সন্তানহারা মায়ের গল্পে নীরব অশ্রুসিক্ত টরন্টোর প্রেক্ষাগৃহ
জেমস ম্যাকঅ্যাভয়

আলমগীর কবির, টরন্টো, কানাডা থেকে
১৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট। টরন্টোর স্কশিয়াব্যাংক থিয়েটারের ৩ নম্বর হল। পল অ্যান্ড্রু উইলিয়ামসের ‘ফেইথ’ সিনেমার প্রদর্শনী শুরু হওয়ার কথা। দর্শকসারির একটি আসনে বসে আমিও অপেক্ষা করছি পর্দা জ্বলে ওঠার।
সিনেমাটি দেখার আগ্রহ থেকেই আগে টিকিট নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছিলাম। টিকিট হাতে দেয়ার সময় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি হঠাৎ বললেন, ‘ইউ আর আ লাকি ম্যান।’
কথাটির অর্থ তখন পুরোপুরি বুঝিনি। পরে বুঝলাম, সত্যিই হয়তো ভাগ্যবানই ছিলাম। আমার হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল সিনেমাটির শেষ টিকিটটি। এরপর আর কোনো টিকিট অবশিষ্ট ছিল না।
প্রদর্শনী শুরুর প্রায় ১০ মিনিট আগে হলে ঢুকে দেখি, প্রায় প্রতিটি আসনই পূর্ণ। খুব বেশি প্রচার না পাওয়া, যুক্তরাষ্ট্রে এখনো পরিবেশক না পাওয়া এবং মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমার তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট পরিসরের একটি ছবির জন্য এমন দর্শক উপস্থিতি প্রথমেই কৌতূহল তৈরি করেছিল।
কিন্তু সিনেমা শেষ হওয়ার পর মনে হলো, সে দিনের সবচেয়ে স্মরণীয় বিষয় সিনেমাটির রহস্য নয়, এমনকি এর আধ্যাত্মিক প্রশ্নও নয়। আমার কাছে সবচেয়ে বেশি মনে থাকবে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া।
কারণ পর্দায় যখন একজন মায়ের একমাত্র সন্তানকে হারানোর শোক ফুটে উঠছিল, তখন দর্শকসারির পরিবেশ ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। চার পাশে তাকিয়ে দেখি, উপস্থিত দর্শকদের বড় একটি অংশ কাঁদছেন। কেউ চুপচাপ চোখ মুছছেন, কেউ মাথা নিচু করে বসে আছেন। কারো চোখের পানি ধরে রাখার চেষ্টা স্পষ্ট। আবার কেউ আবেগ সামলাতে পারছেন না।
সিনেমা হলে বসে দর্শকদের এমন সম্মিলিত কান্নার দৃশ্য আমার দেখা প্রথম।
আমার পাশের আসনে বসা ষাটোর্ধ্ব এক নারীকে বিশেষভাবে চোখে পড়ল। তিনি হু হু করে কাঁদছিলেন। পর্দায় মায়ের সন্তান হারানোর যন্ত্রণা যত তীব্র হচ্ছিল, তার কান্নাও যেন ততই ভারী হয়ে উঠছিল।
আমি তাকে চিনতাম না। তার জীবনে কী ঘটেছে, সেই দৃশ্য তার কোনো ব্যক্তিগত স্মৃতিকে মনে করিয়ে দিয়েছে কি না, সেটিও জানি না। কিন্তু অন্ধকার হলের মধ্যে একজন অপরিচিত মানুষের সেই কান্না আমার সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতার সাথে মিশে গেল।
সে দিন মনে হলো, সিনেমা কখনো কখনো শুধু পর্দায় ঘটে না। দর্শকসারিতেও তার আরেকটি গল্প তৈরি হয়।
‘ফেইথ’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র জিনা। এরিন ডোহার্টির অভিনয়ে ফুটে ওঠা জিনা একজন একক মা। জীবন তার জন্য সহজ নয়। কাজ, সন্তান, সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে নিজের সংসারটিকে ধরে রাখার চেষ্টা করে সে।
তার জীবনে মাইকেলের আগমন গল্পটিকে অন্য দিকে নিয়ে যায়। জেমস ম্যাকঅ্যাভয় অভিনীত মাইকেল শহরে নতুন। জিনার সাথে তার পরিচয় হয় স্থানীয় একটি পানশালায় আয়োজিত প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতার সময়। জিনা একটি মিষ্টি তৈরির কারখানার সংযোজন লাইনে কাজ করে। অন্য দিকে মাইকেলের কথাবার্তা ও আচরণে শুরু থেকেই এমন কিছু আছে, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
মাইকেল জিনাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। কিন্তু ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে তা এড়িয়ে যায়। এখান থেকেই চরিত্রটিকে ঘিরে রহস্য তৈরি হতে শুরু করে। মাইকেল আসলে কে? কিভাবে সে এমন কিছু বিষয় জানতে পারে, যা তার জানার কথা নয়? কেন সে জিনার ব্যক্তিগত জীবনের এমন জায়গায় পৌঁছাতে পারে, যেখানে একজন নতুন পরিচিত মানুষের পৌঁছানোর কথা নয়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই ‘ফেইথ’ ধীরে ধীরে একটি সম্পর্কের গল্প থেকে আধ্যাত্মিক ও অস্তিত্ববাদী প্রশ্নের দিকে এগিয়ে যায়।
তবে সিনেমাটির সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা আমার কাছে রহস্য নয়; বরং শোক।
একজন মা তার একমাত্র সন্তানকে হারালে সেই শোককে কিভাবে বোঝা যায় ‘ফেইথ’ তার কোনো সহজ উত্তর দেয় না; বরং দর্শককে সেই শোকের কাছাকাছি নিয়ে যায়। সেখানে যুক্তি খুব বেশি কাজে আসে না। সামাজিক সান্ত¡নাও যথেষ্ট মনে হয় না। ধর্মীয় বিশ্বাসও সব প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর দিতে পারে না।
আর ঠিক সেখানেই সিনেমাটি দর্শককে একটি কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়- বিশ্বাস আসলে কোথায়?
ঈশ্বরে? পরকালের সম্ভাবনায়? নাকি মানুষের ভালোবাসা ও সম্পর্কের মধ্যে?
মাইকেলের চরিত্রে জেমস ম্যাকঅ্যাভয়ের অভিনয় এই প্রশ্নগুলোকে আরো জটিল করে তোলে। তিনি চরিত্রটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে, শুরুতেই তাকে অতিপ্রাকৃত কোনো সত্তা বলে মনে হয় না; বরং তার স্বাভাবিক আচরণই রহস্য তৈরি করে। কখনো তিনি মমতাশীল, কখনো অস্বস্তিকরভাবে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন, আবার কখনো এমন কিছু বলেন, যা অন্য চরিত্রের ভেতরের ক্ষতকে স্পর্শ করে যায়।
অন্য দিকে জিনা অনেক বেশি বাস্তব ও পরিচিত একজন মানুষ। সে নিখুঁত নয়। তার ভয় আছে, রাগ আছে, আকাক্সক্ষা আছে, ভুল আছে; কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিচয়- সে একজন মা।
এরিন ডোহার্টির অভিনয়ে এই মানবিক দিকটিই সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে। ফলে সন্তান হারানোর পর তার শোক দর্শকের কাছে কেবল সিনেমার গল্প হয়ে থাকে না; সেটি ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গায় পৌঁছে যায়।
সম্ভবত এ কারণেই দর্শকসারিতেও এমন প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল।
আমার পাশের ষাটোর্ধ্ব নারীটির কান্না তখন আর শুধু একজন দর্শকের কান্না বলে মনে হচ্ছিল না। আশপাশে তাকিয়ে দেখি, আরো অনেকেই একইভাবে আবেগ সামলানোর চেষ্টা করছেন। কেউ প্রকাশ্যে কাঁদছেন, কেউ নীরবে চোখ মুছছেন।
আমাদের উপমহাদেশে সিনেমা দেখে নারীদের আবেগপ্রবণ হওয়ার একটি প্রচলিত ধারণা আছে; কিন্তু সে দিন টরন্টোর সেই অন্ধকার হলে বসে আমার উপলব্ধি হলো, শোকের ভাষা কোনো একটি সংস্কৃতির নিজস্ব নয়। একজন মা তার সন্তানকে হারাচ্ছেন- এই দৃশ্যের সামনে দর্শকের জাতীয়তা, ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা সামাজিক পরিচয়ের পার্থক্য অনেকটাই গৌণ হয়ে যেতে পারে।
সিনেমাটির আরেকটি দিক আমাকে ভাবিয়েছে। জেমস ম্যাকঅ্যাভয় নিজেকে বাস্তব জীবনে ধর্মীয় বা বিশেষভাবে আধ্যাত্মিক মানুষ হিসেবে মনে করেন না। ছোটবেলায় অবশ্য যাজক হওয়ার কথা ভেবেছিলেন। ১৩ বছর বয়সে বয়ঃসন্ধির সময় সেই ভাবনা থেকে সরে আসেন। ‘ফেইথ’-এ অভিনয়ের সময় তাকে সহকর্মীরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন কি না জানতে চাইলে তার উত্তর ছিল, ‘ডোন্ট থিংক সো’- অর্থাৎ, ‘তা মনে হয় না’।
তবু এমন একটি ছবিতে অভিনয় করতে তার আগ্রহ তৈরি হয়। কারণ ছবিটি কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রচার করে না; বরং বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মাঝখানে থাকা অনিশ্চয়তাকে গল্পের অংশ করে তোলে।
এই জায়গাটিই ‘ফেইথ’-কে প্রচলিত আধ্যাত্মিক সিনেমা থেকে কিছুটা আলাদা করে। দর্শককে কোনো নির্দিষ্ট বিশ্বাস গ্রহণ করতে বলা হয় না। আবার ঈশ্বর, পরকাল কিংবা অতিপ্রাকৃত সম্ভাবনাকেও সরলভাবে অস্বীকার করা হয় না; বরং সিনেমাটি প্রশ্ন রেখে যায়।
মানুষ যখন জীবনের সবচেয়ে বড় শোকের মুখোমুখি হয়, তখন সে কিভাবে বেঁচে থাকে? কিভাবে অর্থ খুঁজে নেয়? কিভাবে বিশ্বাস করে? আর যখন কোনো প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না, তখনো কি বিশ্বাসের প্রয়োজন থাকে?
১৯ সেপ্টেম্বর স্কশিয়াব্যাংক থিয়েটারের ৩ নম্বর হলে বসে সিনেমাটি দেখার সময় এসব প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে পরিষ্কার ছিল না; কিন্তু সিনেমা শেষ হওয়ার পর একটি দৃশ্য খুব স্পষ্ট হয়ে রইল।
পর্দা অন্ধকার হয়ে গেছে। আলো জ্বলে উঠেছে। দর্শকরা আসন ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। অথচ আমার পাশের সেই ষাটোর্ধ্ব নারী তখনো কান্না থামাতে পারেননি।
হল থেকে বের হওয়ার সময় বারবার মনে হচ্ছিল- সিনেমার গল্প শেষ হয়ে গেছে; কিন্তু দর্শকদের মধ্যে তার প্রতিক্রিয়াটি যেন তখনো শেষ হয়নি।
সিনেমা নিয়ে লিখতে গেলে আমরা সাধারণত গল্প, অভিনয়, পরিচালনা, চিত্রনাট্য কিংবা চিত্রগ্রহণের কথা বলি; কিন্তু কখনো কখনো দর্শকের প্রতিক্রিয়াও একটি সিনেমাকে বোঝার গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলে দেয়।
‘ফেইথ’ দেখার পর আমার কাছে সেই দরজাটি খুলেছিল দর্শকসারিতে বসেই।
একটি শেষ টিকিট হাতে নিয়ে হলে ঢুকেছিলাম। টিকিট দেয়ার সময় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির সেই কথা- ‘ইউ আর আ লাকি ম্যান’- তখন হয়তো কেবল শেষ টিকিট পাওয়ার সৌভাগ্য বোঝাচ্ছিল।
কিন্তু সিনেমা শেষ হওয়ার পর মনে হলো, সে দিনের সৌভাগ্য হয়তো শুধু শেষ টিকিটটি পাওয়া নয়; বরং একটি পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে বসে দেখা- পর্দায় একজন মায়ের সন্তানের জন্য অসহায় শোক, সেই শোকের সামনে দর্শকদের নীরব হয়ে যাওয়া, এবং আমার পাশের আসনে বসা এক অপরিচিত ষাটোর্ধ্ব নারীর অবিরাম কান্না।
সিনেমা শেষ হয়ে গেছে। হলের আলো জ্বলে উঠেছে। দর্শকরাও যার যার জীবনে ফিরে গেছেন; কিন্তু সেই কান্নার শব্দ এখনো যেন কানে বাজে।