
তিন বছর তিন মাসে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মেগা প্রকল্প ‘পার্টনার’ প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে মাত্র ২২ শতাংশে। ধীরগতিতে বাস্তবায়ন, জনবল নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ এবং প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে প্রকল্পটির পরিচালক পরিবর্তন করা হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর আবুল কালাম আজাদকে সরিয়ে ড. মো: শাখাওয়াত হোসেন শরীফকে নতুন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ দেয়া হয়। সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেলে তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
এর আগে প্রকল্পের প্রথম পিডি মিজানুর রহমান অনিয়মের অভিযোগে বরখাস্ত হন।
সংশ্লিষ্টদের বলছেন, শাখাওয়াত হোসেন শরীফ এই প্রকল্প প্রণয়নে শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন ফোকাল পারসন। কিন্তু তাকে বাদ দিয়ে পরপর দুইজন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়।
শেষ পর্যন্ত শাখাওয়াত হোসেন শরীফকে প্রকল্প মেয়াদের তিন বছর অতিবাহিতের পর পিডি নিয়োগ দিলো সরকার। নতুন নেতৃত্বে প্রকল্পটির বাস্তবায়নে গতি আসবে বলে প্রত্যাশা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, একই সময়ে অন্য কয়েকটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশে পৌঁছালেও পার্টনার প্রকল্পের অগ্রগতি ২২ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পের ধীরগতির কারণ অনুসন্ধান এবং বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যেই প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।
নতুন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব গ্রহণ করায় প্রকল্পের অনুমোদিত কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন, সময়ভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত তদারকি জোরদার হবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। তাদের মতে, প্রকল্পের বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, দায়িত্ব বণ্টন ও ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে ধীরগতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
জনবল নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ
বিশ্বব্যাংকের আইডিএ, আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (আইএফএডি) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে পার্টনার প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রকল্পটিতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের ৫৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়নের কথা রয়েছে।
প্রকল্পটির প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) ২০২১ সালের মার্চে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জেটিডব্লিউজি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়। ওই বছরের অক্টোবরে প্রস্তাবটি কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরে বিশ্বব্যাংকের সুপারিশে ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি প্রকল্প প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি প্রায় এক বছর ধরে বিশ্বব্যাংকের সাথে পাঁচটি বাস্তবায়ন সহায়তা মিশনসহ বিভিন্ন পর্যালোচনা কার্যক্রমে অংশ নেয়।
২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প পরিচালনা কমিটি (পিএসসি) এবং ২০২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) পর্যায় অতিক্রম করে প্রকল্পটি। একই বছরের ২২ মার্চ বিশ্বব্যাংকের সাথে অর্থায়ন বিষয়ে আলোচনা হয়। ১৮ এপ্রিল একনেকের অনুমোদন এবং ২৬ এপ্রিল আইএফএডির সাথে আলোচনা সম্পন্ন হয়। ৯ মে প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাবও একনেকের অনুমোদন পায়। এরপর ১৪ মে কৃষি মন্ত্রণালয় প্রশাসনিক আদেশ জারি করে।
তবে প্রকল্পের জনবল নিয়োগে অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি), পদবিন্যাস ও দায়িত্বের বিবরণী (টিওআর) এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
শুরু থেকেই বিতর্ক
কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম-২ (এনএটিপি-২)-এর অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো: শাখাওয়াত হোসেন শরীফকে পার্টনার প্রকল্পের ফোকাল পারসন হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে ডিএইর পরিকল্পনা উইং থেকে অনুমোদিত ডিপিপি ও টিওআর অনুসারে তাকে ‘প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর’ পদে পদায়নের প্রস্তাব নথিতে উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন কৃষি সচিব ওয়াহিদা আক্তারের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও অনুমোদিত ডিপিপির বিধান উপেক্ষা করে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সুবিধা দেয়ার উদ্দেশ্যে বিসিএসের ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তা মো: মিজানুর রহমানকে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্পের মাঝখানে তিনি বরখাস্ত হন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে প্রকল্পটির জনবল নিয়োগে বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি আবুল কালাম আজাদকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি সাবেক কৃষি সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের নিজ উপজেলা গাজীপুরের কাপাসিয়ার বাসিন্দা এবং তার আত্মীয়। এ অবস্থায় তার নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, যোগ্যতা ও প্রযোজ্য সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। নিয়োগসংক্রান্ত নথি যাচাই ছাড়া এসব অভিযোগকে প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই।
পার্টনার প্রকল্পের অর্থায়ন পরিচালিত হবে প্রোগ্রাম ফর রেজাল্টস (পিফরআর) পদ্ধতিতে। এ ব্যবস্থায় প্রকল্পের নির্ধারিত ১০টি ডিসবার্সমেন্ট লিংকড ইন্ডিকেটর (ডিএলআই) এবং ২৪টি ডিসবার্সমেন্ট লিংকড রেজাল্টের (ডিএলআর) বিপরীতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও স্বাধীন যাচাই সংস্থার (আইভিএ) মাধ্যমে তা যাচাইয়ের ভিত্তিতে অর্থ ছাড় করা হবে।
এ পদ্ধতিতে শুধু অর্থ ব্যয় বা অবকাঠামো নির্মাণ নয়, নির্ধারিত ফলাফল অর্জনও গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে প্রয়োজন ফলাফলভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, দক্ষ আর্থিক ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত পরিবীক্ষণ এবং সূচক অনুযায়ী অগ্রগতি পরিমাপের সক্ষমতা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য এ ধরনের অর্থায়নব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে নতুন হওয়ায় প্রকল্পে অভিজ্ঞ ও দক্ষ জনবল নিয়োগের গুরুত্ব আরো বেশি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়োগে অনিয়ম বা স্বার্থসংশ্লিষ্টতার অভিযোগের নিষ্পত্তি না হলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কৃষকের সক্ষমতা উন্নয়ন, খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার এবং কৃষিপণ্য রফতানির সম্ভাবনা সম্প্রসারণের লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ অবস্থায় প্রকল্পের জনবল নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, অনুমোদিত ডিপিপি ও টিওআর অনুযায়ী নিয়োগপ্রক্রিয়া পর্যালোচনা এবং বাস্তবায়ন অগ্রগতি মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি নতুন প্রকল্প পরিচালকের নেতৃত্বে সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, নিয়মিত তদারকি ও ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পটির দীর্ঘদিনের ধীরগতি কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








