ইরানে ফের হামলার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement


* যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের শর্ত
* শর্ত না মানা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে হরমুজ প্রণালী : ইরান

উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু দেশের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র আবারো ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক কমান্ড। গতকাল রোববার দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘আইআরআইবি নিউজ’-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন বলা হয়েছে, দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড এমন তথ্য পেয়েছে, যার মাধ্যমে জানা যায় ওয়াশিট তেহরানের বিরুদ্ধে তাদের ‘কার্যকলাপ’ ফের শুরু করার পরিকল্পনা করছে। এ বিষয়ে তেহরান পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
ইরানি সামরিক বাহিনী সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর ওপর ধারাবাহিক পাল্টা হামলা চালানো হবে। পাশাপাশি এ-ও বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসনে যেসব আঞ্চলিক দেশ সহায়তা করবে, তাদেরও এই সঙ্ঘাতের পক্ষ হিসেবে গণ্য করা হবে। সামরিক বাহিনী আরো দাবি করেছে, ইউরোপের কোনো একটি দেশে অনুষ্ঠিত যৌথ বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের এই পরিকল্পনার জন্য ‘সবুজ সঙ্কেত’ পেয়েছে।
সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতিও সতর্কবার্তা দিয়েছে। তারা বলেছে, ইরানের বিষয়ে ওই দেশগুলো যদি তাদের ‘দ্বিমুখী নীতি’ অব্যাহত রাখে, তবে তাদের ‘সহযোগী’ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সে ক্ষেত্রে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কাছ থেকে কোনো ধরনের ‘সংযম বা সৌজন্য’ আশা করা তাদের উচিত হবে না। এর আগে শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্যাম্প ডেভিডে সপ্তাহের ছুটি সংক্ষিপ্ত করে অপ্রত্যাশিতভাবে হোয়াইট হাউজে ফিরে আসেন।
যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের শর্ত
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান আলোচনায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শর্তের ওপর জোর দিচ্ছে ইরান। এর মধ্যে রয়েছে- দেশটির ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা বা জব্দ ইরানি সম্পদ মুক্ত করা এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নৌ অবরোধ তুলে নেয়া। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে কাতার ও পাকিস্তান। তাদের সহায়তায় দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে চলছে। ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যেকোনো সম্ভাব্য সমঝোতা শুধু সাময়িক উত্তেজনা কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির ভিত্তি তৈরি করবে- এমন নিশ্চয়তা চায় তেহরান। এ কারণেই আলোচনায় নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সাথে সম্পর্কিত কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে তারা।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি হলো দেশটির ওপর আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। এসব নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতে দীর্ঘ দিন ধরে ব্যাপক চাপ তৈরি করেছে। তেহরানের কর্মকর্তারা মনে করছেন, নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখে দীর্ঘমেয়াদি কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা কার্যকর করা কঠিন হবে। তাই সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে ইরান। ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই নানা সঙ্কটে রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে আলোচনায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে তেহরান।
বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ফেরত
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পাশাপাশি বিদেশে আটকে থাকা বা জব্দ ইরানি সম্পদ মুক্ত করার দাবিও জানিয়েছে ইরান। বিভিন্ন দেশে ইরানের সম্পদ ও অর্থনৈতিক লেনদেনের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব রয়েছে। তেহরানের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমঝোতার অংশ হিসেবে এসব সম্পদ ছাড় করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। ইরানি কর্মকর্তারা মনে করছেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক করতে এবং দেশের ওপর তৈরি হওয়া চাপ কমাতে এসব সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নৌ অবরোধ নিয়ে তেহরানের আপত্তি
আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নৌ অবরোধ। ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন, এই অবরোধ প্রত্যাহার না হলে কোনো কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হবে। বিশেষ করে ইরানের তেল রফতানির ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে তেহরানের। দেশটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস হলো তেল রফতানি। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি ও রফতানি অব্যাহত রাখার সুযোগ ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, তেল রফতানির ওপর বাধা অব্যাহত থাকলে সম্ভাব্য কোনো শান্তিচুক্তির পরও দেশটির অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। এ কারণে আলোচনার অংশ হিসেবে নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টিকেও তারা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে সামনে আনছেন।
দীর্ঘমেয়াদি শান্তির দিকে নজর
কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে আলোচনা চলছে, সেখানে তাৎক্ষণিক সঙ্ঘাত বন্ধের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। ইরানের অবস্থান হলো, যেকোনো সমঝোতা এমন হতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আবার একই ধরনের সঙ্ঘাত তৈরি না হয় এবং দেশটির অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়। তবে এসব দাবি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী হবে এবং আলোচনার মাধ্যমে উভয়পক্ষ কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তানের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা। কারণ নিষেধাজ্ঞা, ইরানের আটকে থাকা সম্পদ এবং তেল রফতানির ওপর বিধিনিষেধ- এই তিনটি বিষয়ই সম্ভাব্য সমঝোতার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো উদ্যোগে অর্থনৈতিক চাপ কমানো এবং দেশটির তেল রফতানির পথ স্বাভাবিক করার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। এখন আলোচনার পরবর্তী ধাপে যুক্তরাষ্ট্র এসব দাবির বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, সেটিই হয়ে উঠতে পারে সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 
শর্ত না মানা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে হরমুজ প্রণালী
এ দিকে ইরানের ওপর দিয়ে যাওয়া বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেলের পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ এখনই খুলছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যত দিন না পর্যন্ত তাদের দেয়া আগের কথা ও শর্তগুলো পুরোপুরি মেনে নিচ্ছে, তত দিন এই সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ রাখার কথা সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইরান। গতকাল রোববার  দেশটির জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে কড়া ভাষায় এই ঘোষণা দেন ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি বলেন, অন্যান্য দেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের স্পষ্ট বার্তা পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে তাদের দাবি না মানা পর্যন্ত এই পথ খোলার আর কোনো সুযোগ নেই।
ইরানি গণমাধ্যম জানায়, স্পিকার গালিবাফ সভায় বলেন যে শত্রু পক্ষ ভালো করেই জানে একতরফা চাল চালবার সময় আর নেই। যতক্ষণ না ইরানের মানুষের নায্য অধিকার মেনে নেয়া হচ্ছে এবং গত জুনের চুক্তির কথা আমেরিকা রাখছে, ততক্ষণ পর্যন্ত জলপথ চালু করা বা নতুন করে কোনো আলোচনায় বসার পথ পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রায় সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যে রণক্ষেত্রে পূর্ণ সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। জানিয়েছেন, সঙ্কটময় মুহূর্তে শত্রুকে পেছনে হটিয়ে দুর্বল করার পরেই কেবল কূটনীতির পথ বেছে নেবে তেহরান। পার্লামেন্টে দেয়া ভাষণে স্পিকার গালিবাফ বলেন, ‘এক দিকে লড়াই ও অন্য দিকে আলোচনার নীতিতেই আমাদের এগোতে হবে। সঙ্কটময় মুহূর্তে পূর্ণ সামরিক শক্তি ব্যবহার করে শত্রুকে পেছনে ঠেলে দিতে হবে এবং তাদের ওপর বিধ্বংসী আঘাত হানতে হবে। এরপর রণক্ষেত্রে বড় সাফল্যের মাধ্যমে শত্রু যখন দুর্বল অবস্থানে পৌঁছাবে, তখন অর্জিত সাফল্য ধরে রাখতে কূটনীতি ব্যবহার করতে হবে।’
মূলত চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মিলে ইরানের ওপর হামলা চালালে এই ঝামেলার সূত্রপাত হয়। এর জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা আমেরিকার সামরিক ঘাটিগুলোতে হামলা চালায় এবং তেলের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। মাঝখানে গত জুন মাসে দুই দেশের যুদ্ধ থামানো এবং জলপথটি আবার চালু করার জন্য একটি চুক্তিও হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কিভাবে এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করবে এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব কার হাতে থাকবে- তা নিয়ে অমিল দেখা দেয়ায় সেই চুক্তি ভেস্তে যায়। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ সাগরপথটি বন্ধ থাকায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই আবার নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।