
বিশেষ সংবাদদাতা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফলে ডিজেলের লিটার হবে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা। যা গত রাত ১২টার পর অর্থাৎ আজ ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় গতকাল রাতে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
এতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থে গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। এ কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর গত পাঁচ মাস দেশে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বিপিসির ওপর আর্থিক চাপ বাড়তে থাকে।
মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় প্রতি লিটার ডিজেলে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। এতে প্রতিদিন প্রায় ১০৯ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। একই হারে লোকসান অব্যাহত থাকলে শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে।
সরকারের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে দেশের জ্বালানি তেলের মূল্যের বড় ব্যবধান থাকলে সীমান্তপথে পাচারের ঝুঁঁকি বাড়ে।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবেশী ও কয়েকটি এশীয় দেশের ডিজেলের দাম তুলে ধরে বলা হয়েছে, বর্তমানে কলকাতায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা এবং শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা। থাইল্যান্ডে এ দাম ১৫১ টাকা ২২ পয়সা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা ৭১ পয়সা, ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা।
মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে কম দামে জ্বালানি তেল বিক্রি হওয়ায় সীমান্তবর্তী এলাকায় পাচারের ঝুঁঁকি তৈরি হয়েছে। তাই বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আমদানি করা জ্বালানি তেল পাচার ঠেকাতে মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিজেলের পাশাপাশি অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দামও লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এতদিন ডিজেল ১১৫, অকটেন ১৪৫, পেট্রল ১৪০ এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। নতুন দামে যথাক্রমে এগুলো ১৩৫, ১৬৫, ১৬০ ও ১৫৫ টাকা হবে।
মন্ত্রণালয় বলছে, প্রতি লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ানো হলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হতে পারে। সেই সাথে এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং সীমান্তপথে জ্বালানি পাচারের ঝুঁঁকি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হবে।
তবে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থায়। বিশেষ করে ডিজেলের ব্যবহার ব্যাপক হওয়ায় এবং পরিবহন ব্যয় ও পণ্য পরিবহন খরচের ওপর এর প্রভাব নিয়ে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে শুধু তেল নয়, এলএনজির ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যয় বেড়েছে। সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ সচল রাখতে এলএনজি খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্বাভাবিক মূল্য পরিস্থিতিতে বিপিসির আর্থিক ক্ষতি সীমিত করা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং জ্বালানি পাচারের ঝুঁঁকি মোকাবেলার অংশ হিসেবেই সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।







