারা তাকে আর প্যাকেটটি তাকে দিয়ে চলে যায়। পরে সময় করে এসে স্লিপ নিয়ে যায়। মজনু বললেন, প্রতি পার্সেলে তার ১০ থেকে ১৫ টাকা থাকে। টাকার ভাগ দিতে হয় সবাইকে।
নূরজাহান বেগম তো রেহাই পেলেন! দেখা যাক নিজাম উদ্দিন নামের সেই যুবকটির কী অবস্থা। তিনি এক কাউন্টার থেকে টেলিগ্রাম মানিঅর্ডারের ফরম নিলেন। আরেক কাউন্টার থেকে ৫০ পয়সা দামের টিকিট। ভাঙতি নেই। তাই প্রয়োজন না থাকলেও নিতে হলো দুই টাকা দিয়ে চারটা টিকিট। লাইনে দাঁড়িয়ে কাউন্টার পর্যন্ত পৌঁছে জানতে চাইলেন, টেলিগ্রাম মানিঅর্ডারটি আগামীকাল পৌঁছাবে কি না। উত্তর এল ঠিক নেই। যদিও টেলিগ্রাম মানিঅর্ডার পরের দিন প্রাপকের কাছে পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিন্তু খোদ কাউন্টারের কর্মী জানালেন, টেলিগ্রাম মানিঅর্ডার থেকে সাধারণ মানিঅর্ডার আগে পৌঁছে। নিজামের টাকাটা তাড়াতাড়ি বাড়িতে পাঠানো খুব দরকার। বাকেরগঞ্জে বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিস এস এ পরিবহনের শাখা নেই। বাধ্য হয়ে আসতে হয়েছে জিপিওতে। তারাও নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না কবে পৌঁছাবে। তিনি সাধারণ মানিঅর্ডারই করবেন বলে ঠিক করলেন। কিন্তু এখানেও সমস্যা। তিনি বাকেরগঞ্জের পোস্ট অফিসের কোড নাম্বার জানেন না। কাউন্টারের কর্মী একটি বই উল্টিয়ে নিশ্চিত হলেন বাকেরগঞ্জে কোনো পোস্ট অফিস আছে কি না।
পোস্টাল কোড নাম্বার জানার জন্য নিজামকে লাইন ছেড়ে যেতে হলো, যেখানে চিঠিপত্রে গাম লাগানো হয় সেই টেবিলের কাছে। সেখানে সুতো দিয়ে বাঁধা একটি বই আছে। সেই বইয়ে আছে পোস্টাল কোড। সেখান থেকে আবার লাইনে। এবার অবশ্য খবর পেলেন। মানিঅর্ডারের কাজটা শেষ করতে করতে তার সময় লেগে গেল পাক্কা দুই-দুইটি ঘণ্টা। এই হচ্ছে একবিংশ শতাব্দীতে সরকারি মালিকানাধীন একটি 'পাবলিক সার্ভিস' প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাজের গতির নমুনা।
আবুল কালাম আজাদ বোধ হয় জিপিওর কাজকর্মের সম্পর্কে আগে থেকেই জানতেন। তাই তিনি ২০ টাকার বিনিময়ে বাঁচিয়েছিলেন সময়। রক্ষা পেয়েছিলেন বিরক্তি-বিড়ম্বনা-ভোগান্তি থেকে। তিনি খেয়াল থেকে বালকটিকে সংগ্রহ করেছেন, সেখানে গিয়ে দেখা গেল এমন ২০-২৫ জন কিশোর আছে। যাদের কাজ আজাদ সাহেবের মতো লোকদের কাজ দ্রুত করে দেওয়া। রেটও বাঁধা। ২০ টাকা। ১০ টাকা তার। ১০ টাকা কাউন্টারের যিনি আছেন তার। এই বালকদের লাইনে দাঁড়াতে হয় না। কাউন্টারের ভেতরে ঢুকে টাকা জমা দিয়ে রিসিট নিয়ে চলে আসে। কাউন্টারের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা, যারা ২০ টাকা দিতে রাজি নন কিংবা এই সব লাইনঘাট চেনেন না।
এখানেই শেষ নয়। আরো আছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশের যে কোনো স্থানে চিঠি পাঠানোর ব্যবস্থার নাম জিইপিএস। সেই কাউন্টারে গিয়ে দেখা গেল কর্মী পাশের সহকর্মীর সঙ্গে গভীর আলোচনায় মগ্ন। সামনে লম্বা লাইন। অস্বস্তিকর বিরক্তির জবাবে তিনি এমনভাবে তাকাচ্ছেন যেন তাদের আলোচনায় বাধা দেওয়াটা গুরুতর অপরাধ। এক পর্যায়ে পাশের সহকর্মী লাইনের উদ্দেশ্যে বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন, 'এমন করছেন কেন? রোজা-রমজানের দিন। একটু অপেক্ষা করতে পারেন না। দেখছেন না জরুরি কথা বলছি।' লাইন ধরে মানুষকে দাঁড় করিয়ে রেখে তারা কী গুরুত্বপূর্ণ জরুরি আলোচনা করছেন তার বিষয়বস্তু অবশ্য জানা যায়নি।
‘বিদেশে দ্রুত চিঠি পাঠানোর সার্ভিস ইএমএস কাউন্টারের’ লাইনেও লম্বা লাইন। কাউন্টারে কর্মরত কর্মী দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছেন না। ভিন্ন চিত্রের এই কাউন্টারে দেখা গেল ভিন্ন প্রক্রিয়া। এই কাউন্টারের কর্মী লাইনে দাঁড়ানো লোকদের চিঠি গ্রহণ করার চেয়ে কাউন্টারের ভেতর দিয়ে আসা ব্যক্তিদের চিঠি গ্রহণে বেশি আগ্রহী। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকাদের আপত্তির সংক্ষিপ্ত উত্তর : 'এগুলো সরকারি চিঠি।' সরকার এত চিঠি বিদেশে পাঠাচ্ছে কেন? একই লোক কিছুক্ষণ পরপর দু-তিনটি করে সরকারি চিঠি কোত্থেকে নিয়ে আসছে? তাকে অনুসরণ করতেই উত্তর মিলে গেল। দীর্ঘ লাইনে না দাঁড়িয়ে যারা চটজলদি কাজ সেরে ফেলতে চান তাদের জন্য আছেন তিনি। নাম তার আবু তাহের। দক্ষিণা ২০ টাকা। দরদাম করার রেওয়াজ আছে। মুলামুলি করে ২০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৫ টাকা করা যায়। তবে কোনোভাবেই ১০ টাকার কম নয়।
আবু তাহের জানালেন, তিনি বিএ পাস। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক নেতা তার বন্ধু বান্ধব। তিনি বললেন, ইএমএস করতে হলে একটি ফরম ইংরেজিতে পূরণ করতে হয়। অনেকে ইংরেজি জানেন না। তিনি ফরমটি ফিল আপ করে তাদের 'হেল্প' করেন। বিনিময়ে 'পাবলিক' খুশি হয়ে নিজ থেকেই কিছু দেয়। এ ছাড়া অনেকে আছেন লাইনে দাঁড়াতে চান না। তিনি তাদেরও 'হেল্প' করেন।
আবু তাহের বললেন, তিনি ১৬ বছর ধরে এই কাজ করছেন। তারা ১৫-২০ জনের মতো আছেন এখানে। জিপিওর সব কর্মকর্তা-কর্মচারী তাকে চেনেন। ভালোবাসেন। তার মতে, 'এগুলো পত্রিকায় লিখে কী হবে? আমি তো ঘুষ খাচ্ছি না। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিনতাই করছি না।' তিনি পরামর্শ দিলেন, ফরেন পোস্ট অফিসে যেতে। সেখানে কাস্টমের লোকেরা বিদেশ থেকে আসা কিংবা বিদেশে পাঠানোর জন্য পোস্ট করা জিনিসপত্র আটকে কীভাবে টাকা কামাচ্ছে, তা নিয়ে লিখতে।
ততক্ষণে ৩টা বেজে গেছে। দেখি পোস্ট অফিস বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর শুরু হবে নাইট পোস্ট অফিস। বের হয়ে আসতে হলো ঢাকা জেনারেল পোস্ট অফিস থেকে। সংক্ষেপে যার নাম জিপিও।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








