
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
১১-দলীয় বিরোধী জোটের ঢাকা থেকে রংপুর লংমার্চ শেষ হয়েছে; কিন্তু রাজপথের কর্মসূচি সমাপ্ত হলেও তাদের আট দফা দাবি এখন সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে সামনে এসেছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফার লংমার্চে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হলে এই আট দফা যেকোনো সময় এক দফার আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। ফলে লংমার্চ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে এখন প্রশ্ন উঠেছে- দাবিগুলোর কতটা তাৎক্ষণিক নির্বাহী সিদ্ধান্তে বাস্তবায়ন সম্ভব, কোনগুলোতে প্রয়োজন নীতিগত পরিবর্তন এবং কোন দাবির সাথে জড়িয়ে আছে আইন, সংবিধান, বিচার ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিরোধীদের অধিকাংশ দাবির বিষয়ে সরকার ইতোমধ্যে কাজ করছে। কিছু দাবি বাস্তবায়নের পথে রয়েছে, আবার কিছু সমস্যার মূল অতীত সরকারের সময়ে নিহিত। তবে বিরোধী জোটের বক্তব্য, জনদুর্ভোগের দায় অতীতের হলেও সমাধানের দায়িত্ব বর্তমান সরকারের। ফলে ‘দায় কার’- এই বিতর্কের চেয়ে সাধারণ মানুষের কাছে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সঙ্কটের সমাধান কত দ্রুত দৃশ্যমান হয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আট দফার সব দাবি এক ধরনের নয়। দ্রব্যমূল্য, চাঁদাবাজি, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক অনিয়মের ক্ষেত্রে সরকার দ্রুত নির্বাহী ব্যবস্থা নিতে পারে। অন্যদিকে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো দাবিতে প্রয়োজন সাংবিধানিক, বিচারিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ। তাই প্রতিটি দাবির জন্য একটি পৃথক বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এখন সরকারের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ
বিরোধী জোটের অন্যতম প্রধান দাবি হলো গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন। এ বিষয়ে সরকারের সাথে বিরোধীদের মতপার্থক্য মূলত বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও সময়সীমা নিয়ে।
বিরোধীরা দ্রুত বাস্তবায়ন চাইলেও সরকারের বক্তব্য হলো, সংবিধানের সাথে সঙ্গতি রেখেই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সরকার সংবিধান মেনেই এগিয়ে যাবে এবং জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণের পথও সংবিধানের মাধ্যমেই নিশ্চিত করা হবে।
এখানে সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক ঐকমত্য ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সুসমন্বয়। গণভোটের রায়কে কিভাবে আইন, সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাঠামোর মধ্যে কার্যকর করা হবে- তার একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ সামনে না এলে এই ইস্যুতে রাজনৈতিক বিরোধ আরো বাড়তে পারে।
জুলাই গণহত্যার বিচার
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার আট দফার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। বিরোধীদের অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রত্যাশিত গতি নেই। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিচার নিশ্চিত করতে সব প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে সরকার বদ্ধপরিকর এবং জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে। এই দাবিতে সরকারের সামনে কেবল বিচার সম্পন্ন করাই নয়, বরং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
বিদ্যুৎ-গ্যাস-তেল ও সারের সঙ্কট
লংমার্চের আট দফার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিদ্যুৎ, গ্যাস, তেল ও সারের সঙ্কট নিরসন। এই দাবির সাথে সরাসরি যুক্ত রয়েছে শিল্প উৎপাদন, কৃষি, পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সঙ্কটের বড় একটি অংশ আগের সরকারের আমলের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির ফল; তবে সরকার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী জানিয়েছেন, সারের কোনো সঙ্কট নেই এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যাগুলো সম্পর্কে সরকার অবগত রয়েছে, যার দ্রুত সমাধান করা হবে।
তবে বাস্তবে শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ, বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি এবং কৃষকদের কাছে সারের প্রাপ্যতা- এই সূচকগুলোর ওপরই সরকারের কার্যকারিতা নির্ভর করবে। অতীতের দায় ছাপিয়ে বর্তমান সরকারের কাছে মানুষের মূল প্রত্যাশা হলো নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বড় পরীক্ষা
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে দৃশ্যমান ও সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যু। বাজারে মজুদদারি, কৃত্রিম সঙ্কট, অতিরিক্ত মুনাফা, চাঁদাবাজি ও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখতে সরকার নিয়মিত বাজার পর্যালোচনা ও মনিটরিং করছে। জেলা পর্যায়ের বিশেষ টাস্কফোর্স এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
তবে কেবল অভিযান চালিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। উৎপাদক, আমদানিকারক, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার পুরো সরবরাহচক্রে কার্যকর নজরদারি এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত না করা গেলে সাময়িক অভিযানে স্থায়ী সুফল মিলবে না। ফলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ সরকারের জন্য একই সাথে একটি প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক পরীক্ষা।
আইনশৃঙ্খলা ও চাঁদাবাজি
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধের দাবিটিও সরকারের জন্য দ্রুত ফল দেখানোর একটি ক্ষেত্র। বিরোধীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি, দখল ও সন্ত্রাস অব্যাহত রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ ও লুটপাটের মতো অরাজকতার চিত্র তুলে ধরেছে।
সরকার অবশ্য পরিস্থিতির উন্নতির দাবি করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃশ্যমানভাবে উন্নত হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। তবে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে আরো কিছু সময় লাগবে। দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে অপরাধ দমন করাই হবে সরকারের মূল পরীক্ষা।
নিয়োগে দলীয়করণ বন্ধ
রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ বন্ধ করে মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন নিশ্চিত করার দাবিটি সরাসরি নীতিগত পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত। সরকার চাইলে নিয়োগের মানদণ্ড আরো স্বচ্ছ করতে পারে, যোগ্যতার ভিত্তিতে বাছাইপ্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে পারে।
তবে বিরোধীদের অভিযোগ, দলীয়করণের সংস্কৃতি বন্ধ না হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের হারানো আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে। এর জন্য তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন।
তিস্তা নিয়ে উত্তরবঙ্গের অপেক্ষা
আট দফার সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি দাবিগুলোর একটি হলো তিস্তা মহাপরিকল্পনা। উত্তরবঙ্গের মানুষের বহুদিনের এই দাবির সাথে তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, নদীভাঙন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সরাসরি জড়িত।
সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সমাপনী আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন বিপুল অর্থায়ন, কারিগরি পরিকল্পনা এবং প্রতিবেশী দেশের সাথে কার্যকর পানি কূটনীতি। ফলে নির্দিষ্ট অর্থায়ন, সময়সীমা ও বাস্তবায়ন কাঠামো ঘোষণার মাধ্যমেই কেবল এই দাবিতে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব।
রাজপথে বিরোধী জোট, অবস্থান সরকারের
১১-দলীয় জোটের নেতাদের মতে, তাদের আট দফা কোনো দলের একক দাবি নয়; বরং এগুলো সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারের দাবি। দ্বিতীয় লংমার্চে ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট করেছেন, সরকার দাবিগুলো মেনে নিলে তাদের রাজপথে নামার প্রয়োজন হতো না।
এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সরকারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না হওয়া এবং গণভোটের রায় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, বিএনপি নেতারা এই কর্মসূচিকে গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে দেখছেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, বিরোধী দল রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতেই পারে এবং সরকার জনগণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না নয়া দিগন্তকে বলেছেন, জনসম্পৃক্ত সমস্যার সমাধান না হলে বিরোধীরা আন্দোলনের পরিবেশ তৈরি করতেই পারে। আর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম মন্তব্য করেছেন যে, সরকারের আচরণের ওপরই নির্ভর করবে তাদের স্থায়িত্ব।
এখন সিদ্ধান্তের পালা
লংমার্চের রাজপথের উত্তাপ শেষে আট দফার দাবিগুলো এখন পুরোপুরি সরকারের টেবিলে। দ্রব্যমূল্য, চাঁদাবাজি ও আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে জনগণ দ্রুত দৃশ্যমান ফল দেখতে চায়। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, নিয়োগে স্বচ্ছতা, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুতেও সরকারের সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের দৃষ্টিতে না দেখে, বিরোধীদের দাবিগুলোকে মূল্যায়ন করে কোনটি তাৎক্ষণিক সমাধানযোগ্য এবং কোনটিতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন- তার একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ উপস্থাপন করতে পারে সরকার। সরকারের পরবর্তী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে এই রাজনৈতিক চাপ কিভাবে মোকাবেলা করা হবে এবং দাবিগুলোর কতখানি বাস্তব রূপ পাবে।







