অপতথ্য মোকাবিলা
রাজধানীর হোটেল র‍্যাডিসন ব্লুতে ‘মিথ্যা ও অপতথ্য: জাতীয় নিরাপত্তার ওপর হুমকি’ শীর্ষক সেমিনার। নয়া দিগন্ত

জনগণের সর্বশেষ আস্থা ও ভরসার দুটি জায়গা হচ্ছে— সুপ্রিম কোর্ট ও সশস্ত্র বাহিনী। কিন্তু বর্তমানে সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে মারাত্মকহারে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে অপপ্রচার থেকে মুক্ত রাখতে হবে। এছাড়া অপতথ্য মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রস্তুতির তাগিদ দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

Advertisement

শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল র‍্যাডিসন ব্লুতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইএনএসএস) আয়োজনে ‘মিথ্যা ও অপতথ্য: জাতীয় নিরাপত্তার ওপর হুমকি’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। 

সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। 

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) বিশিষ্ট অধ্যাপক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমিনুল করিম (অব.)। সেমিনারের আহ্বায়ক ছিলেন বিআইএনএসএসের সদস্যসচিব মেজর (অব.) আবদুল্লাহ আল মাহমুদ। এতে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী এবং নীতি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

এতে নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবু রুশদ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সাজেকে পর্যটকদের জিম্মি করা এবং সেনাবাহিনীর ওপর আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফের গুলি চালানোর ঘটনা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। 

তার অভিযোগ, আন্দোলনের নামে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা তিন হাজার পর্যটককে জিম্মি করে বিপদে ফেলার চেষ্টা করেছে। অথচ কয়েকটি গণমাধ্যম অভিযুক্তদের ‘আন্দোলনকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করে সহানুভূতি তৈরির চেষ্টা করেছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আধুনিক যুদ্ধ এখন আর শুধু প্রচলিত সামরিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাইবার হামলা, অর্থনৈতিক চাপ, কূটনৈতিক কৌশল, প্রচার ও মনস্তাত্ত্বিক অভিযানকে একসাথে ব্যবহার করে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, জনগণের চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তথ্যের আংশিক উপস্থাপনকে তিনি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করে এ বিষয়ে বিশেষ মহড়া আয়োজনের সুযোগ ছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগানো গেলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ করে অপতথ্য ও প্রচারণা মোকাবিলার প্রস্তুতি আরো জোরদার করা যেত। এখন আর সময় নষ্ট না করে কার্যকর প্রস্তুতি নিতে হবে। কৌশলগত পর্যায়ে ‘পিপলস ওয়ার ডকট্রিন’ বা জনযুদ্ধের মতবাদ নিয়ে কাজ করা, পরিচালনাগত পর্যায়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলা এবং মাঠপর্যায়ে যুদ্ধের পরিবর্তিত ধরন অনুযায়ী কৌশল ও কার্যপদ্ধতি হালনাগাদ করা প্রয়োজন। সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন শাখা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের সক্ষমতাও জোরদার করতে হবে।

অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমিনুল করিম বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট ও সশস্ত্র বাহিনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাব ও অপপ্রচার থেকে মুক্ত রেখে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়লে সেনাবাহিনীর প্রয়োজন হয়, অপতথ্য ঢুকে গেলে তা কঠিন হয়ে পড়বে।’ ফলে গুজব শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পড়ার আগেই জনগণের কাছে সত্য তথ্য পৌঁছে দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

সেমিনারে মেজর জেনারেল (অব.) ড. মো: মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেয়ার চেয়ে আগেই জনগণকে সঠিক তথ্য জানানো বেশি কার্যকর। অপতথ্য প্রতিরোধে সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।

সেমিনারে ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. আবদুল্লাহ আল ইউসুফ বলেন, ‘মিথ্যা ও অপতথ্য ছড়িয়ে জনমত নিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা কমানো এবং জাতীয় ঐক্য দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশের বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এ ধরনের অপতথ্য জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। সংগঠিত অপতথ্য প্রচারণার জবাবও সংগঠিতভাবে দিতে হবে।’

সেমিনারে ‘প্যানেল ডিসকাশনে’ দ্য ইরাবতির বাংলাদেশ প্রতিনিধি সাংবাদিক মুক্তাদির রশিদ রোমিও বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে কোন ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে আছে, সেটাও সবাইকে বুঝতে হবে। অপতথ্য বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রচার হচ্ছে। এমনকি বাহিনীর এক শ্রেণির কর্মকর্তাও গুজব বা অপপ্রচারমূলক তথ্য ছড়িয়ে থাকেন। সার্বিকভাবে চিন্তা করে একটি ওয়েবসাইট করা যায়, যেখানে গুজব বা অপপ্রচারমূলক তথ্য যাচাই করার সুযোগ থাকবে।’

এতে সাংবাদিক শাহেদ আলম বলেন, ‘মিথ্যা তথ্য ও অপপ্রচার মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনীকে সরকারের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে যুক্ত করা জরুরি।’