সৌদি প্রবাসী
সৌদি আরবের সংবাদ মাধ্যমে আসা খবর অনুযায়ী দুই বাংলাদেশিকে ‘অনৈতিক’ কাজের অভিযোগে আটক করেছিল দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। সংগৃহীত

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, সৌদি আরবে যে দুজনের মৃত্যুদণ্ডের খবর এসেছে, তাদের ২০২৩ সালে আটক করা হয়েছিল। সরকার এখন রায়ের কপির জন্য অপেক্ষা করছে বলে আজ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন তিনি।

Advertisement

তবে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ওই দুই বাংলাদেশীর একজনের পরিবার জানিয়েছে যে, এক সপ্তাহ আগেও তিনি জেলে থেকে পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছেন, যদিও মৃত্যুদণ্ড হতে পারে এমন কোনো আভাস তিনি দেননি।

গত বুধবার বাংলাদেশী নারী ও পুরুষ দুই জনের মৃত্যুদণ্ডের খবর সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যমে এলেও সৌদি আরব কিংবা বাংলাদেশ সরকার কেউই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পরিচয় প্রকাশ করেননি।

তবে এর মধ্যে যিনি পুরুষ তার বাড়ি ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায়। তার মা রহিমা বেগম জানিয়েছেন, গত রোববারও সৌদি আরবের জেল থেকে তাদের সাথে কথা বলেছেন তাদের ছেলে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমরা জানতাম সে জেলে আছে। কিন্তু এমন হবে ছেলেও বলে নাই কিছু। এরপর বুধবার সন্ধ্যায় নিউজ হওয়ার পরপরই খবর পেলাম লোকজনের কাছ থেকে। খবর শুনেই ছেলের ফুফু স্ট্রোক করে মারা গেছে।’

তিনি ছেলের লাশ দ্রুত দেশে আনা ও ঘটনার ন্যায় বিচার চেয়েছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো: আবুসাঈদ বলেছেন, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুজনের মধ্যে একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই ব্যক্তিই কি-না সে বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো তথ্য এখনো পাননি।

সৌদি আরবের মক্কায় সম্প্রতি দুই বাংলাদেশীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে রোববারই ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়াকে ডেকে এনে বৈঠক করেছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

মক্কা নগরীর একটি মসজিদে ‘অনৈতিক’ কাজ করার অভিযোগে তাদের সৌদি আরবের আদালত দোষী সাব্যস্ত করেছে বলে খবর বেরিয়েছে।

তবে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা সৌদি আরবে বাংলাদেশের দূতাবাস- কোন পক্ষ থেকেই ওই দুই বাংলাদেশীর পরিচয় সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

যদিও মৃত্যুদণ্ড হওয়া পুরুষ ব্যক্তিটির পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে ওই পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল।

ওই ব্যক্তির মা নিশ্চিত করেছেন যে, মৃত্যুদণ্ড হওয়া ব্যক্তি তারই সন্তান। তিনি সন্তানের লাশ আনার ব্যবস্থা অনুরোধ জানিয়ে বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘তিন বছর তিন মাস ছেলের মুখ দেখি না। আমি যেন ছেলের চেহারা শেষবারের মতো দেখতে পারি।’

মৃত্যুদণ্ড হওয়া ব্যক্তি সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে?
ওই ব্যক্তির মায়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, মাদরাসা থেকে দাখিল পাস করে দালালের মাধ্যমে ২০২২ সালের ১০ই নভেম্বর সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তার ছেলে।

দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে বড় এই ছেলে রিয়াদে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ করতেন। জানা যাচ্ছে, যে মসজিদে ‘অনৈতিক’ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে সেই মসজিদেই পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতেন তিনি।

তার মা বলেন, ‘সেখানে যাওয়ার ৬ মাস পরেই তাকে জেলে নেয়া হয়। জেলে নেয়ার এক মাস পর আমাদের সাথে যোগাযোগ করে আমার ছেলে। তখন বলছিল যে মা ওরা মনে আমাকে জেলে রেখে তারপর ছেড়ে দেবে। গত রোববারও কথা বললাম। আর বুধবার শুনলাম এই ঘটনা।’

কেন তাকে আটক করা হয়েছে সে সম্পর্কে পরিবারকে তিনি কিছু জানিয়েছিলেন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না তেমন কিছু বলেনি।’

যদিও পরিবারের আরেকজন সদস্য জানিয়েছেন যে, শেষ দিকে এসে ওই ব্যক্তি তার পরিবারকে বলেছেন- ওই নারীর সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল।

তার মা বলেন, তার ছেলে তাকে জানিয়েছে যে, একদিন তিনি ডিউটিতে আসার পর পুলিশের গাড়ি এসে তাকে নিয়ে যায়।

পরিবার বলছে, জেলে যাওয়ার পর প্রায় প্রতি সপ্তাহেই তিনি ফোনে পারিবারের সাথে অল্প হলেও কথা বলতেন। এ সময় তিনি জানিয়েছিলেন যে, ওই নারীর সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল।

সবশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার তিন দিন আগে রোববার পরিবারের সাথে সবশেষ কথা বলেছেন তিনি।

মৃত্যুদণ্ড হওয়া পুরুষ ব্যক্তির মা বলেছেন, ‘প্রথম দিকে ভাষার কারণে আমার ছেলে কারোরই কিছু বুঝাতে পারে নাই। আমরা দালালের কাছে গেছিলাম। দালাল বললো সৌদি আরব পৌঁছানোর পর আর কোনো কিছু তার বিষয় না।’

ছেলে সৌদি আরবে জেলে যাওয়ার পর তারা স্থানীয়ভাবে প্রশাসনের কারো সাথে যোগাযোগ করেননি বলেও জানিয়েছেন তিনি।

তবে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড হওয়া ছেলেটির বয়স আনুমানিক ২২ বছর হবে। তার পিতা একসময় অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করতেন। এখন বার্ধক্যজনিত কারণে কাজ করতে পারেন না।

মূলত পারিবারিক অভাব অনটনের কারণেই দালালের হাত ধরে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল তাকে। কিন্তু সৌদি আরবে যাওয়ার ৬ মাস পরেই ২০২৩ সালে আটক হন তিনি।

ঢাকায় আজ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও বলেছেন, তারা এতটুকু জানতে পেরেছেন যে ২০২৩ সালে তাদের (মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারী ও পুরুষ) আটক করা হয়েছিল। বাজিটা জানার জন্য আমরা চিঠি দিয়েছি। রায়ের কপি পেলে বিস্তারিত জানাবো। আমাদের মনে রাখতে হবে সৌদি আরব আমাদের এক নম্বর গন্তব্য রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য। প্রতিকূল পরিবেশেও ৪ লাখের বেশি বাংলাদেশী ভাইরা ওখানে গেছে। আবার ওখানে যারা গেছে তাদের নিরাপত্তা রক্ষাও আমাদের দায়িত্ব।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশীরা অনেক জায়গায় কারাভোগ করছে। ওরা পিরিওডিক্যালি তালিকা পাঠায় পরিচয়বৃত্তান্তসহ। আমরা তখন অফিসিয়ালি জানতে পারি যে কখন কিভাবে অ্যারেস্ট হয়ে জেলখানায় আছে। সেই তালিকা আমরা দেখছি যে তাদের নাম আছে কি না। পরিবার থেকেও আমরা জানতে পারিনি। আমরা এতটুকু জানতে পেরেছি ২০২৩ সালে ঘটনাটা ঘটেছিল ও তাদের আটক করা হয়েছিল।’

যদিও যুক্তরাজ্য ভিত্তিক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ড. রায়হান রশীদ বলছেন, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তিন বছর ধরেই ওই দুজনের আটকের তথ্য পেয়েছিলেন।

‘দূতাবাসের দায়িত্ব ছিল গ্রেফতারের পরপরই খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া। তিন বছর ধরে জনশক্তি মন্ত্রণালয় তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেনি। তালিকা পেয়েও ব্যবস্থা নেয়নি দূতাবাস। একজন বিদেশী নাগরিকের কনস্যুলার অধিকার আটকের পর থেকেই শুরু হয়। কনস্যুলার সুবিধা পাওয়া তাদের অধিকার ছিল। ওখানে বাংলাদেশীদের প্রতি কেমন আচরণ করা হয়, এ ঘটনা সেটিই তুলে ধরেছে। এরা গরীব মানুষ। তাদের আইনি সহায়তা দরকার ছিল।’

ড. রশীদ বলছেন, ১৯৬৩ সালের কনস্যুলার সম্পর্ক বিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন অনুচ্ছেদ ৩৬ অনুযায়ী বিদেশী নাগরিক গ্রেফতার বা আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হলে তাদের নিজ দেশের দূতাবাসের সহযোগিতা পাওয়ার অধিকার আছে। একজন শ্রমিক এটি নাও জানতে পারে। এটি সৌদি আরবের দায়িত্ব ছিল। আর বাংলাদেশ দূতাবাসের উচিত ছিল খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া।
 
সূত্র : বিবিসি