
২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যায় শেষ পাতার প্রধান শিরোনাম ছিল–‘একের পর বিদ্যুতের দাম বাড়ছে’। নাজমুল হেসেনের লেখা ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আইএমএফ ও আইএফসির ঋণ সহায়তার শর্ত এবং পিডিবির লোকসান কমাতে দীর্ঘ তিন বছর পর ঈদের পর শীত মৌসুমে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মাধ্যমে দেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর জোর প্রক্রিয়া চলছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ৩৩ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও বিইআরসির পূর্ণাঙ্গ লোকবল ও বিধিমালার অভাব সত্ত্বেও এবার বছরে দুই দফায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
আজ নয়া দিগন্তের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রতিবেদনটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—
একের পর বিদ্যুতের দাম বাড়ছে
নাজমুল হেসেন
ঈদের পর শীত মৌসুমে দেশে বিদ্যুতের মূল্য বাড়বে। পিডিবিকে প্রশাসনিকভাবে বছরে দু’দফা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ৩ বছর পেরিয়ে গেলেও সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়াতে পারেনি। অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে বিইআরসির ওপর প্রশাসনিক চাপ প্রদান করছে আইএমএফ ও আইএফসি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও এ নিয়ে বারবার বৈঠক করছেন।
বিদ্যুৎ শিল্পের সংস্কারে গঠিত এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন গঠন হওয়ার পর থেকে বিদ্যুতের খুচরা দাম পিডিবি বাড়ায়নি। দাম বাড়ানোর ব্যাপারে পিডিবি প্রস্তাব দিলেও সরকার প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করেনি। তবে এবার দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে বিইআরসি জোর তৎপরতা শুরু করেছে। আইএমএফ ও আইএফসি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে দাম বাড়ানোর ব্যাপারে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত তাদেরকে আর কোনো সাহায্য দেওয়া হবে না।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, এখন থেকে আর সরকার নয়, মূল্য সমন্বয় করবে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন।
এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন বলেছেন, কমিশন এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। কমিশনে চেয়ারম্যান নিয়োগ হলেও নিজের আফিস নেই। বিইআরসির লোকবল নিয়োগ হয়নি। মাত্র দু’সদস্য নিয়েই চলছে এ কমিশন। তাই এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে বিশেষজ্ঞ নিয়োগের পরেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কমিশনের নীতি নির্ধারণী বিধিমালা না হওয়ায় দাম বাড়ানোর পক্ষে আলোচনা করতেই আমরা মূল্য নির্ধারণ করতে পারছি না। তবে এ ক্ষেত্রে শিল্প, বাণিজ্যিকসহ গৃহস্থালী বিভিন্ন শ্রেণীর গ্রাহকদের মতামত নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এনার্জি কমিশন এখন থেকে বিষেজ্ঞদের প্রস্তাব অনুযায়ী বছরে দু’দফা শতকরা ৫ শতাংশ হারে বিদ্যুতের দাম বাড়াবে। সে হিসাবে বছরে এক বার মূল্য বাড়ায় বিদ্যুতের দাম ৭ থেকে ৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ঈদের পর এ নীতি মৌসুমে তা কার্যকর হতে পারে বলে সূত্র জানায়।
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে বিদ্যুৎ বিক্রয়ে লোকসান হচ্ছে। প্রতি ইউনিটে দাম ৩ টাকা ৮৪ পয়সা হলেও সরকারের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে বিদ্যুৎ বিক্রি হচ্ছিল ১ টাকা ৮৪ পয়সা থেকে ৩ টাকা ৫০ পয়সা।
সূত্র জানায়, বর্তমানে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পর ৩ বছর পেরিয়ে গেলেও সরকার এর মূল্য না বাড়ানোয় চরম অসন্তুষ্ট বিইআরসি। ইতোমধ্যে ডেসকোসহ বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির জন্য চাপ দিয়েছে। এক কর্মকর্তার মতে, বিইআরসিকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন পুরোপুরি গঠন না হলেও তারা বারবার সরকারকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছে।
সূত্র মতে, এর পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ডেসকো পাওয়ার সার্ভিস লিমিটেড ডেসকোর মূল্য পর্যালোচনার পর একটি প্রস্তাব তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। দাম বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে বিইআরসি যে পরিমাণ দাম বাড়ানো প্রয়োজন তা সরকারকে জানাবে। একই সঙ্গে প্রতি দুই বছরে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি বিইআরসি রেগুলেটরি কমিশনের এখতিয়ার বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে প্রতিটি ইউনিটে প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধি করা হলে দাম কি পরিমাণ হবে সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পরিচালক ড. এ কে এম শামসুল হক বলেছেন, আমরা বিদ্যুৎ গ্রাহকদের কথা চিন্তা করে এই প্রস্তাবটি তৈরি করেছি।
এ বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানালেও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কোনো প্রস্তাব দেয়নি। কারণ এর দায়িত্ব এখন এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ওপর।
সূত্র মতে, ইতোমধ্যে গত ৩০ বছরে বিদ্যুতের মূল্য বেড়েছে ৩৩ বার। '৭৪ সালে বিদ্যুতের গড় মূল্য ইউনিট প্রতি ছিল মাত্র ১৬ পয়সা। বর্তমানে তা হয়েছে আড়াই টাকা। এ সময়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৫ গুণ। সর্বশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ গ্রাহকরা। এ কারণে সে সময় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি নিয়ে গ্রাহক মহলে সৃষ্টি হয় অসন্তোষ।
পিডিবি সূত্র জানায়, দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে দু'দফা, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ৪ দফা, এরশাদ শাসনামলে ১২ দফা, বেগম খালেদা জিয়ার ('৯১-'৯৬) আমলে ৩ দফা, শেখ হাসিনার শাসনামলে ৯ দফা এবং বর্তমান সরকার আমলে ইতোমধ্যে গত ৩ বছরে ৩ দফা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এবার বাড়লে তা ৪ দফায় দাঁড়াবে।
সূত্রটি আরো জানায়, ১৯৭৪ সালে বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট ১৬ পয়সা। আর 'এ' গ্রেডে চারট ধাপে মূল্য ছিল ৩১ পয়সা পর্যন্ত। ওই বছরের নভেম্বর নাগাদ এ মূল্য বজায় থাকলেও দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে ডিসেম্বরে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। ৫০ ইউনিট পর্যন্ত প্রথম ধাপ নির্ধারণ করে তার মূল্য ধরা হয় ২৯ পয়সা। ৫১' ৫০ পর্যন্ত ২য় ধাপের মূল্য ২৩ পয়সা এবং তদূর্ধ্ব ইউনিটের আবাসিক বিদ্যুতের মূল্য দাঁড়ায় ১৬ পয়সা। এতে গড় বিদ্যুতের মূল্য পড়ে ২৫ পয়সা। ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য ১০০ ইউনিট পর্যন্ত ৫৮ পয়সা, ২শ' ইউনিট পর্যন্ত ৫০ পয়সা এবং তদূর্ধ্ব ইউনিটের জন্য ৪০ পয়সা মূল্য ধরা হয়। এছাড়া একই হিসাবে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ বিলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে '৭৯ সালের সেপ্টেম্বর, '৮০ সালের অক্টোবর, '৮২ সালের জুলাই, '৮৩ সালের জুলাই, '৮৪ সালের মার্চ ও ডিসেম্বর, '৮৫ সালের জুলাই ও সেপ্টেম্বর, '৮৭ সালের আগস্ট, '৮৮ সালের জুলাই, '৮৯ সালের জুলাই, '৯০ সালের জুলাই এবং '৯১ সালের সেপ্টেম্বরে মূল্য বৃদ্ধি পায়।
'৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দেয়। আবাসিক বিদ্যুতের মূল্য প্রথম ধাপে ৩শ' ইউনিট পর্যন্ত ১০ পয়সা বাড়িয়ে ১ টাকা ৭৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। একইভাবে ৫শ' ইউনিট পর্যন্ত ২০ পয়সা বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ২ টাকা ৯৫ পয়সা, ৭শ' ইউনিট পর্যন্ত ৩ টাকা ৫৫ পয়সা এবং তদূর্ধ্ব প্রতি ইউনিটের মূল্য ৪ টাকা ৯৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। কৃষি পাম্পের জন্য ফ্ল্যাট রেট ১ টাকা ৭৫ পয়সা, ক্ষুদ্র শিল্পের ফ্ল্যাট রেট ১৫ পয়সা বাড়িয়ে ৩ টাকা, অফপিক আওয়ারে ২০ পয়সা বাড়িয়ে ২ টাকা ৩০ পয়সা, পিক আওয়ারে ৪০ পয়সা বাড়িয়ে ৪ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়। একইভাবে বাণিজ্যিক বিলের ফ্ল্যাট মূল্য ৩ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪ টাকা ১০ পয়সা অফপিক আওয়ারে ২ টাকা ৪৫ পয়সার স্থলে ২ টাকা ৭৫ পয়সা এবং পিক আওয়ারে ৬ টাকার স্থলে ৬ টাকা ৬০ পয়সা করা হয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম দফা '৯৬ সালের ১ আগস্ট ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়ায়। একই বছরের ১ ডিসেম্বর আবারও দাম বাড়ে ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। আওয়ামী লীগ আমলে শেষ দফা দাম বৃদ্ধি পায় ২০০১ সালের ৫ মার্চ। ইউনিট প্রতি ৫ পয়সা বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার তিন মাসের মাথায় ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি বিদ্যুতের মূল্য বাড়িয়ে প্রথম ধাপে ২ টাকা ১৫ পয়সা, দ্বিতীয় ধাপে ২ টাকা ৩০ পয়সা, ৩য় ধাপে ৩ টাকা ৪৫ পয়সা, ৪থ ধাপে সাড়ে চার টাকা এবং পঞ্চম ধাপে ৫ টাকা ৭০ পয়সা ধার্য করে। আর বাণিজ্যিক গ্রাহকদের মূল্য হার বৃদ্ধি করে ফ্ল্যাট রেট চার টাকা ৮০ পয়সা, অফপিকে ৩ টাকা ৪৫ পয়সা এবং পীকে ৭ টাকা ৪৫ পয়সা। ছ'মাস পর বর্তমান সরকার আবারও একই বছর ১ আগস্ট বিদ্যুতের দাম বাড়ায়। সে বার পিডিবির আবাসিক গ্রাহকদের প্রথম ধাপে ১ম' ইউনিট পর্যন্ত প্রতি ইউনিট ২ টাকা ২৬ পয়সা, দ্বিতীয় ধাপে ৩শ' ইউনিট পর্যন্ত ২ টাকা ৪২ পয়সা, তৃতীয় ধাপে ৫শ' ইউনিট পর্যন্ত ৩ টাকা ৬২ পয়সা, ৪থ ধাপে ৭শ' ইউনিট পর্যন্ত ৪ টাকা ৭৩ পয়সা এবং পঞ্চম ধাপে তদূর্ধ্ব ইউনিটের জন্য ৫ টাকা ৯৯ পয়সা করা হয়। আর ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য ফ্ল্যাট রেট ছিল প্রতি ইউনিট ৩ টাকা ৮৩ পয়সা, অফপিকে ৩ টাকা ৫ পয়সা, পিক আওয়ারে ৫ টাকা ৩৬ পয়সা। বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ফ্ল্যাট রেট ছিল ৫ টাকা ৪ পয়সা। অফ পিক আওয়ারে ৩ টাকা ৬২ পয়সা। পীকে ৭ টাকা ৮২ পয়সা। এছাড়া কৃষি পাম্পের প্রতি ইউনিটের জন্য ১ টাকা ৮৪ পয়সা। গত বছর সেপ্টেম্বরে বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানো হয়। ১ম' ইউনিট পর্যন্ত প্রথম ধাপে প্রতি ইউনিটের মূল্য ২৪ পয়সা বেড়ে হয় ২ টাকা ৫০ পয়সা। একইভাবে ১ম' ১ ইউনিট থেকে ৪শ' ইউনিট পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপে ইউনিট প্রতি ৪ টাকা এবং শেষ ধাপে ৪শ' ইউনিটের উর্ধ্বে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য হয় ৫ টাকা। ২০০৩ সালের দু' দফায় বিদ্যুতের মূল্যের তুলনামূলক পার্থক্য দেখা যায় বিস্তর। এর ফলে সাধারণ বিদ্যুৎগ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








