
* এনআইডি বানানো ও সংশোধন যেন অন্তহীন লড়াই
* মেডিক্যাল বোর্ডের নামে যৌন হয়রানির অভিযোগ
* ৮০ শতাংশ হিজড়াই নিজস্ব পরিচয়ের বাইরে
জাতীয় পরিচয়পত্রে লেখা মোহাম্মদ মোহন, অথচ তার আসল নাম মোহনা। নিজের এই মৌলিক পরিচয়টুকু পাওয়ার জন্য লড়াই করতে গিয়ে অবর্ণনীয় ভোগান্তি, চড়ামূল্য এবং পাহাড়সম জটিলতার মুখোমুখি হয়েছেন রাজশাহী এলাকার হিজড়া জনগোষ্ঠীর সভানেত্রী মোহনা। নিজের ক্ষোভ ও কষ্টের কথা প্রকাশ করতে গিয়ে মোহনা নজানান, আগে যখন তার ভোটার নিবন্ধন হয়েছিল, তখন ফর্মগুলোতে নারী বা পুরুষ ছাড়া পরিচয়ের অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। পরে নিজের প্রকৃত জেন্ডার ও নাম সংশোধন করতে গিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় এক দুর্বিষহ প্রশাসনিক জটিলতা। শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও অনেক কষ্টে তিনি কেবল তার জন্ম নিবন্ধনটি সংশোধন করতে পেরেছেন। তবে পরিচয় নিশ্চিত করার এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বেদনার অভিজ্ঞতা হয় সিভিল সার্জনের অধীনে জেন্ডার পরীক্ষার জন্য গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের মুখোমুখি হওয়ার সময়। মোহনার অভিযোগ, সেই বোর্ডে থাকা ডাক্তারদের তাদের সম্পর্কে কোনো অভিজ্ঞতা কিংবা ন্যূনতম আন্তরিকতা নেই। একপর্যায়ে ডাক্তাররা তাকে বিবস্ত্র হয়ে শারীরিকভাবে পরীক্ষা করার দাবি জানান। মোহনা শারীরিকভাবে নিজেকে পরীক্ষা করাতে অস্বীকার করলে, চিকিৎসকেরা তাকে হুমকি দিয়ে বলেন যে শারীরিক পরীক্ষা না দিলে তারা নেগেটিভ রিপোর্ট দিয়ে দেবেন।
আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে যেখানে অনেক সম্মানজনক উপায়ে জেন্ডার শনাক্ত করা সম্ভব, সেখানে এমন অপমানজনক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা হচ্ছে। তাছাড়া এই জেন্ডার সার্টিফিকেটের জন্য প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল টেস্টগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এত অর্থ খরচের পরও ডাক্তাররা সঠিক সার্টিফিকেট দেবেন কি না তার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। ভুয়া মানুষ এসব জায়গায় ঢুকে পড়বে প্রশাসনের এই আশঙ্কা থাকলেও, তা চিহ্নিত করার জন্য তো সম্মানজনক বিকল্প পদ্ধতি রয়েছে- এমনটাই আকুল আবেদন মোহনার।
অন্য দিকে ২৭ বছর বয়সী শান্তা চেয়েছিলেন একজন সফল উদ্যোক্তা হতে। ট্রেড লাইসেন্স আর ব্যাংক লোনের জন্য এনআইডি সংশোধন করতে গিয়ে তিনি স্থানীয় নির্বাচন অফিসে এক কর্মকর্তার লালসার শিকার হন। সেই কর্মকর্তা তাকে যৌন হয়রানি করে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তুমি কি আসলেই হিজড়া? চলো পাশের রুমে গিয়ে পরীক্ষা করি। সেই অপমানে শান্তার ব্যবসার স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।
জানা গেছে, দেশজুড়ে এমন হাজারও শান্তা ও জয়া রয়েছে, যাদের সাথে প্রতিনিয়ত এসব ঘটনা ঘটছে। আর এগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো গল্প নয়; বরং এটি বাংলাদেশের হাজার হাজার হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রাত্যহিক জীবনের করুণ বাস্তবতা। ২০১৩ সালে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের ‘হিজড়া লিঙ্গ’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হলেও, এক যুগের বেশি সময়েও তাদের নাগরিকত্বের চাবিকাঠি যে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তা এখনো এক দুর্ভেদ্য আমলাতান্ত্রিক দুর্গে বন্দী।
সেই স্বীকৃতি আজো গেজেটেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। এনআইডি না থাকা বা সেখানে ভুল তথ্য থাকা মানে কেবল একটি কার্ডের অভাব নয়, এটি রাষ্ট্র কর্তৃক তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করার নামান্তর। এই পরিচয়পত্রের অভাবে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয় না, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার আগে তাদের লিঙ্গ নিয়ে তর্ক চলে, আর মোবাইল সিম কিনতে তারা অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হন।
এনআইডি পেতে হিজড়াদের বর্তমানে সবচেয়ে অমানবিক বাধার নাম ‘মেডিক্যাল বোর্ড’। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ বা পরিচয় নিশ্চিত করার নামে হিজড়াদের যেভাবে শারীরিক পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়, তা আধুনিক সভ্যতায় কল্পনা করাও কঠিন। অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসকরা কেবল জননাঙ্গের গঠন দেখে হিজড়া হওয়ার সিদ্ধান্ত দেন, যা অবৈজ্ঞানিক। হিজড়া হওয়া মূলত একটি হরমোনাল ও মানসিক বিষয়। তা ছাড়া এনআইডি আবেদনের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার পরিচয়পত্র এবং স্থায়ী ঠিকানা প্রদান বাধ্যতামূলক। কিন্তু অধিকাংশ হিজড়া কৈশোরেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘গুরু-চেলা’ ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হয়। পরিবারের সাথে সম্পর্ক না থাকায় তারা পিতা-মাতার এনআইডি সংগ্রহ করতে পারে না, ফলে তাদের আবেদন শুরুতেই বাতিল হয়ে যায়। এ ছাড়া অনেকের জন্মনিবন্ধনে লিঙ্গ ‘পুরুষ’ বা ‘নারী’ থাকায় তা সংশোধন করা প্রায় অসম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে পিতা-মাতার বদলে ‘গুরু’র তথ্য গ্রহণ করার আইনি সংশোধন প্রয়োজন।
এ দিকে অনেকেই পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ পাচ্ছেন না কারণ আইনি দলিলে এনআইডি বাধ্যতামূলক। উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরির প্রতিটি স্তরে এনআইডি প্রয়োজন, যা না থাকায় তারা ভিক্ষাবৃত্তি বা অন্ধকার জগতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলো এই সমস্যার সমাধানে অনেক পথ এগিয়েছে। ভারত ২০১৯ সালে এবং পাকিস্তান ২০১৮ সালে তাদের সুরক্ষা আইনে মেডিক্যাল বোর্ড ছাড়াই কেবল ‘স্ব-পরিচয়’-এর ভিত্তিতে হিজড়াদের এনআইডি পাওয়ার অধিকার দিয়েছে। নেপাল ২০০৭ সালেই স্ব-অনুভূতির ভিত্তিতে নাগরিকত্ব প্রদানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, সেখানে লিঙ্গ স্বীকৃতি কোনো মেডিক্যাল বিষয় নয় বরং একটি মানবাধিকার ইস্যু।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিজড়াদের নগ্ন করে পরীক্ষা করা রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা। এনআইডি ফরম সবার জন্য উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া প্রয়োজন যাতে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত মর্জিতে কারোর পরিচয় আটকে না যায়। হিজড়া শনাক্তকরণে কেবল বাহ্যিক অঙ্গ নয়, হরমোন পরীক্ষা ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়া উচিত। তা ছাড়া তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কেবল কাগজে থাকলে চলবে না, প্রতিটি দফতরে হিজড়াবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। যে স্বীকৃতি হিজড়াদের আশীর্বাদ হওয়ার কথা ছিল, প্রশাসনিক জটিলতায় তা আজ অভিশাপে পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা ৯০ শতাংশ হিজড়া মানসিক ও যৌন হয়রানির শিকার হন।
বাংলাদেশে হিজড়াদের প্রকৃত সংখ্যা কত, তা নিয়েও সরকারি ও বেসরকারি তথ্যের মধ্যে চরম বৈপরীত্য বিদ্যমান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ২০২২ অনুযায়ী দেশে হিজড়া সংখ্যা ১২ হাজার ৬২৯ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য দিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং বিভিন্ন এনজিওর দাবি, এই সংখ্যা এক লাখ ২০ হাজারেরও বেশি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে হালনাগাদ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ জানান, বর্তমানে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার এক হাজার ২৬৭ জন।
সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং লিঙ্গভেদে বৈষম্য নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে হিজড়াদের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট ‘ট্রান্সজেন্ডার প্রোটেকশন অ্যাক্ট’ বাংলাদেশে নেই। মানবাধিকার কমিশন একটি বৈষম্য বিলোপ আইনের খসড়া করলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। উল্টো ২০১৩ সালের নীতিমালার ‘লিঙ্গ প্রতিবন্ধী’ শব্দটি তাদের জন্য চরম অপমানজনক।
এনআইডি ও মেডিক্যালের বিষয়ে অভিযোগ করে রংপুর জেলা হিজড়া সম্প্রদায়ের গুরুমা রানী বলেন, রংপুর জেলার ৩৯২ জন সদস্যের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ স্বপরিচয়ে অর্থাৎ হিজড়া হিসেবে কার্ড পাননি; তারা নিরুপায় হয়ে কেবল ‘নারী’ কিংবা ‘পুরুষ’ পরিচয়ে কার্ড পেয়েছেন। অনেকের পরিবার তাদের কোনোভাবেই সন্তান হিসেবে স্বীকার বা পরিচয় না দেয়ায় এনআইডি কার্ড করতে পারেননি। বর্তমানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার নিয়ম হলেও, মেডিক্যাল বোর্ডের সার্টিফিকেটের আবশ্যকতা তৈরি করা হয়েছে। রংপুরে সর্বশেষ মেডিক্যাল বোর্ড বসেছিল ২০১৭ সালে, তাও মাত্র এক দিনের জন্য। ফলে বেশির ভাগ স্বপরিচয়ের ক্যাটাগরিতে আসতে পারেনি। কোনো সহজ পদ্ধতি না থাকায় আমাদের এই চরম জটিলতাগুলো পার করেই এগোতে হয়। এমনকি অনেকে নিরুপায় হয়ে বাবা-মাকে মৃত দেখিয়ে কাজ করার কথা ভাবলেও সেখানে মিথ্যার আশ্রয় নেয়া ছাড়া পথ থাকে না।
এই বিষয়ে সমাজসেবা অধিদফতরের হিজড়া জনগোষ্ঠী সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির পরিচালক মোহাম্মদ শাহ জাহান বলেন, হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য একটি আইন করতে চেয়েছিলাম যাতে এই বিষয়গুলো নিয়ে কাউকে কোনো ঝামেলার মধ্যে পড়তে না হয়। কিন্তু আইনটি এখনো পাস করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে এনআইডি কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে কোনো কাগজপত্র চাইলে যোগাযোগ করে সহযোগিতা করি এবং পরিচয়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করার চেষ্টা করি। আইনটি পাস হয়ে গেলে মেডিক্যাল চেকআপসহ সব ধরনের হয়রানি ও সমস্যা দূর হয়ে যেত। যেহেতু এখন কোনো আইনি ভিত্তি নেই, তাই আমরা উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছি। আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া চলছে, তবে বিভিন্ন ধরনের বাধার কারণে এখনো এটি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
হিজড়াদের সুযোগ-সুবিধা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, আমরা বর্তমানে তাদের জন্য তিনটি মূল কার্যক্রম পরিচালনা করছি- ভাতা, উপবৃত্তি ও প্রশিক্ষণ বা ট্রেনিং। প্রত্যেকের জন্য এই সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রাখলেও অনেকেই নিজে থেকে এগিয়ে আসেন না। হিজড়াদের এনআইডি কার্ড সংশোধন ও মেডিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়ে জানতে নির্বাচন কমিশন ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলতে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তারা সাড়া দেননি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








